ইশরাকের ১৬ দফা ইশতেহার: ঐতিহ্য ধরে রেখে ‘আধুনিক ঢাকা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইশরাকের ১৬ দফা ইশতেহার: ঐতিহ্য ধরে রেখে ‘আধুনিক ঢাকা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে ‘আধুনিক বাসযোগ্য ঢাকা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন দক্ষিণ সিটির বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।

এতে মশা ও জলাবদ্ধতামুক্ত, দূষণ-যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন, নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা, বনায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারসহ ১৬ দফায় ১৫৭টি বিষয় স্থান পেয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে তিনি এ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। প্রতিশ্রুতির মধ্যে আরও আছে হোল্ডিং ট্যাক্স সেক্টরকে দুর্নীতিমুক্ত করে আলোচনা সাপেক্ষে ট্যাক্স নির্ধারণ, মহিলাদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাস সার্ভিস চালু, পাতাল রেল নির্মাণের কর্মসূচি, সস্তা ভেজালমুক্ত খাবারের জন্য ‘কৃষক মার্কেট’ ও ‘নাইট মার্কেট’ স্থাপন, ওয়ার্ডভিত্তিক আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার, যাত্রাবাড়ী-ডেমরার ‘ডিএনডি’ বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধ এলাকার পানি শীতলক্ষ্যা নদীতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা, বস্তিবাসীর জীবন-মান উন্নয়নে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা ও নিুবিত্ত নাগরিকদের জন্য স্বল্প ভাড়ার আবাসন প্রকল্প গ্রহণ।

ইশরাক হোসেন বলেন, আদর্শ শহর হচ্ছে যেখানে চাওয়ার আগেই ‘উত্তম নাগরিক সেবা’ নাগরিকদের দুয়ারে হাজির হবে। সামাজিক, পারিবারিক ও নাগরিক মূল্যবোধের চর্চা হবে সুদৃঢ়। মেয়র হওয়ার সুযোগ পেলে তেমন নগরই তিনি গড়তে চান।

নগরীর সমস্যার গুরুত্ব অনুসারে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্র্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করার কথা জানান বিএনপির এই মেয়র প্রার্থী। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে স্বল্প মেয়াদে প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি আপনাদের সবার আন্তরিক সহযোগিতায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদান নিশ্চিত করব।

সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ কর্তৃপক্ষকে সরাসরি অবহিত করার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে মহানগরী ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে হটলাইন চালু করা হবে। সেবা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধানে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নগরবাসীর উদ্দেশে ইশরাক বলেন, আমি ঢাকার সন্তান। আপনাদেরই সন্তান ও আপনজন। আপনাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে আমার জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ঢাকা আমাদের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার মমতামাখা গর্বের মহানগরী। এই ঐতিহাসিক নগরীর সন্তান হিসেবে আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হচ্ছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে বিশ্বমানের বাসযোগ্য অত্যাধুনিক ঢাকা গড়ে তোলা।

আপনাদের সহযোগিতা পেলে তা আরও বাস্তব, প্রায়োগিক ও নাগরিকবান্ধব করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমি একান্তভাবে আশা করি, আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে আপনার মূল্যবান ভোটটি দিয়ে আমাকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।

তিনি বলেন, সমন্বিত ও কার্যকর নগর সরকার ধারণা বাস্তবায়নে সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া হবে। নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য রাজউকের মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে অঞ্চলভিত্তিক ‘অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’ গ্রহণ করবেন, নাগরিক সেবার কর্মকাণ্ড ওয়ার্ড পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে।

মেয়রের দায়িত্ব পেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরজুড়ে মশার অভয়াশ্রম ঢাকার জলাশয়গুলো পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেবেন ইশরাক। মশক নিধনে ‘আধুনিক প্রযুক্তি’ ব্যবহার করবেন।

ঢাকা ওয়াসাসহ রাজধানীতে সেবা প্রদানকারী সব সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে সুপেয় পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতা দূর করা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দেন ইশরাক।

যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ফুটব্রিজ, চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন, ওয়ান স্টপ বাস সার্ভিস চালু, আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নির্মাণ, বৈদ্যুতিক বাস ও স্কাইওয়ে নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিংয়ে ডিজিটাল পুশ বাটন চালু, সাইকেল ও মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক লেইন, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ৫০ বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের কথা রয়েছে ইশতেহারে।

জনবহুল রাজধানীর ভবিষ্যৎ জনঘনত্বের কথা বিবেচনায় রেখে পাতাল রেল নির্মাণের কর্মসূচিও নিতে চান বিএনপির প্রার্থী। এ প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়, প্রথম পর্বে পিলখানা থেকে লালবাগ কেল্লা, চকবাজার, সদরঘাট, গুলিস্তান হয়ে মতিঝিলে শেষ হবে এই লাইন। আরেকটি হবে শ্যামপুর থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে মতিঝিলে। তাতে ঢাকা দক্ষিণের যাত্রীরা এই রুটের মাধ্যমে মেট্রোরেল প্রকল্পের মতিঝিল হয়ে উত্তর ঢাকায় যাতায়াতের সুযোগ পাবে।

নাগরিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রাইমারি হেলফ চেকআপ সেন্টার, প্রান্তিক ও সান্ধ্যকালীন কর্মীদের জন্য আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণ, জনসমাগমস্থলে ‘ফুড কোর্ট’ ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করেন ইশরাক হোসেন।

তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি অঞ্চলভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করবেন। ওয়ার্ডভিত্তিক ব্যায়ামাগারের আধুনিকায়ন করবেন। প্রতিটি স্থাপনায় থাকবে মাতৃদুগ্ধ কক্ষ। নারীবান্ধব কম্প্রেহেনসিভ রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ কেয়ার এবং প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টার করার পাশাপাশি কর্মজীবী নারী ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হবে।

ইশরাক বলেন, মেয়র হলে তিনি বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত করা, নদীর তীর রক্ষা ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ, সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প নেবেন এবং নদীভিত্তিক বিনোদন কেন্দ্র, নৌ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। শিশুপার্কসহ বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করবেন। পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার করবেন।

সিটি কর্পোরেশনের সব উন্মুক্ত উদ্যান, নদী ও খাল অবৈধ দখলমুক্ত করা, নিয়মিত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, খেলাধুলার আয়োজন করা, ডিসিসির নিজস্ব জায়গায় বৃক্ষ ক্লিনিক, পোষ্যপ্রাণী ক্লিনিক করা, ছাদ-বাগান ও আরবান এগ্রিকালচারে নাগরিকদের উৎসাহ দেয়ার কথাও স্থান পেয়েছে ইশতেহারে।

বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, দল-মত ও জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মহানগরীর সব জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্ম-কর্মের অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করব। প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। কোনো নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে দেয়া হবে না। ধর্ম যার যার, এ মহানগরী সবার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর ঢাকা মহানগরীর এই ঐতিহ্য কোনোরকমেই বিনষ্ট হতে দেয়া হবে না।

ইশরাক বলেন, গণশুনানির মাধ্যমে নগরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সিটি কর্পোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হবে। জন্ম-মৃত্যুসনদ, ট্রেড-লাইসেন্স এবং অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করবেন। নগরীর বাজারগুলোর আধুনিকায়ন এবং পণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেবেন। আর নাগরিকদের করের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে বছরে দুইবার করদাতাদের সামনে সেই হিসাব দেয়া হবে।

ভোটারদের উদ্দেশে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, নির্বাচনই যেহেতু ক্ষমতা বদলের একমাত্র গণতান্ত্রিক পন্থা। তাই আমাদের দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে আসন্ন সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সর্বোপরি আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থে ধানের শীষে আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে জয়যুক্ত করবেন।

বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুলের সঞ্চালনায় ইশতেহার ঘোষণার সময় মূল মঞ্চে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, গণফোরামের ড. রেজা কিবরিয়া, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না ও ২০ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার।

আরও উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সদরুল আমিন, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক আখতার হোসেন খান, বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিব, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস জাহান শিরিন, শামা ওবায়েদ, শিরিন সুলতানা, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সালাহউদ্দিন আহমেদ, এবিএম মোশারফ হোসেন, আবদুস সালাম আজাদ, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, আমিরুল ইসলাম খান আলীম, কাজী আবুল বাশার, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, বিকল্পধারা বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. নূরুল আমিন বেপারী, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের মাওলানা শফিক উদ্দিন, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, ড্যাবের অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের গোলাম সরোয়ার, ছাত্রদলের ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, আমিনুর রহমান আমিন, সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রমুখ।

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন-২০২০

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×