রাষ্ট্রকে আরও মানবিক, নৈতিক হতে হবে

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তরের যাত্রার শুরু থেকেই আমি এর পাঠক। কুড়ি বছর পত্রিকাটি মানুষের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছে, অন্যায়-অবিচার আর দুর্নীতির বিপক্ষে এর অবস্থান ধরে রেখেছে।

এর সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়গুলোয়, খবর পরিবেশনে, মন্তব্য-প্রতিবেদনে, নানা বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে কয়েকটি বিষয়- মানুষের অধিকারহীনতা আর বিপন্নতা, সমাজের নানা অসুখ ও বৈকল্য, কিছু মানুষের সীমাহীন লোভ এবং সিংহভাগ মানুষের ভোগান্তি, আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গুরতা, উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিপদ, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যহীনতা, সুশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির সর্বগ্রাসিতা।

যুগান্তরের চিন্তায় প্রাধান্য পেয়েছে নারী ও শিশু, প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী মানুষ, স্বল্পআয়ের পরিবার ও সংখ্যালঘুদের অধিকার। সবসময় যে পত্রিকাটি উচ্চকণ্ঠ হতে পেরেছে তা নয়, অনেক সময় এর সম্পাদকীয় নীতিতে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা গেছে, কোনো বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকেও সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে, বৃহৎ স্বার্থের পক্ষেও কোনো কোনো সময় এটি হেলে পড়েছে।

কিন্তু মোটাদাগে বলা যায়, পত্রিকাটি এর গণমুখী ও প্রাগ্রসর চিন্তার অবস্থানটি কুড়ি বছর ধরে রাখতে পেরেছে। আমাদের মতো দেশে, যেখানে সংবাদপত্রের ওপর নানা বিধিনিষেধের খড়্গ ঝুলে থাকে সবসময়, এ কাজটি সহজ নয়। কিন্তু যুগান্তর অসহজ এই কাজটি নিষ্ঠা নিয়েই করছে, এবং পাঠকের সমর্থন আদায় করছে।

যুগান্তরের বিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এর অভিনন্দনযোগ্য এই ভূমিকাটির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সমাজ বাস্তবতা নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে পারি।

আমি বিশ্বাস করি, আগামীতে প্রতিটি সংবাদমাধ্যমকে এ বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠ নজরদারিতে রাখতে হবে, কারণ দেশটির মানবিক হওয়া না-হওয়া, এর নৈতিক হয়ে ওঠা না-ওঠা নির্ভর করবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের সবার ভূমিকার ওপর।

আমরা যদি দুর্বলতা দেখাই, অন্যায়কে সহ্য করে যাই, নীতিহীনতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেই, তাহলে স্থিতাবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। আর যদি এগুলোর অবসানে সক্রিয় হই, তাহলেই একটা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে আমাদের যাত্রা নিশ্চিত হতে পারে।

সুন্দর ভবিষ্যতের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দুটি উদ্যাপনের বিষয়কে সামনে রেখে। আর কিছুদিনের মধ্যে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মুজিববর্ষ পালন করতে যাচ্ছি।

মুজিববর্ষ পালন আনুষ্ঠানিকতার খোলসে বন্দি কিছু কর্মসূচি গ্রহণ নয়, বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বিশ্বাস এবং মানুষ ও দেশ নিয়ে তার চিন্তাভাবনার অনুসরণ ও বাস্তবায়ন। ২০২১ সালটি আমরা উদ্যাপন করব মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী হিসেবে।

সারা বছর আমরা মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের সব কাজের মাঝখানে রাখব; যেসব কারণে, যেসব আদর্শের ভিত্তিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেগুলোকে আমাদের চিন্তাচেতনা ও কাজকর্মের ভিত্তি করব এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নিষ্ঠা, দৃঢ়তা, একতা এবং নির্ভয় সংকল্প দেখিয়েছিলাম, আরেকবার তাই দেখাব। অন্তত আমাদের আশা তা-ই।

যদি তা না করতে পারি, তাহলে আগামী বছরগুলোয় আমরা যতই অর্থনৈতিক উন্নতি করি না কেন, যতই আমাদের প্রবৃদ্ধি আট এবং নয়-এর কোঠায় থাকুক না কেন, যতই আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ুক না কেন, আমরা একটি মানবিক ও নীতিভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে অসমর্থ হব।

এর ফল কারও জন্য সুখকর হবে না। এরকম দুটি পিঠাপিঠি উদ্যাপনের সুযোগ আমাদের আর কবে আসবে? আমি বিশ্বাস করি, ইতিহাস যেমন তার আপন কার্যকরণ সূত্রে ১৯৭১-কে আমাদের জন্য অনিবার্য করে তুলেছিল, তেমনি এ দুই উদ্যাপনকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।

আমাদের জন্য সুযোগ এসেছে দৃঢ় পায়ে সামনে এগোবার, দেশটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সাজাবার। আমরা যেন কোনোক্রমেই ব্যর্থ না হই।

এ কথা স্বীকার করতে হবে, জাতি হিসেবে আমরা অনেক এগিয়েছি। আমাদের অর্থনীতি এগিয়েছে, কৃষি-শিল্প-সেবা খাতে আমাদের অর্জন বেশিরভাগ প্রতিবেশী দেশ থেকে বেশি।

শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা বেশকিছু অসম্ভবকে সম্ভব করেছি- প্রাথমিক স্থলে ভর্তিযোগ্য শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাইকে আমরা স্কুলে আনতে পেরেছি, মেয়েদের অন্তর্ভুক্তিতে প্রতিবেশীদের পেছনে ফেলে দিতে পেরেছি, নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বেশিরভাগ বাধা দূর করতে পেরেছি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি।

দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা একমত যে, আগামী বছরগুলোয় আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারব- বস্তুত ২০৩১ সালের মধ্যে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আমরা আবির্ভূত হব।

বর্তমানে যোগাযোগ, শক্তি ও বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও অন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হলে আমাদের কর্মক্ষমতা ও গতিশীলতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আমি নিশ্চিত উন্নয়নের ধারাটি অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশের সংঘে একটি আসন পেয়ে যাব।

কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি কি মানবিক হবে? এর সব কাজে- রাষ্ট্রীয় থেকে নিয়ে ব্যক্তিগত- নীতিনিষ্ঠতা হবে প্রধান বিবেচনা? উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়িয়ে আমরা কি বলতে পারব এ দেশের মানুষ উন্নত চিন্তা ও চরিত্রের অধিকারী? এর প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, এর গণতন্ত্রচর্চা উন্নত, এর উন্নয়ন এমনই অন্তর্ভুক্তিমূলক যে একজন মানুষও এর আওতার বাইরে নয়?

সম্ভবত, না, যদি না জীবনের সব ক্ষেত্রে আমরা ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করতে পারি।

২.

মানবিকতার ক্ষেত্রটি বহুবিস্তৃত, এর বৃহত্তর পরিসরটি নিয়ে লিখতে গেলে এই লেখাটির অন্তত চল্লিশ গুণ বেশি লিখতে হবে। তাই আমাদের দৃষ্টি কয়েকটি মাত্র ক্ষেত্রে ফেলতে চাই। যেমন- বাংলাদেশে এই সময়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে যে কয়েক কোটি মানুষের অবস্থান, তাদের জন্য রাষ্ট্র মানবিক নয়।

আমাদের ধনীদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, দরিদ্রের সংখ্যা সেই হারে কমছে না। তাই বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন একটি বৈষম্যপীড়িত দেশ। এই বৈষম্য অমানবিক। নারীদের প্রতি সহিংসতা বাড়ছে, নারীরা অরক্ষিত, ধর্ষণের ব্যাপকতা বেড়েছে।

বাল্যবিবাহ, যৌতুক- এসব কমছে না। সবচেয়ে বড় কথা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা উৎপীড়কদের পক্ষে। বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানরা যদি আইন কিনে নিতে পারে, তাহলে রাষ্ট্র কি আর মানবিক থাকে?

বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের পক্ষে ছিলেন। তার আদর্শ ছিল মানবিক। অথচ বাংলাদেশে দুঃখী মানুষেরা এখন চিরদুঃখী।

এ দেশের সংখ্যালঘুরা কি সুরক্ষিত? আদিবাসীদের অধিকার কি অলঙ্ঘিত? নাকি এর বিপরীত? তাদের কাছে রাষ্ট্র কি মানবিক?

গরিবের কাছে, বাংলাদেশের ৪০-৪৫ শতাংশ মানুষের কাছে, আইনের শাসন মানে যেমন ধনী ও ক্ষমতাবানদের তোষণ তেমনি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিটাও ভাগ্যের ব্যাপার।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষ সেবা পায় না, কৃষক চালের ও অন্যান্য পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা কোনোক্রমে জীবনধারণ করেন। এদের কাছে রাষ্ট্র মানবিক নয়।

বস্তিবাসী, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা এক অসম সমাজে বাস করে, যে সমাজ মানবিক নয়, প্রতিবন্ধীদের জন্য এ দেশ মানবিক নয়।

এ দেশ থেকে সুনীতি চলে যাওয়ার পথে, দুর্নীতির জাল এমনভাবে বিছিয়ে গেছে, প্রায় কেউই এর বাইরে নয়। সরকারের যেসব সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের, উৎকোচ ছাড়া সেসব পাওয়া অসম্ভব।

এ দেশে ব্যাংক লোপাট হয়, হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা, গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা টাকার পাহাড় বানান। অথচ চিকিৎসার অভাবে শিশুরা মারা যায়। পর্দাকাণ্ড, বালিশকাণ্ডসহ অসংখ্য কাণ্ডের ভারে তলিয়ে যাচ্ছে দেশটা।

বড় বড় অপরাধ করে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা, তনু আর সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডসহ অসংখ্য হত্যা ও ধর্ষণের মামলা চিরতরে হিমাগারে চলে যায়। তাহলে দেশটির নৈতিক ভিত্তিটি কি শুধুই দুর্বল, নাকি অনুপস্থিত?

গণতন্ত্র এখন সত্যিকার অর্থে বিপন্ন। নির্বাচন হয়, কিন্তু স্বচ্ছ হয় না, ফলাফলে মানুষের পছন্দের প্রতিফলন পড়ে না। রাজনীতি, গত কুড়ি বছরে, সরকারি দল নিয়ন্ত্রিত।

এখন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক-ডাক্তার-আইনজীবী সবাই রাজনীতির বাতাস বুঝে ছাতা মেলেন, অনেকেই সরাসরি দলের আনুগত্য স্বীকার করে নেন।

নৈকিতার এক বড় পরাজয় এখানেই ঘটে যায়। এ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ সব ক্ষেত্র এখন বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত। এর ফলে সবকিছু পণ্যে পরিণত হচ্ছে। বাজার আমাদের বিবেককেও এখন নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে নৈতিকতা আর অবশিষ্ট থাকছে না।

এসব নেতির আর দুর্নীতির গল্পগুলো আমাদের সুস্থতার আর সাফল্যের বয়ানগুলো ছাপিয়ে উঠছে। এসব চলতে দেয়া যায় না।

৩.

সমস্যা হচ্ছে, যদি এসব দুর্যোগ-দুর্বিপাক এবং স্খলন-পতনের জন্য শুধু রাষ্ট্রকে এবং তার সব প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যেত, তাহলে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে, বিপ্লব সংঘটিত করে এগুলোর জবাব দেয়া যেত, প্রশমন ও নির্মূল করা যেত।

কিন্তু এগুলোর জন্য নাগরিকদেরও দায় আছে, ব্যাপকভাবেই আছে। রাষ্ট্রকে আমরা না হয় কাঠগড়ায় দাঁড় করালাম- যদিও তাতে রাষ্ট্র দোষ স্বীকার করে বদলে যাবে, সে সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

কিন্তু নিজেদের আমরা কী করে কাঠগড়ায় তুলব? অথচ এ কাজটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

তবে আমরা পারব। এ জন্য আমাদের শিক্ষায় জোর দিতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য ক্রমাগত কমাতে হবে, তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে, দুর্নীতি চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ আমাদের মানবিক ও নৈতিক হতে হবে। মানবিকতার অভাব কোথায়, আমরা জানি, সে অভাব কীভাবে ঘোচাতে হবে, তা-ও জানি। একই কথা খাটে নৈতিকতার ক্ষেত্রেও। যদি জানিই, তাহলে শুদ্ধতার চর্চাটা কেন শুরু করতে পারব না?

মুজিববর্ষে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, নিজেদের আচরণে পরিবর্তন এনে আমরা রাষ্ট্রকে আরও মানবিক ও নৈতিক হতে সাহায্য- অথবা বাধ্য- করব।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত