ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আত্মবিশ্বাসে জয়, পরাজয়ে অর্জন
jugantor
আওয়ামী লীগ-বিএনপির পর্যালোচনা
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আত্মবিশ্বাসে জয়, পরাজয়ে অর্জন
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বিজয়ে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা * দুই তরুণে মুগ্ধ হাইকমান্ড, উজ্জীবিত বিএনপির নেতাকর্মীরা

  হাবিবুর রহমান খান ও রেজাউল করিম প্লাবন  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আত্মবিশ্বাসে জয়, পরাজয়ে অর্জন

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের ভোটের ফল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে দেশের দুই বড় দল। মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর পদে জয়ের মূল কারণ নেতাকর্মীদের ‘আত্মবিশ্বাস’- এমনটি মনে করছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে ভোটে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পরও এই নির্বাচনে বেশকিছু অর্জন দেখছে বিএনপি।

ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের অভিমত, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা, প্রধানমন্ত্রীর অভাবনীয় জনপ্রিয়তা ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনপ্রিয় প্রার্থী ও তাদের জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচার নগরবাসীকে আকৃষ্ট করেছে। এতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ওপর আস্থাশীল হন ঢাকাবাসী। এছাড়া সরকারবিরোধী পক্ষের মেয়র নির্বাচিত হলে দুই সিটির চলমান উন্নয়ন ঝুলে যেতে পারে- এমন শঙ্কা থেকেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের এগিয়ে রেখেছেন ভোটাররা। ফলে নির্বাচনে ঢাকাবাসী বিকল্প না ভেবে নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে আদৌ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা শনিবার অনুষ্ঠিত ভোটে প্রমাণিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্র দখল, ইভিএমে জালিয়াতিসহ ব্যাপক কারচুপির ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যমে দেখাসহ সরাসরি প্রত্যক্ষ করে সাধারণ জনগণের অনেকের কাছেই পুরো বিষয়টি এখন স্পষ্ট। এছাড়া নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপি এতদিন ধরে যে আন্দোলন করে আসছিল, তার যৌক্তিকতা জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। আর এ নির্বাচনের মাধ্যমে উজ্জীবিত হয়েছে নেতাকর্মীরাও। দীর্ঘদিন পর ঢাকার অলিগলিতে নেতাকর্মীদের পদচারণা ছিল। হামলা-মামলায় বিএনপি বিধ্বস্ত- সরকারসহ বিভিন্ন মহল যে দাবি করে আসছে, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের মতো দু’জন তরুণ নেতা পাওয়াকেও তারা অর্জন হিসেবে দেখছেন।

শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। উত্তর সিটিতে আতিকুল ইসলাম ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২১১ ভোট ও দক্ষিণ সিটিতে শেখ ফজলে নূর তাপস ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। নিকটতম বিএনপির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেন তারা।

জয়ের কারণ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি ‘আত্মবিশ্বাস’ কাজ করেছে। আর সেটি হল- মানুষ আলো ছেড়ে কখনই অন্ধকারের দিকে পা মাড়াবে না। উন্নয়ন আর সুখ-সমৃদ্ধ জীবন ছেড়ে কখনই অনুন্নত, অনিরাপদ পথে হাঁটবে না। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশের মানুষের সেই আস্থা-বিশ্বাসের সঙ্গে সিটি নির্বাচনে পুনরায় তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন ঢাকাবাসী।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, বিগত ১১ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে বর্তমান সরকার সারা দেশে অভাবনীয় উন্নয়ন করেছে। ঢাকার অধিকাংশ মানুষ গ্রাম থেকে আসা। নিজ এলাকায় অবিস্মরণীয় উন্নয়ন দেখে তারা সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট। এছাড়া ঢাকার দুই সিটির দলীয় প্রার্থী আতিক-তাপস প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থীদের থেকে অনেক জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির। তাদের দেয়া জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি- ঢাকাকে ঘিরে ৩০ বছর মেয়াদি দীর্ঘ পরিকল্পনা, ৯০ দিনের মধ্যেই মৌলিক সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, সুন্দর-সচল ও সুশাসিত-উন্নত ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি, প্রত্যেক ওয়ার্ড ধরে ধরে দুই মেয়রের পরিকল্পনাই ভোটারদের মুগ্ধ করেছে।

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, নৌকা হল উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতীক। ফলে ঢাকার উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন জনগণ তাকেই ভোট দিয়েছেন। বিএনপি নেতাদের হটকারী সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী গণসংযোগের নামে আন্দোলনের উসকানি, উন্নয়ন ছেড়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি ঢাকাবাসী ভালো চোখে নেয়নি। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি তাদের যেমন পরাজয় ডেকে এনেছে অপরদিকে সরকারের উন্নয়ন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করেছে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি তাদের জনগণ ও নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়নের প্রতি আস্থাশীল হয়ে মানুষ নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রার্থীরা যখন উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তখন বিএনপির প্রার্থীরা নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত। ঢাকাবাসী এটাকে ভালো চোখে নেয়নি। ফলে তারা পরাজিত হয়েছে। এটা তাদের রাজনীতির দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। জনগণের রায় প্রত্যাখ্যান করে হরতাল দিয়ে তারা আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। উন্নয়নের মাঠে প্রতিহিংসার রাজনীতি জনগণ আর মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মতে, সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ভোটে ‘কারচুপি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দলীয় নেতাকর্মীসহ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরা পুরো ভোটকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করেছে। পাশাপাশি ছিল সাংগঠনিক দুর্বলতা। আওয়ামী লীগের ভোটকেন্দ্র দখল প্রতিহত করা সম্ভব হলে ভোটের ফল ধানের শীষের অনুকূলে আসতে পারত।

সূত্র জানায়, উল্লিখিত অর্জন ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে দলটির হাইকমান্ড। সে ক্ষেত্রে নির্দলীয় সরকারের অধীন ফের আন্দোলন জোরদারের চিন্তাভাবনা রয়েছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন আর কোনো ভোটে অংশ না নেয়ার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবছেন তারা।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা ভোটাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা বারবার বলে আসছি। শনিবার সিটি নির্বাচনে সেটাই ফের প্রমাণিত হয়েছে। ইভিএম নিয়ে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। ভোটের পর আমাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন পুরো ভোটিং সিস্টেমটাই ধ্বংস করে ফেলেছে। এদের অধীন আর কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা ফের প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে আমরা যে আন্দোলন করছি, তা সব মহলে আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আশা করি।

তিনি বলেন, ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে তাতে বাধা দিলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। আমরা সংঘাত চাইনি। তারপরও আমাদের নেতাকর্মী যারা কেন্দ্রে গিয়েছে তাদের ঢুকতে দেয়নি। এজেন্টদের জোর করে বের করে দেয়া হয়েছে।

ফখরুল বলেন, এ নির্বাচনে দুই সিটিতে আমরা দু’জন তরুণ নেতাকে পেয়েছি, যা রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। ফলে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে স্বক্রিয় হবে বলে আশা করি।

বিএনপির অন্তত তিনজন নীতিনির্ধারক প্রায় একই সুরে যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মধ্যেও একটা চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তা আমরা পেরেছিও। এক যুগ ধরে রাজধানীর অলিগলিতে ধানের শীষের কোনো পোস্টার বা মিছিল দেখা যায়নি। সিটি নির্বাচনে আমরা সেই সুযোগ পেয়েছি।

আমাদের গণসংযোগে একটা গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। বিএনপি যে জনপ্রিয় দল, তা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ নির্বাচনে আরও একটি বড় অর্জন দুই সিটিতে তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের মতো তরুণ নেতাকে পাওয়া।

রাজধানীসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষ তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। তারা ইতিমধ্যে তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে। তাদের মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতে আরও তরুণ রাজনীতিতে সক্রিয় হবে। এ দু’জনকে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ইশরাককে মহানগর ও তাবিথকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রমোশন দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি যেমন সঞ্চারিত হয়েছে, তেমনি নেতৃত্বের ধাপে ধাপে কিছু দুর্বল দিকও বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে এখন দলের সাংগঠনিক শক্তিকে সত্যিকারার্থে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাব।

তারা আরও বলেন, ইভিএম নিয়ে আমাদের যে শঙ্কা ছিল, সেটাও প্রমাণিত। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ইভিএম বাতিলের দাবি আরও জোরালো হবে। এসব ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষেরও সমর্থন পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন ভোটে যাওয়ার ব্যাপারে নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ মনে করে, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে ভোটের মধ্যে থেকেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থাকা উচিত। আর অন্য অংশটির মতে, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন ভোটে যাওয়া মানে তাদের নৈতিকভাবে সমর্থন করা। তাদের অধীন কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, তা শনিবারও প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের পর এ সরকারের অধীন আর কোনো ভোটে না যাওয়ার পাল্লাই ভারি হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটিসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, এ ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে সরকার জনগণের রায় ছিনতাই করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এবং এ নির্বাচন কমিশনের অধীন কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আমরা ফের প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দীর্ঘদিন যে দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি, তা-ও সঠিক।

দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীই মনে করেন, এবার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ঘোষণা দিয়েও মাঠে না থাকার বিষয়টি নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা জানান, কেন্দ্র পাহারা দেয়ার প্রস্তুতি আমরা আগে থেকেই নিয়েছিলাম। বিষয়টি জানতে পেরে ভোটের দু’দিন আগে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল আমাদের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ পাওয়ার পরও আমরা তা গণমাধ্যমে জানাইনি। কারণ এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে আরও আতঙ্ক তৈরি হবে।

তারা ভোটের দিন কেন্দ্রে যাবে না। তাই সবাইকে যার যার মতো করে কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেই। কিন্তু সকাল থেকেই সব কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ক্ষমতাসীন দল। পুলিশের সহযোগিতায় তারা সেখানে পাহারা বসায়। আমাদের যে প্রস্তুতি ছিল, এর চেয়েও বেশি প্রস্তুত ছিল আওয়ামী লীগ। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রতিহত করতে যে সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োজন ছিল, সেই প্রস্তুতি ছিল না। উল্টো প্রতিরোধ করতে গেলে ভয়াবহ সংঘর্ষ হতো। এতে নেতাকর্মীদের নামে নতুন নতুন মামলা হতো। সবকিছু চিন্তা করে প্রতিরোধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে দলটির অনেক নেতা মনে করেন, কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রতিহত করতে না পারার পেছনে মহানগর নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ছিল। উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের একটা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। মহানগর নেতারা মনে করেন, এরা মেয়র নির্বাচিত হলে তাদের প্রভাব কমে যাবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে তারা কেন্দ্র পাহারা দেয়নি।

আওয়ামী লীগ-বিএনপির পর্যালোচনা

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আত্মবিশ্বাসে জয়, পরাজয়ে অর্জন

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বিজয়ে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা * দুই তরুণে মুগ্ধ হাইকমান্ড, উজ্জীবিত বিএনপির নেতাকর্মীরা
 হাবিবুর রহমান খান ও রেজাউল করিম প্লাবন 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: আত্মবিশ্বাসে জয়, পরাজয়ে অর্জন
ছবি: যুগান্তর

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের ভোটের ফল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে দেশের দুই বড় দল। মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর পদে জয়ের মূল কারণ নেতাকর্মীদের ‘আত্মবিশ্বাস’- এমনটি মনে করছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে ভোটে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পরও এই নির্বাচনে বেশকিছু অর্জন দেখছে বিএনপি। 

ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের অভিমত, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা, প্রধানমন্ত্রীর অভাবনীয় জনপ্রিয়তা ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনপ্রিয় প্রার্থী ও তাদের জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচার নগরবাসীকে আকৃষ্ট করেছে। এতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ওপর আস্থাশীল হন ঢাকাবাসী। এছাড়া সরকারবিরোধী পক্ষের মেয়র নির্বাচিত হলে দুই সিটির চলমান উন্নয়ন ঝুলে যেতে পারে- এমন শঙ্কা থেকেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের এগিয়ে রেখেছেন ভোটাররা। ফলে নির্বাচনে ঢাকাবাসী বিকল্প না ভেবে নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন। 

অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে আদৌ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা শনিবার অনুষ্ঠিত ভোটে প্রমাণিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্র দখল, ইভিএমে জালিয়াতিসহ ব্যাপক কারচুপির ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যমে দেখাসহ সরাসরি প্রত্যক্ষ করে সাধারণ জনগণের অনেকের কাছেই পুরো বিষয়টি এখন স্পষ্ট। এছাড়া নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপি এতদিন ধরে যে আন্দোলন করে আসছিল, তার যৌক্তিকতা জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। আর এ নির্বাচনের মাধ্যমে উজ্জীবিত হয়েছে নেতাকর্মীরাও। দীর্ঘদিন পর ঢাকার অলিগলিতে নেতাকর্মীদের পদচারণা ছিল। হামলা-মামলায় বিএনপি বিধ্বস্ত- সরকারসহ বিভিন্ন মহল যে দাবি করে আসছে, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের মতো দু’জন তরুণ নেতা পাওয়াকেও তারা অর্জন হিসেবে দেখছেন। 

শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। উত্তর সিটিতে আতিকুল ইসলাম ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২১১ ভোট ও দক্ষিণ সিটিতে শেখ ফজলে নূর তাপস ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। নিকটতম বিএনপির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেন তারা। 

জয়ের কারণ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি ‘আত্মবিশ্বাস’ কাজ করেছে। আর সেটি হল- মানুষ আলো ছেড়ে কখনই অন্ধকারের দিকে পা মাড়াবে না। উন্নয়ন আর সুখ-সমৃদ্ধ জীবন ছেড়ে কখনই অনুন্নত, অনিরাপদ পথে হাঁটবে না। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশের মানুষের সেই আস্থা-বিশ্বাসের সঙ্গে সিটি নির্বাচনে পুনরায় তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন ঢাকাবাসী। 

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, বিগত ১১ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে বর্তমান সরকার সারা দেশে অভাবনীয় উন্নয়ন করেছে। ঢাকার অধিকাংশ মানুষ গ্রাম থেকে আসা। নিজ এলাকায় অবিস্মরণীয় উন্নয়ন দেখে তারা সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট। এছাড়া ঢাকার দুই সিটির দলীয় প্রার্থী আতিক-তাপস প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থীদের থেকে অনেক জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির। তাদের দেয়া জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি- ঢাকাকে ঘিরে ৩০ বছর মেয়াদি দীর্ঘ পরিকল্পনা, ৯০ দিনের মধ্যেই মৌলিক সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, সুন্দর-সচল ও সুশাসিত-উন্নত ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি, প্রত্যেক ওয়ার্ড ধরে ধরে দুই মেয়রের পরিকল্পনাই ভোটারদের মুগ্ধ করেছে। 

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, নৌকা হল উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতীক। ফলে ঢাকার উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন জনগণ তাকেই ভোট দিয়েছেন। বিএনপি নেতাদের হটকারী সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী গণসংযোগের নামে আন্দোলনের উসকানি, উন্নয়ন ছেড়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি ঢাকাবাসী ভালো চোখে নেয়নি। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি তাদের যেমন পরাজয় ডেকে এনেছে অপরদিকে সরকারের উন্নয়ন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করেছে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি তাদের জনগণ ও নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়নের প্রতি আস্থাশীল হয়ে মানুষ নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রার্থীরা যখন উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তখন বিএনপির প্রার্থীরা নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত। ঢাকাবাসী এটাকে ভালো চোখে নেয়নি। ফলে তারা পরাজিত হয়েছে। এটা তাদের রাজনীতির দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। জনগণের রায় প্রত্যাখ্যান করে হরতাল দিয়ে তারা আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। উন্নয়নের মাঠে প্রতিহিংসার রাজনীতি জনগণ আর মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মতে, সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ভোটে ‘কারচুপি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দলীয় নেতাকর্মীসহ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরা পুরো ভোটকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করেছে। পাশাপাশি ছিল সাংগঠনিক দুর্বলতা। আওয়ামী লীগের ভোটকেন্দ্র দখল প্রতিহত করা সম্ভব হলে ভোটের ফল ধানের শীষের অনুকূলে আসতে পারত।

সূত্র জানায়, উল্লিখিত অর্জন ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে দলটির হাইকমান্ড। সে ক্ষেত্রে নির্দলীয় সরকারের অধীন ফের আন্দোলন জোরদারের চিন্তাভাবনা রয়েছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন আর কোনো ভোটে অংশ না নেয়ার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবছেন তারা।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা ভোটাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা বারবার বলে আসছি। শনিবার সিটি নির্বাচনে সেটাই ফের প্রমাণিত হয়েছে। ইভিএম নিয়ে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। ভোটের পর আমাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন পুরো ভোটিং সিস্টেমটাই ধ্বংস করে ফেলেছে। এদের অধীন আর কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা ফের প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে আমরা যে আন্দোলন করছি, তা সব মহলে আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আশা করি।

তিনি বলেন, ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে তাতে বাধা দিলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। আমরা সংঘাত চাইনি। তারপরও আমাদের নেতাকর্মী যারা কেন্দ্রে গিয়েছে তাদের ঢুকতে দেয়নি। এজেন্টদের জোর করে বের করে দেয়া হয়েছে।

ফখরুল বলেন, এ নির্বাচনে দুই সিটিতে আমরা দু’জন তরুণ নেতাকে পেয়েছি, যা রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। ফলে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে স্বক্রিয় হবে বলে আশা করি।

বিএনপির অন্তত তিনজন নীতিনির্ধারক প্রায় একই সুরে যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মধ্যেও একটা চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তা আমরা পেরেছিও। এক যুগ ধরে রাজধানীর অলিগলিতে ধানের শীষের কোনো পোস্টার বা মিছিল দেখা যায়নি। সিটি নির্বাচনে আমরা সেই সুযোগ পেয়েছি।

আমাদের গণসংযোগে একটা গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। বিএনপি যে জনপ্রিয় দল, তা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ নির্বাচনে আরও একটি বড় অর্জন দুই সিটিতে তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের মতো তরুণ নেতাকে পাওয়া।

রাজধানীসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষ তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। তারা ইতিমধ্যে তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে। তাদের মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতে আরও তরুণ রাজনীতিতে সক্রিয় হবে। এ দু’জনকে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ইশরাককে মহানগর ও তাবিথকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রমোশন দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি যেমন সঞ্চারিত হয়েছে, তেমনি নেতৃত্বের ধাপে ধাপে কিছু দুর্বল দিকও বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে এখন দলের সাংগঠনিক শক্তিকে সত্যিকারার্থে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাব।

তারা আরও বলেন, ইভিএম নিয়ে আমাদের যে শঙ্কা ছিল, সেটাও প্রমাণিত। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ইভিএম বাতিলের দাবি আরও জোরালো হবে। এসব ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষেরও সমর্থন পাওয়া যাবে। 

সূত্র জানায়, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন ভোটে যাওয়ার ব্যাপারে নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ মনে করে, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে ভোটের মধ্যে থেকেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থাকা উচিত। আর অন্য অংশটির মতে, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন ভোটে যাওয়া মানে তাদের নৈতিকভাবে সমর্থন করা। তাদের অধীন কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, তা শনিবারও প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের পর এ সরকারের অধীন আর কোনো ভোটে না যাওয়ার পাল্লাই ভারি হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটিসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, এ ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে সরকার জনগণের রায় ছিনতাই করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এবং এ নির্বাচন কমিশনের অধীন কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আমরা ফের প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দীর্ঘদিন যে দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি, তা-ও সঠিক।

দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীই মনে করেন, এবার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ঘোষণা দিয়েও মাঠে না থাকার বিষয়টি নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা জানান, কেন্দ্র পাহারা দেয়ার প্রস্তুতি আমরা আগে থেকেই নিয়েছিলাম। বিষয়টি জানতে পেরে ভোটের দু’দিন আগে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল আমাদের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযোগ পাওয়ার পরও আমরা তা গণমাধ্যমে জানাইনি। কারণ এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে আরও আতঙ্ক তৈরি হবে।

তারা ভোটের দিন কেন্দ্রে যাবে না। তাই সবাইকে যার যার মতো করে কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেই। কিন্তু সকাল থেকেই সব কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ক্ষমতাসীন দল। পুলিশের সহযোগিতায় তারা সেখানে পাহারা বসায়। আমাদের যে প্রস্তুতি ছিল, এর চেয়েও বেশি প্রস্তুত ছিল আওয়ামী লীগ। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রতিহত করতে যে সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োজন ছিল, সেই প্রস্তুতি ছিল না। উল্টো প্রতিরোধ করতে গেলে ভয়াবহ সংঘর্ষ হতো। এতে নেতাকর্মীদের নামে নতুন নতুন মামলা হতো। সবকিছু চিন্তা করে প্রতিরোধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে দলটির অনেক নেতা মনে করেন, কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রতিহত করতে না পারার পেছনে মহানগর নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ছিল। উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের একটা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। মহানগর নেতারা মনে করেন, এরা মেয়র নির্বাচিত হলে তাদের প্রভাব কমে যাবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে তারা কেন্দ্র পাহারা দেয়নি।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন-২০২০

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০