ঝুঁকিতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, করোনার জ্বরে কাঁপছে অর্থনীতি
jugantor
ঝুঁকিতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, করোনার জ্বরে কাঁপছে অর্থনীতি
আমদানি-রফতানির জন্য নতুন এলসি খোলা বন্ধ * কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে * মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে চালু হবে না নতুন কারখানা

  মনির হোসেন  

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের করোনাভাইরাসের জ্বরে কাঁপছে বিশ্বের অর্থনীতি। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্ধ নতুন এলসিও (ঋণপত্র)।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিসিসিআই) হিসেবে ইতিমধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)। চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এ পরিমাণ ক্ষতি হবে।

চীনের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করছেন- এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশকে তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগির অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্য। আটকে গেছে শত শত এলসি।

এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বহু ব্যবসায়ী। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। অন্যদিকে করোনার আতঙ্কে বাংলাদেশে ২০ টাকার মাস্ক ১শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও দামি মাস্ক বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা।

জানতে চাইলে বিসিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম আজিজুল আকিল মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, এই ভাইরাসের আতঙ্কে ইতিমধ্যে দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ। আমরা চেম্বারের পক্ষ থেকে একটি হিসাব করে দেখেছি। ইতিমধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঝুঁকিতে।

আর চলতি ফেব্রুয়ারি মাস এটি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের দেড় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, এর প্রায় পুরোটাই আমদানি-বাণিজ্য।

এর মধ্যে বড় অংশই মেগা প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য আনা পণ্য। এ ছাড়াও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি রয়েছে। তার মতে, এ অবস্থা যতই দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়বে। তিনি বলেন, এই ভাইরাস নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে। যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে চীনে নতুন করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির সরকারি হিসাবেই ইতিমধ্যে এ ভাইরাসে ২১ হাজার আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৪২৫ জন। বন্ধ রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্ব অর্থনীতি, শেয়ারবাজার এবং আমদানি রফতানিতে এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য-পর্যটন ক্ষেত্রে চীন যেমন ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে; একইভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বহু দেশেই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কারও শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়েনি। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, উন্নয়ন ও ভ্রমণকেন্দ্রিক যোগাযোগের পরিসর অনেক বড় থাকায় জনস্বাস্থ্য যেমন পড়েছে ঝুঁকির মুখে, তেমনি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যও প্রবল ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে চীন থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, বিভিন্ন খেলনা এবং খাদ্যসামগ্রী। বর্তমানে সব ধরনের আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশটির কর্মকর্তাদের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি দেয়া হয়েছে।

এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি চীনা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে তারা এসব পণ্য সরবরাহ শুরু করবে কি না। অনেক দেশ চীনের সঙ্গে আকাশপথে বিমান চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশও চীনের নাগরিকদের আগমনী ভিসা বন্ধ করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এসেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, চীন থেকে আমরা বিশাল অঙ্কের পণ্য আমদানি করি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্পকারখানায় ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দেশটিতে রফতানিও রয়েছে।

ভাইরাসের কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিসিসিসিআইয়ের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এই সম্ভাবনায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে। কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ না এগোলে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়ও। বাংলাদেশে কর্মরত অনেক চীনা সে দেশে আটকা পড়েছেন। আর সময়মতো কাজ না এগোলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে বা বাড়ানোর অজুহাত তোলা হতে পারে।

কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন। শুধু পদ্মা সেতুতেই চীনের ১১০০ নাগরিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ছুটিতে দেশে গিয়েছিলেন ২৫০ জন। এ ছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত আছেন। এসব প্রকল্পে দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন।

তার বাইরে আরও কিছু প্রকল্পে ৫০০ চীনা নাগরিক সহায়তা করছেন। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত ৩৫ চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত চীনের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের ফেরা অনিশ্চিত। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, ঋণ, অনুদান, বিনিয়োগ এবং বড় প্রকল্পগুলোয় ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছে চীন। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

বর্তমানে প্রায় ৪শ’ চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করছে। এ ছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংকার এবং বীমা মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এ ছাড়াও কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

ওই সময়ে দেশটির ২৭টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল। ওই সফরের আগে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াং বলেছিলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে এক নম্বর হতে চায় চীন। এরপর গত বছরে ১-৫ জুলাই ৫ দিনের সফরে চীনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময়ে দেশটির সঙ্গে ৯টি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।

বতর্মানে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীন। এসব প্রকল্পে দেশটির মোট সহায়তার পরিমাণ ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড হাইওয়ের ১৬০ কোটি ডলার, তথ্য-প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে ১৫ কোটি ডলার, কর্ণফুলী টানেলে ৭০ কোটি, রাজশাহী ওয়াসায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ৫০ কোটি ডলার, বিদ্যুৎ খাতের ডিপিসিতে পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্কে ৫০ কোটি, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের দুই প্রকল্পে ২৫৮ কোটি ডলার, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসে ১৪০ কোটি ডলার, পাওয়ার গ্রিডে ১৩২ কোটি ডলার এবং টেলিকমিউনিকেশন আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার সহায়তা করছে চীন। এ ছাড়াও আরও ৯টি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রকল্পে সহায়তার পরিমাণ ৮০৮ কোটি ডলার।

তবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে দেশে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে চীনে ৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ।

স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১১ বিলিয়ন ডলার বা ৯৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে চীনে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্ট শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে ২০১৮ সালে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। আর বিশ্বের চীনের অবস্থান দ্বিতীয়।

আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩০২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে চীনের জিডিপি ছিল ১২ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে চীনের জিডিপির আকার ৫৫ গুণ বেশি। তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে ৪০ শতাংশই চীনের দখলে।

বাংলাদেশ চীন থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে এর মধ্যে রয়েছে- টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সার, টায়ার, লৌহ ও ইস্পাত, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও গম।

অন্যদিকে বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রফতানি করে এগুলো হল- চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, তৈরি পোশাক এবং মৎস্যজাতীয় পণ্য। এ ছাড়াও বর্তমানে চীনে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্ট শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।

ঝুঁকিতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, করোনার জ্বরে কাঁপছে অর্থনীতি

আমদানি-রফতানির জন্য নতুন এলসি খোলা বন্ধ * কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে * মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে চালু হবে না নতুন কারখানা
 মনির হোসেন 
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের করোনাভাইরাসের জ্বরে কাঁপছে বিশ্বের অর্থনীতি। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্ধ নতুন এলসিও (ঋণপত্র)।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিসিসিআই) হিসেবে ইতিমধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)। চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এ পরিমাণ ক্ষতি হবে।

চীনের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করছেন- এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশকে তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগির অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্য। আটকে গেছে শত শত এলসি।

এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বহু ব্যবসায়ী। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। অন্যদিকে করোনার আতঙ্কে বাংলাদেশে ২০ টাকার মাস্ক ১শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও দামি মাস্ক বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা।

জানতে চাইলে বিসিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম আজিজুল আকিল মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, এই ভাইরাসের আতঙ্কে ইতিমধ্যে দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ। আমরা চেম্বারের পক্ষ থেকে একটি হিসাব করে দেখেছি। ইতিমধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঝুঁকিতে।

আর চলতি ফেব্রুয়ারি মাস এটি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের দেড় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, এর প্রায় পুরোটাই আমদানি-বাণিজ্য।

এর মধ্যে বড় অংশই মেগা প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য আনা পণ্য। এ ছাড়াও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি রয়েছে। তার মতে, এ অবস্থা যতই দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়বে। তিনি বলেন, এই ভাইরাস নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে। যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে চীনে নতুন করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির সরকারি হিসাবেই ইতিমধ্যে এ ভাইরাসে ২১ হাজার আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৪২৫ জন। বন্ধ রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্ব অর্থনীতি, শেয়ারবাজার এবং আমদানি রফতানিতে এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য-পর্যটন ক্ষেত্রে চীন যেমন ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে; একইভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বহু দেশেই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কারও শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়েনি। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, উন্নয়ন ও ভ্রমণকেন্দ্রিক যোগাযোগের পরিসর অনেক বড় থাকায় জনস্বাস্থ্য যেমন পড়েছে ঝুঁকির মুখে, তেমনি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যও প্রবল ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে চীন থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, বিভিন্ন খেলনা এবং খাদ্যসামগ্রী। বর্তমানে সব ধরনের আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশটির কর্মকর্তাদের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি দেয়া হয়েছে।

এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি চীনা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে তারা এসব পণ্য সরবরাহ শুরু করবে কি না। অনেক দেশ চীনের সঙ্গে আকাশপথে বিমান চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশও চীনের নাগরিকদের আগমনী ভিসা বন্ধ করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এসেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, চীন থেকে আমরা বিশাল অঙ্কের পণ্য আমদানি করি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্পকারখানায় ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দেশটিতে রফতানিও রয়েছে।

ভাইরাসের কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিসিসিসিআইয়ের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এই সম্ভাবনায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে।  কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ না এগোলে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়ও। বাংলাদেশে কর্মরত অনেক চীনা সে দেশে আটকা পড়েছেন। আর সময়মতো কাজ না এগোলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে বা বাড়ানোর অজুহাত তোলা হতে পারে।

কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন। শুধু পদ্মা সেতুতেই চীনের ১১০০ নাগরিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ছুটিতে দেশে গিয়েছিলেন ২৫০ জন। এ ছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত আছেন। এসব প্রকল্পে দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন।

তার বাইরে আরও কিছু প্রকল্পে ৫০০ চীনা নাগরিক সহায়তা করছেন। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত ৩৫ চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত চীনের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের ফেরা অনিশ্চিত। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, ঋণ, অনুদান, বিনিয়োগ এবং বড় প্রকল্পগুলোয় ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছে চীন। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

বর্তমানে প্রায় ৪শ’ চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করছে। এ ছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংকার এবং বীমা মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এ ছাড়াও কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

ওই সময়ে দেশটির ২৭টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল। ওই সফরের আগে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াং বলেছিলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে এক নম্বর হতে চায় চীন। এরপর গত বছরে ১-৫ জুলাই ৫ দিনের সফরে চীনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময়ে দেশটির সঙ্গে ৯টি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।

বতর্মানে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীন। এসব প্রকল্পে দেশটির মোট সহায়তার পরিমাণ ১ হাজার ১১৫ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড হাইওয়ের ১৬০ কোটি ডলার, তথ্য-প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে ১৫ কোটি ডলার, কর্ণফুলী টানেলে ৭০ কোটি, রাজশাহী ওয়াসায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ৫০ কোটি ডলার, বিদ্যুৎ খাতের ডিপিসিতে পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্কে ৫০ কোটি, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের দুই প্রকল্পে ২৫৮ কোটি ডলার, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসে ১৪০ কোটি ডলার, পাওয়ার গ্রিডে ১৩২ কোটি ডলার এবং টেলিকমিউনিকেশন আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার সহায়তা করছে চীন। এ ছাড়াও আরও ৯টি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রকল্পে সহায়তার পরিমাণ ৮০৮ কোটি ডলার।

তবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে দেশে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে চীনে ৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ।

স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১১ বিলিয়ন ডলার বা ৯৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে চীনে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্ট শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে ২০১৮ সালে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। আর বিশ্বের চীনের অবস্থান দ্বিতীয়।

আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩০২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে চীনের জিডিপি ছিল ১২ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে চীনের জিডিপির আকার ৫৫ গুণ বেশি। তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে ৪০ শতাংশই চীনের দখলে।

বাংলাদেশ চীন থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে এর মধ্যে রয়েছে- টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সার, টায়ার, লৌহ ও ইস্পাত, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও গম।

অন্যদিকে বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রফতানি করে এগুলো হল- চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, তৈরি পোশাক এবং মৎস্যজাতীয় পণ্য। এ ছাড়াও বর্তমানে চীনে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্ট শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস