দুই মেয়রের ১২ চ্যালেঞ্জ
jugantor
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
দুই মেয়রের ১২ চ্যালেঞ্জ
জনগণের আস্থা অর্জনে সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, টেকসই মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যানজট-জলজট নিরসন, পুরান ঢাকা ও নতুন ৩৬ ওয়ার্ডকে সচল করাই অন্যতম প্রধান কাজ

  মতিন আব্দুল্লাহ  

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে কমপক্ষে ১২টি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে- এমন মন্তব্য করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- জনগণের আস্থা অর্জনে সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, টেকসই মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যানজট-জলজট নিরসন, পুরান ঢাকা ও নতুন ৩৬ ওয়ার্ডকে সচল করা। এগুলো মোকাবেলা করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলেই দলমত নির্বিশেষে নগরবাসীর কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হবে।

দুই মেয়রের অন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়ন, নগর সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা, ফুটপাতগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা এবং দুই সিটির নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি।

নবনির্বাচিত দুই মেয়র বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে না পারলে তাদের মেয়াদকালে নগরীর টেকসই উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সহজতর করতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। উপরন্তু সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

শনিবার অনুষ্ঠিত দুই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী- উত্তরে আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

অপরিকল্পিত ও দূষণে আক্রান্ত নগরীকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন ঢাকা দক্ষিণের আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। এতে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকা- এ পাঁচ শিরোনামের রূপরেখা রয়েছে। ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে।

অন্যদিকে সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে ত্রিমুখী ইশতেহার উপস্থাপন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। ‘সবাই মিলে সবার ঢাকা’ স্লোগানকে সামনে রেখে তৈরি ইশতেহারে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন উন্নত বিশ্বের মতো বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারীদের জন্য নিরাপদ নগরী, দখল ও দূষণমুক্ত নগরী, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক, ছিন্নমূল পুনর্বাসন, অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সমস্যা সমাধান, অনলাইনে সেবা প্রদান, ঢাকাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জনতার মুখোমুখি হওয়ার মতো বিষয়গুলো।

জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, নগর পিতা বা মেয়রকে মানুষ মূল্যায়ন করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে।

এবার আমরা যে দু’জন মেয়র পেলাম তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোট তারা পাননি। এ কারণে দুই মেয়রের জন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সব নগরবাসীর আস্থা অর্জন করতে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। যদি তারা নাগরিক সেবা প্রদানে টেকসই উন্নয়ন ও সেবা প্রাপ্তি সহজতর করতে পারেন- তাহলে তারা সফল হবে।

এজন্য সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করে খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ন্ত্রণ, ব্লেমগেম বন্ধ করে সুষ্ঠু পরিকল্পা গ্রহণ করে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, নগরীতে যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনআকাঙ্ক্ষা ও জনদুর্ভোগ বিবেচনায় রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের ১৪টি স্থায়ী কমিটিকে কার্যকর করাসহ খেলার মাঠ, জলমহাল ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কমিটি গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে প্রথম থেকে এসব দিক বিবেচনায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ বা দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা পেশাজীবীদের সহায়তা নিতে হবে। তাহলে তাদের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হবে এবং নগরবাসী বেশি সুবিধা পাবেন।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, এবারের দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে। এজন্য জনগণের আস্থা ফেরানো হবে দুই মেয়রের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। আর এটা করতে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।

শহরের সামগ্রিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক জনবান্ধব উন্নয়ন কাজ করতে হবে। এতে সব জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের স্রোতধারায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শহরের বাঢুর মান খুবই খারাপ। বিভিন্ন জরিপে বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষ কয়েকটি শহরের মধ্যে ঢাকা স্থান করে নিয়েছে।

সে কারণে শহরের জনগোষ্ঠী আস্থা অর্জনে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এলাকাভিত্তিক সড়ক ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, জলাশয় দখল ভরাটে এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন, ফুটপাতের হকার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

এক্ষেত্রে প্রথমে দুই মেয়র গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাতের তালিকা প্রণয়ন করে আইডি কার্ড প্রদান করে ধারাবাহিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এছাড়া যানজট ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফুটওভার ব্রিজগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে।

খেলার মাঠ ও পার্কগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা দুই মেয়রের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা এসব খেলার মাঠ ও পার্কগুলো বিভিন্ন ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেসব মাঠে সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারছে না। এসব জনহিত কাজে দুই মেয়র নেতৃত্ব দিলে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শহরের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা দুই মেয়রের জন্য অনেকাংশে সহজ হবে।

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়রদের সামনে বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরের মেয়রের জন্য নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের করুণ অবস্থা। ওই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। নেই পার্ক ও খেলার মাঠ।

জলাধার সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ওই এলাকার বাসিন্দারা আন্তরিক নন। ওই এলাকার সমস্যা সমাধান করে পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারায় ফেরানো বড় কঠিন হবে। তবে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পেশাজীবীদের পরামর্শ নিয়ে শহরের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আর দক্ষিণের মেয়রের জন্য পুরান ঢাকাকে সচল করাই হবে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কেননা পুরান ঢাকায় বহুসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সেসব ভবন অপসারণ বা সংস্কার করে ওই এলাকাকে নিরাপদ করতে হবে।

যেটা করতে ওই এলাকার বাসিন্দারা আন্তরিক নন। এছাড়া পুরান ঢাকার সড়ক খুবই সরু, সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে। ওই এলাকায় গড়ে ওঠেনি কোনো পার্কিং স্পেস। দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র ঘোষণা দিয়েছেন, পুরান ঢাকাকে দর্শনীয় স্পটে পরিণত করবেন। এটা করতে হলে পর্যটকদের ওই এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য যানজটমুক্ত সড়ক ও পার্কিং স্পেস তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, পুরান ঢাকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করার ফর্মুলা রয়েছে। সংশোধিত ড্যাপে রিডেভেলপমেন্ট বা ভূমির পুনঃউন্নয়নের সুপারিশ রাখা হয়েছে। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণের মেয়র এ উদ্যোগ গ্রহণ করলে পুরান ঢাকাকেও বাসযোগ্য করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, এর বাইরে শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা; যেটা এখনও গড়ে ওঠেনি। যানজট, জলজট নিরসন এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনয়ন, এলাকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বিভাজন বা স্কুল জোনিং করা এবং ফুটপাতগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা।

মশক নিয়ন্ত্রণ : এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত বছর শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আর ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সমগ্র দেশের মানুষ মারাত্মক দুর্ভোগের শিকার হন। এজন্য ব্যর্থতা ছিল দুই সিটি মেয়রের। তারা মানহীন ওষুধ ব্যবহার করে জনগণকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

সঠিকভাবে শহরের নালা-নর্দমা বা আবর্জনা পরিষ্কার হয়নি। তার খেসারত দিতে হয়েছে সরকারকেও। জনগণের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগসহ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। সে সময় বছরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিলেও শহরে মশক নিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।

ঢাকা দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয় দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এডিস মশার প্রজনন মৌসুম শুরু হবে। সেজন্য মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যানজট : যানজট শহরের গতিবেগ কমিয়ে দিয়েছে। নগরবাসী বাসা থেকে বেরিয়ে কখন গন্তব্যে পৌঁছাবেন তা নিশ্চিত ধারণা থাকে না। এক ঘণ্টার দূরত্ব পাড়ি দিতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

বিশেষ করে পুরান ঢাকা, কর্মব্যস্ত মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, অভিজাত গুলশান, মিরপুর, মিরপুর রোড ধানমণ্ডি প্রভৃতি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিত্যদিনই যানজটের কঠিন ধকল সামলাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সরাসরি এর পুরো দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের না হলেও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। যানজট নিরসনের সফলতা-ব্যর্থতার ওপরও তাদের জনআস্থা অর্জন নির্ভর করবে।

জলজট : প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে রাজধানী ঢাকায় হাঁটুজল জমে যায়। কোথাও কোথাও কোমর পানিও জমে যায়। নৌকা চলে সড়কে। খানাখন্দে পড়ে হতাহত হন নগরবাসী। প্রতি বর্ষার মৌসুমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো পরের বছর আর জলাবদ্ধতা হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না।

খাল, জলাধার এবং পানি নিষ্কাশন নালা পরিষ্কার করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের নেতৃত্ব প্রদান করে দুই মেয়রকে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে হবে।

পুরান ঢাকা সচল করা : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) পুরান ঢাকা অধ্যুষিত। শহরের এ অংশে ঘিঞ্জিভাবে উন্নয়ন হয়েছে। সরু সড়ক, কোথাও নেই পার্কিং ব্যবস্থা। পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণ করা হচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধান করে পুরান ঢাকাকে বাস উপযোগী করার কাজের নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে।

দুই সিটির নতুন ৩৬ ওয়ার্ড : ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পূর্বাঞ্চলের ১৬টি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করে দুই সিটিতে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এ ৩৬টি ওয়ার্ডের নাগরিক সুবিধা ও নগরায়ণের চিত্র খুবই করুণ।

সড়ক যোগাযোগ, খেলার মাঠ, পার্ক, জলাশয় নেই বললেই চলে। এলাকাবাসী নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সব ভরাট করে ফেলছে। ভবন বা মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন মানার প্রয়োজন বোধ করছেন না। এ কারণে ওই এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গড়ে উঠছে।

বিশেষ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উত্তরখান, দক্ষিণখান, ডুমনি, হরিরামপুর, ভাটারা, বেরাইদসহ অন্যান্য এলাকায় সড়ক যোগাযোগ নেই বললেই চলে। জমি অধিগ্রহণ করে নতুন সড়ক তৈরি, পার্ক ও খেলার মাঠ এবং পাবলিক স্পেস তৈরি করে ওই এলাকাকে বাসযোগ্য করতে ডিএনসিসি মেয়রকে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা : দুই সিটিতে দৈনিক প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে সনাতনী পদ্ধতিতে দুই সিটি কর্পোরেশন ৭০ ভাগ ময়লা অপসারণ করছে। আর ৩০ ভাগ বর্জ্য এখনও অপসারণ করতে পারছে না। এসব বর্জ্য শহরের নদীনালা, খাল-জলাশয়ে মিশছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে শহরে মশার প্রজনন বাড়ছে, বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে এবং নানাবিধ রোগব্যাধি হচ্ছে।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা : গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর এ কাজের দায়িত্ব পড়ে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনের ওপর। ডিএনসিসি মেয়রকেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এ উদ্যোগ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।

সেবা সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় : স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০১৯ এ মেয়রকে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এযাবৎকালের মেয়ররা সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফুটপাত ব্যবহার উপযোগী করা : শহরের বেশির ভাগ ফুটপাত হকার বা অন্যান্য দখলদারদের কবলে। ডিএসসিসি মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও নানামুখী বাধায় তিনি সরে এসেছেন।

বায়ুদূষণ প্রতিরোধ : বহুবিধ কারণে শহরের বায়ুর মান খুবই খারাপ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। নগরবাসীকে নানাবিধ রোগব্যাধি থেকে বাঁচাতে বায়ুর মান উন্নয়ন করতে হবে।

দুই সিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি : ঢাকা দক্ষিণ সিটির পুরান এলাকার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে ৪০ ভাগ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নতুন এলাকায় শতভাগ জনবল ঘাটতি। ঢাকা দক্ষিণ সিটির পুরান এলাকায় ৬০ ভাগ জনবলের ঘাটতি এবং নতুন এলাকায় শতভাগ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয় রাজধানীতে বাসযোগ্য করতে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেসব বাস্তবায়ন করতে হবে তাদের প্রথমে দুই সংস্থার জনবলের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন

দুই মেয়রের ১২ চ্যালেঞ্জ

জনগণের আস্থা অর্জনে সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, টেকসই মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যানজট-জলজট নিরসন, পুরান ঢাকা ও নতুন ৩৬ ওয়ার্ডকে সচল করাই অন্যতম প্রধান কাজ
 মতিন আব্দুল্লাহ 
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে কমপক্ষে ১২টি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে- এমন মন্তব্য করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- জনগণের আস্থা অর্জনে সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, টেকসই মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যানজট-জলজট নিরসন, পুরান ঢাকা ও নতুন ৩৬ ওয়ার্ডকে সচল করা। এগুলো মোকাবেলা করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলেই দলমত নির্বিশেষে নগরবাসীর কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হবে।

দুই মেয়রের অন্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়ন, নগর সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা, ফুটপাতগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা এবং দুই সিটির নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি।

নবনির্বাচিত দুই মেয়র বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে না পারলে তাদের মেয়াদকালে নগরীর টেকসই উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সহজতর করতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। উপরন্তু সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

শনিবার অনুষ্ঠিত দুই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী- উত্তরে আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

অপরিকল্পিত ও দূষণে আক্রান্ত নগরীকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন ঢাকা দক্ষিণের আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। এতে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকা- এ পাঁচ শিরোনামের রূপরেখা রয়েছে। ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে।

অন্যদিকে সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে ত্রিমুখী ইশতেহার উপস্থাপন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। ‘সবাই মিলে সবার ঢাকা’ স্লোগানকে সামনে রেখে তৈরি ইশতেহারে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন উন্নত বিশ্বের মতো বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারীদের জন্য নিরাপদ নগরী, দখল ও দূষণমুক্ত নগরী, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক, ছিন্নমূল পুনর্বাসন, অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সমস্যা সমাধান, অনলাইনে সেবা প্রদান, ঢাকাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জনতার মুখোমুখি হওয়ার মতো বিষয়গুলো।

জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, নগর পিতা বা মেয়রকে মানুষ মূল্যায়ন করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে।

এবার আমরা যে দু’জন মেয়র পেলাম তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোট তারা পাননি। এ কারণে দুই মেয়রের জন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সব নগরবাসীর আস্থা অর্জন করতে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। যদি তারা নাগরিক সেবা প্রদানে টেকসই উন্নয়ন ও সেবা প্রাপ্তি সহজতর করতে পারেন- তাহলে তারা সফল হবে।

এজন্য সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করে খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ন্ত্রণ, ব্লেমগেম বন্ধ করে সুষ্ঠু পরিকল্পা গ্রহণ করে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, নগরীতে যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনআকাঙ্ক্ষা ও জনদুর্ভোগ বিবেচনায় রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের ১৪টি স্থায়ী কমিটিকে কার্যকর করাসহ খেলার মাঠ, জলমহাল ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কমিটি গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নবনির্বাচিত দুই মেয়রকে প্রথম থেকে এসব দিক বিবেচনায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ বা দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা পেশাজীবীদের সহায়তা নিতে হবে। তাহলে তাদের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হবে এবং নগরবাসী বেশি সুবিধা পাবেন।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, এবারের দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে। এজন্য জনগণের আস্থা ফেরানো হবে দুই মেয়রের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। আর এটা করতে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।

শহরের সামগ্রিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক জনবান্ধব উন্নয়ন কাজ করতে হবে। এতে সব জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের স্রোতধারায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শহরের বাঢুর মান খুবই খারাপ। বিভিন্ন জরিপে বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষ কয়েকটি শহরের মধ্যে ঢাকা স্থান করে নিয়েছে।

সে কারণে শহরের জনগোষ্ঠী আস্থা অর্জনে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এলাকাভিত্তিক সড়ক ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, জলাশয় দখল ভরাটে এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন, ফুটপাতের হকার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

এক্ষেত্রে প্রথমে দুই মেয়র গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাতের তালিকা প্রণয়ন করে আইডি কার্ড প্রদান করে ধারাবাহিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এছাড়া যানজট ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফুটওভার ব্রিজগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে।

খেলার মাঠ ও পার্কগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা দুই মেয়রের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা এসব খেলার মাঠ ও পার্কগুলো বিভিন্ন ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেসব মাঠে সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারছে না। এসব জনহিত কাজে দুই মেয়র নেতৃত্ব দিলে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শহরের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা দুই মেয়রের জন্য অনেকাংশে সহজ হবে।

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়রদের সামনে বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরের মেয়রের জন্য নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের করুণ অবস্থা। ওই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। নেই পার্ক ও খেলার মাঠ।

জলাধার সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ওই এলাকার বাসিন্দারা আন্তরিক নন। ওই এলাকার সমস্যা সমাধান করে পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারায় ফেরানো বড় কঠিন হবে। তবে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পেশাজীবীদের পরামর্শ নিয়ে শহরের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আর দক্ষিণের মেয়রের জন্য পুরান ঢাকাকে সচল করাই হবে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কেননা পুরান ঢাকায় বহুসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সেসব ভবন অপসারণ বা সংস্কার করে ওই এলাকাকে নিরাপদ করতে হবে।

যেটা করতে ওই এলাকার বাসিন্দারা আন্তরিক নন। এছাড়া পুরান ঢাকার সড়ক খুবই সরু, সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে। ওই এলাকায় গড়ে ওঠেনি কোনো পার্কিং স্পেস। দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র ঘোষণা দিয়েছেন, পুরান ঢাকাকে দর্শনীয় স্পটে পরিণত করবেন। এটা করতে হলে পর্যটকদের ওই এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য যানজটমুক্ত সড়ক ও পার্কিং স্পেস তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, পুরান ঢাকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করার ফর্মুলা রয়েছে। সংশোধিত ড্যাপে রিডেভেলপমেন্ট বা ভূমির পুনঃউন্নয়নের সুপারিশ রাখা হয়েছে। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণের মেয়র এ উদ্যোগ গ্রহণ করলে পুরান ঢাকাকেও বাসযোগ্য করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, এর বাইরে শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা; যেটা এখনও গড়ে ওঠেনি। যানজট, জলজট নিরসন এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনয়ন, এলাকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বিভাজন বা স্কুল জোনিং করা এবং ফুটপাতগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করা।

মশক নিয়ন্ত্রণ : এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত বছর শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আর ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সমগ্র দেশের মানুষ মারাত্মক দুর্ভোগের শিকার হন। এজন্য ব্যর্থতা ছিল দুই সিটি মেয়রের। তারা মানহীন ওষুধ ব্যবহার করে জনগণকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

সঠিকভাবে শহরের নালা-নর্দমা বা আবর্জনা পরিষ্কার হয়নি। তার খেসারত দিতে হয়েছে সরকারকেও। জনগণের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগসহ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। সে সময় বছরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিলেও শহরে মশক নিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।

ঢাকা দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয় দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এডিস মশার প্রজনন মৌসুম শুরু হবে। সেজন্য মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যানজট : যানজট শহরের গতিবেগ কমিয়ে দিয়েছে। নগরবাসী বাসা থেকে বেরিয়ে কখন গন্তব্যে পৌঁছাবেন তা নিশ্চিত ধারণা থাকে না। এক ঘণ্টার দূরত্ব পাড়ি দিতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

বিশেষ করে পুরান ঢাকা, কর্মব্যস্ত মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, অভিজাত গুলশান, মিরপুর, মিরপুর রোড ধানমণ্ডি প্রভৃতি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিত্যদিনই যানজটের কঠিন ধকল সামলাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সরাসরি এর পুরো দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের না হলেও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। যানজট নিরসনের সফলতা-ব্যর্থতার ওপরও তাদের জনআস্থা অর্জন নির্ভর করবে।

জলজট : প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে রাজধানী ঢাকায় হাঁটুজল জমে যায়। কোথাও কোথাও কোমর পানিও জমে যায়। নৌকা চলে সড়কে। খানাখন্দে পড়ে হতাহত হন নগরবাসী। প্রতি বর্ষার মৌসুমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো পরের বছর আর জলাবদ্ধতা হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না।

খাল, জলাধার এবং পানি নিষ্কাশন নালা পরিষ্কার করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের নেতৃত্ব প্রদান করে দুই মেয়রকে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে হবে।

পুরান ঢাকা সচল করা : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) পুরান ঢাকা অধ্যুষিত। শহরের এ অংশে ঘিঞ্জিভাবে উন্নয়ন হয়েছে। সরু সড়ক, কোথাও নেই পার্কিং ব্যবস্থা। পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণ করা হচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধান করে পুরান ঢাকাকে বাস উপযোগী করার কাজের নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে।

দুই সিটির নতুন ৩৬ ওয়ার্ড : ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পূর্বাঞ্চলের ১৬টি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করে দুই সিটিতে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এ ৩৬টি ওয়ার্ডের নাগরিক সুবিধা ও নগরায়ণের চিত্র খুবই করুণ।

সড়ক যোগাযোগ, খেলার মাঠ, পার্ক, জলাশয় নেই বললেই চলে। এলাকাবাসী নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সব ভরাট করে ফেলছে। ভবন বা মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন মানার প্রয়োজন বোধ করছেন না। এ কারণে ওই এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গড়ে উঠছে।

বিশেষ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উত্তরখান, দক্ষিণখান, ডুমনি, হরিরামপুর, ভাটারা, বেরাইদসহ অন্যান্য এলাকায় সড়ক যোগাযোগ নেই বললেই চলে। জমি অধিগ্রহণ করে নতুন সড়ক তৈরি, পার্ক ও খেলার মাঠ এবং পাবলিক স্পেস তৈরি করে ওই এলাকাকে বাসযোগ্য করতে ডিএনসিসি মেয়রকে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা : দুই সিটিতে দৈনিক প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে সনাতনী পদ্ধতিতে দুই সিটি কর্পোরেশন ৭০ ভাগ ময়লা অপসারণ করছে। আর ৩০ ভাগ বর্জ্য এখনও অপসারণ করতে পারছে না। এসব বর্জ্য শহরের নদীনালা, খাল-জলাশয়ে মিশছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে শহরে মশার প্রজনন বাড়ছে, বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে এবং নানাবিধ রোগব্যাধি হচ্ছে।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা : গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর এ কাজের দায়িত্ব পড়ে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনের ওপর। ডিএনসিসি মেয়রকেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এ উদ্যোগ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।

সেবা সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় : স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০১৯ এ মেয়রকে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এযাবৎকালের মেয়ররা সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফুটপাত ব্যবহার উপযোগী করা : শহরের বেশির ভাগ ফুটপাত হকার বা অন্যান্য দখলদারদের কবলে। ডিএসসিসি মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও নানামুখী বাধায় তিনি সরে এসেছেন।

বায়ুদূষণ প্রতিরোধ : বহুবিধ কারণে শহরের বায়ুর মান খুবই খারাপ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। নগরবাসীকে নানাবিধ রোগব্যাধি থেকে বাঁচাতে বায়ুর মান উন্নয়ন করতে হবে।

দুই সিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি : ঢাকা দক্ষিণ সিটির পুরান এলাকার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে ৪০ ভাগ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নতুন এলাকায় শতভাগ জনবল ঘাটতি। ঢাকা দক্ষিণ সিটির পুরান এলাকায় ৬০ ভাগ জনবলের ঘাটতি এবং নতুন এলাকায় শতভাগ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নবনির্বাচিত মেয়রদ্বয় রাজধানীতে বাসযোগ্য করতে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেসব বাস্তবায়ন করতে হবে তাদের প্রথমে দুই সংস্থার জনবলের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন-২০২০

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০