ফল বাতিল করে দুই সিটির পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন ফখরুল
jugantor
ফল বাতিল করে দুই সিটির পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন ফখরুল
ইভিএমের সব তথ্য প্রকাশের আহ্বান তাবিথ-ইশরাকের * ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা, ইভিএমে ভোট কারচুপি, সন্ত্রাসীদের হামলার তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন

  যুগান্তর রিপোর্ট  

০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মির্জা ফখরুল
মির্জা ফখরুল। ফাইল ছবি

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি- এমন অভিযোগ এনে অবিলম্বে ভোটের ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। এজন্য প্রকৃতপক্ষে সিটি নির্বাচনে ৭-৯ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাই ফল বাতিল করে নতুন নির্বাচনের আহ্বান করছি।

বুধবার দুপুরে রাজধানী গুলশানের ইমানুয়েল ব্যাংকুয়েট হলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তাবিথ আউয়াল ও ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তারা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে ক্ষমতাসীন দলের বাধা, ইভিএমে ভোট কারচুপি, সন্ত্রাসীদের হামলার তথ্য-উপাত্ত ভিডিওর মাধ্যমে গণমাধ্যমের কাছে পৃথকভাবে তুলে ধরেন তাবিথ ও ইশরাক।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছে। উদ্দেশ্য একটাই ১৯৭৫ সালে যে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েও তারা করতে পারেনি। এখন বিভিন্ন কৌশলে বাকশালের মতো সেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চলেছে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে গত ১০-১২ বছরে আওয়ামী লীগের অধীনে কখনও কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। সেই কারণেই আমরা বারবার বলছি যে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যা আগে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই ব্যবস্থার অধীনে এবং একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনার মধ্য দিয়ে এ নির্বাচন সমাধান করতে হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধান হতে পারে। দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কখনোই সম্ভব না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন সিটি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। তাবিথ আউয়াল বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষের মূল কৌশলই ছিল ভোটাররা যেন কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে। আর পারলেও যেন কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে ভোট দিতে না পারে। উদ্দেশ্যটাই ছিল ভোটাররা যাতে ভোট দিতে না পারে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে ফেইক (ভুয়া) লাইন করা হয়েছে। যাতে তারা কেন্দ্রে না যেতে পারেন। ভেতরে কেন্দ্র খালি, কিন্তু বাইরে একই দলের একই কর্মী বাহিনী জড়ো হয়ে আছে- এরকম চিত্র দেখা গেছে বিভিন্ন জায়গায়। শুধু ধানের শীষ নয়, অন্যান্য দলের প্রার্থীদের ভোটারদেরও কেন্দ্রে ভেতরে যাতে ঢুকতে না পারে তার পরিকল্পনা ক্ষমতাসীন দল করেছে আগে থেকেই।

তাবিথ আউয়াল বলেন, আমি জোরালোভাবে বলতে চাই, পরিকল্পিত ‘প্ল্যান’ ছিল যাতে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না আসতে পারে। নির্বাচন কমিশন সব নির্বাচনী আইন নিজেরা ভঙ্গ করেছে, অন্যদের ওইসব আইন ভঙ্গ করার জন্য তারা উৎসাহ দিয়েছে। অবিলম্বে এ ফলাফল স্থগিত করে আমি দাবি জানাচ্ছি, আমাদের সামনে সব তথ্য পেশ করা হোক, সব কাগজ পেশ করা হোক।

তিনি বলেন, একটা উদাহরণ দিচ্ছি- ১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মাত্র ৩১১টা কেন্দ্রের ফলাফল দিয়েছিল। ওই সময়ে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২৩ হাজার। তা হলে প্রশ্ন জাগে, কী করে রাত ৯টার সময়ে আমার প্রতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর ভবন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে নিশ্চিত বিজয়ী ঘোষণা করে গণমাধ্যমের সামনে এবং উনারা বিজয় মিছিলও শুরু করে দেন। তখন মাত্র ২০ শতাংশের কম ফলাফল দেখা হয়েছিল। রাত ৪টার সময়ে আনফিশিয়ালি তাকে এগিয়ে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সব ঢাকাবাসী জানেন, এটা ইলেকশন হয়নি।

বিভিন্ন জায়গায় ধানের শীষের এজেন্টদের পিটিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এবং পোলিং বুথে একাধিক ব্যক্তির অবস্থানের নানা প্রমাণও তুলে ধরেন তাবিথ। ইভিএমে ফলাফল সম্পর্কে তিনি বলেন, ইভিএমের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল রেজাল্ট ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে দেয়া যাবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাহেবও আমাদেরকে বলেছিলেন। মানে রাত ৯টার মধ্যে জনগণের সামনে রেজাল্ট পেশ করা উচিত ছিল। অথচ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ভোর ৪টা পর্যন্ত। তারপরেও আমরা মৌখিক রেজাল্ট পেয়েছি। এখনও লিখিত বা তথ্য সংবলিত কোনো রেজাল্ট পাইনি।

তাবিথ বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে তাদের কাজের কোনো মিল নেই। এখানে বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে চুরি করা হয়েছে, এখানে অনেক ভোট বদলানো হয়েছে। সেই কারণে ভোর ৪টা পর্যন্ত তাদের সময়টা লেগেছিল। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট থেকে রেজাল্টের তথ্য সরবারহ না করা এবং ইভিএম ব্যবহারের আগে ফরম-৩ পূরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ইভিএমে রক্ষিত সব লগের তথ্য প্রকাশের দাবিও জানান তাবিথ। তিনি বলেন, আমরা আবারও দাবি করছি, অবিলম্বে সবার সামনে স্বচ্ছ থাকার জন্য সব লগ প্রকাশ করা হোক। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কন্ট্রোল ইউনিটে কি লেখা ছিল, রেজাল্ট শিটে কী এসেছে, ফাইনালি মৌখিক প্রকাশে কী রেজাল্ট আমরা পেয়েছি। আশা করি, নির্বাচন কমিশন নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করার জন্য সব লগ ‘পাবলিকলি রাইট ডেফিনেশন অ্যাক্টের’ আওতায় সবার জন্য ওপেন করে দেবে।

ইশরাক হোসেন বলেন, আমি কথা দিয়েছিলাম, জনগণকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেব। ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু সিটি নির্বাচনে আমাদের অর্জনও কম নয়। আমরা নগরবাসী ও দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, আজকে দেশে জনগণের কোনো মৌলিক অধিকার নেই।

তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন নগরবাসীর সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে, তাদের হক কেড়ে নেয়া হয়েছে। প্রচারণায় আমরা জনগণের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ধানের শীষের পক্ষে একটি ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। এগুলো দেখে ক্ষমতাসীনরা নানা কূটকৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। সব কিছুতে ব্যর্থ হয়ে নির্বাচনের দিন তারা ভোটকেন্দ্রগুলো সকাল সকাল দখল করার পাঁয়তারা করেছে। কেন্দ্র দখল করে চলে জাল ভোটের মহোৎসব।

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং নির্বাচনী সহায়তাকারী অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের মধ্যে অসহায়ত্ব ও হতাশা দেখতে পেয়েছেন বলে মন্তব্য করে ইশরাক বলেন, তাদের কিছুই করার ছিল না। কারণ উপর থেকে নির্দেশ এসেছে। দেশের সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় আজ্ঞাবহ হতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসাররা অসহায় হয়ে আমাদের বলেছেন, তাদের কিছুই করার নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছেন একে অপরের দিকে। ইভিএম সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ত্র“টিপূর্ণ মেশিনগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর।

ভোটের ফলাফল নিয়ে ইশরাক বলেন, ধীরে ধীরের ভোটার উপস্থিতি একেবারে কমে যাওয়াতে আমি মনে করি টোটাল কাস্টের ভোট ১০ শতাংশের অনেক কম হয়েছে। যার কারণে পরে বিশেষ কোড ব্যবহার করে প্রিসাইডিং অফিসারদের ব্যালট ওপেন করে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়। তারপরেও ভোটগ্রহণ শেষে আমরা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রেজাল্ট সংগ্রহ করতে থাকি সেখানেও আমরা দেখতে পাই যে, ধানের শীষ এগিয়ে ছিল। সন্ধ্যার পরে শিল্পকলা একাডেমি থেকে ভোটের ফলাফল ঘোষণা রাত ৭টার পর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়। রাত দেড়টায় দিকে নৌকাকে বিজয়ী করে সম্পূর্ণ একটা মনগড়া ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় পুরনো ঢাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি অভিযোগ করে একটি ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেন ইশরাক।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, হাবিবুর রহমান হাবিব, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, আফরোজা আব্বাস, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আউয়াল খান, সেলিমুজ্জামান সেলিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, এলডিপির একাংশের শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ।

ফল বাতিল করে দুই সিটির পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন ফখরুল

ইভিএমের সব তথ্য প্রকাশের আহ্বান তাবিথ-ইশরাকের * ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা, ইভিএমে ভোট কারচুপি, সন্ত্রাসীদের হামলার তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন
 যুগান্তর রিপোর্ট 
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মির্জা ফখরুল
মির্জা ফখরুল। ফাইল ছবি

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি- এমন অভিযোগ এনে অবিলম্বে ভোটের ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। এজন্য প্রকৃতপক্ষে সিটি নির্বাচনে ৭-৯ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাই ফল বাতিল করে নতুন নির্বাচনের আহ্বান করছি।

বুধবার দুপুরে রাজধানী গুলশানের ইমানুয়েল ব্যাংকুয়েট হলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তাবিথ আউয়াল ও ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তারা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে ক্ষমতাসীন দলের বাধা, ইভিএমে ভোট কারচুপি, সন্ত্রাসীদের হামলার তথ্য-উপাত্ত ভিডিওর মাধ্যমে গণমাধ্যমের কাছে পৃথকভাবে তুলে ধরেন তাবিথ ও ইশরাক।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছে। উদ্দেশ্য একটাই ১৯৭৫ সালে যে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েও তারা করতে পারেনি। এখন বিভিন্ন কৌশলে বাকশালের মতো সেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চলেছে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে গত ১০-১২ বছরে আওয়ামী লীগের অধীনে কখনও কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। সেই কারণেই আমরা বারবার বলছি যে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যা আগে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই ব্যবস্থার অধীনে এবং একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনার মধ্য দিয়ে এ নির্বাচন সমাধান করতে হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধান হতে পারে। দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কখনোই সম্ভব না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন সিটি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। তাবিথ আউয়াল বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষের মূল কৌশলই ছিল ভোটাররা যেন কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে। আর পারলেও যেন কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে ভোট দিতে না পারে। উদ্দেশ্যটাই ছিল ভোটাররা যাতে ভোট দিতে না পারে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে ফেইক (ভুয়া) লাইন করা হয়েছে। যাতে তারা কেন্দ্রে না যেতে পারেন। ভেতরে কেন্দ্র খালি, কিন্তু বাইরে একই দলের একই কর্মী বাহিনী জড়ো হয়ে আছে- এরকম চিত্র দেখা গেছে বিভিন্ন জায়গায়। শুধু ধানের শীষ নয়, অন্যান্য দলের প্রার্থীদের ভোটারদেরও কেন্দ্রে ভেতরে যাতে ঢুকতে না পারে তার পরিকল্পনা ক্ষমতাসীন দল করেছে আগে থেকেই।

তাবিথ আউয়াল বলেন, আমি জোরালোভাবে বলতে চাই, পরিকল্পিত ‘প্ল্যান’ ছিল যাতে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না আসতে পারে। নির্বাচন কমিশন সব নির্বাচনী আইন নিজেরা ভঙ্গ করেছে, অন্যদের ওইসব আইন ভঙ্গ করার জন্য তারা উৎসাহ দিয়েছে। অবিলম্বে এ ফলাফল স্থগিত করে আমি দাবি জানাচ্ছি, আমাদের সামনে সব তথ্য পেশ করা হোক, সব কাগজ পেশ করা হোক।

তিনি বলেন, একটা উদাহরণ দিচ্ছি- ১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মাত্র ৩১১টা কেন্দ্রের ফলাফল দিয়েছিল। ওই সময়ে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২৩ হাজার। তা হলে প্রশ্ন জাগে, কী করে রাত ৯টার সময়ে আমার প্রতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর ভবন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে নিশ্চিত বিজয়ী ঘোষণা করে গণমাধ্যমের সামনে এবং উনারা বিজয় মিছিলও শুরু করে দেন। তখন মাত্র ২০ শতাংশের কম ফলাফল দেখা হয়েছিল। রাত ৪টার সময়ে আনফিশিয়ালি তাকে এগিয়ে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সব ঢাকাবাসী জানেন, এটা ইলেকশন হয়নি।

বিভিন্ন জায়গায় ধানের শীষের এজেন্টদের পিটিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এবং পোলিং বুথে একাধিক ব্যক্তির অবস্থানের নানা প্রমাণও তুলে ধরেন তাবিথ। ইভিএমে ফলাফল সম্পর্কে তিনি বলেন, ইভিএমের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল রেজাল্ট ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে দেয়া যাবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাহেবও আমাদেরকে বলেছিলেন। মানে রাত ৯টার মধ্যে জনগণের সামনে রেজাল্ট পেশ করা উচিত ছিল। অথচ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ভোর ৪টা পর্যন্ত। তারপরেও আমরা মৌখিক রেজাল্ট পেয়েছি। এখনও লিখিত বা তথ্য সংবলিত কোনো রেজাল্ট পাইনি।

তাবিথ বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে তাদের কাজের কোনো মিল নেই। এখানে বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে চুরি করা হয়েছে, এখানে অনেক ভোট বদলানো হয়েছে। সেই কারণে ভোর ৪টা পর্যন্ত তাদের সময়টা লেগেছিল। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট থেকে রেজাল্টের তথ্য সরবারহ না করা এবং ইভিএম ব্যবহারের আগে ফরম-৩ পূরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ইভিএমে রক্ষিত সব লগের তথ্য প্রকাশের দাবিও জানান তাবিথ। তিনি বলেন, আমরা আবারও দাবি করছি, অবিলম্বে সবার সামনে স্বচ্ছ থাকার জন্য সব লগ প্রকাশ করা হোক। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কন্ট্রোল ইউনিটে কি লেখা ছিল, রেজাল্ট শিটে কী এসেছে, ফাইনালি মৌখিক প্রকাশে কী রেজাল্ট আমরা পেয়েছি। আশা করি, নির্বাচন কমিশন নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করার জন্য সব লগ ‘পাবলিকলি রাইট ডেফিনেশন অ্যাক্টের’ আওতায় সবার জন্য ওপেন করে দেবে।

ইশরাক হোসেন বলেন, আমি কথা দিয়েছিলাম, জনগণকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেব। ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু সিটি নির্বাচনে আমাদের অর্জনও কম নয়। আমরা নগরবাসী ও দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, আজকে দেশে জনগণের কোনো মৌলিক অধিকার নেই।

তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন নগরবাসীর সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে, তাদের হক কেড়ে নেয়া হয়েছে। প্রচারণায় আমরা জনগণের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ধানের শীষের পক্ষে একটি ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। এগুলো দেখে ক্ষমতাসীনরা নানা কূটকৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। সব কিছুতে ব্যর্থ হয়ে নির্বাচনের দিন তারা ভোটকেন্দ্রগুলো সকাল সকাল দখল করার পাঁয়তারা করেছে। কেন্দ্র দখল করে চলে জাল ভোটের মহোৎসব।

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং নির্বাচনী সহায়তাকারী অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের মধ্যে অসহায়ত্ব ও হতাশা দেখতে পেয়েছেন বলে মন্তব্য করে ইশরাক বলেন, তাদের কিছুই করার ছিল না। কারণ উপর থেকে নির্দেশ এসেছে। দেশের সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় আজ্ঞাবহ হতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসাররা অসহায় হয়ে আমাদের বলেছেন, তাদের কিছুই করার নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছেন একে অপরের দিকে। ইভিএম সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ত্র“টিপূর্ণ মেশিনগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর।

ভোটের ফলাফল নিয়ে ইশরাক বলেন, ধীরে ধীরের ভোটার উপস্থিতি একেবারে কমে যাওয়াতে আমি মনে করি টোটাল কাস্টের ভোট ১০ শতাংশের অনেক কম হয়েছে। যার কারণে পরে বিশেষ কোড ব্যবহার করে প্রিসাইডিং অফিসারদের ব্যালট ওপেন করে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়। তারপরেও ভোটগ্রহণ শেষে আমরা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রেজাল্ট সংগ্রহ করতে থাকি সেখানেও আমরা দেখতে পাই যে, ধানের শীষ এগিয়ে ছিল। সন্ধ্যার পরে শিল্পকলা একাডেমি থেকে ভোটের ফলাফল ঘোষণা রাত ৭টার পর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়। রাত দেড়টায় দিকে নৌকাকে বিজয়ী করে সম্পূর্ণ একটা মনগড়া ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় পুরনো ঢাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি অভিযোগ করে একটি ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করেন ইশরাক।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, হাবিবুর রহমান হাবিব, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, আফরোজা আব্বাস, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আউয়াল খান, সেলিমুজ্জামান সেলিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, এলডিপির একাংশের শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন-২০২০

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০