প্রতীক্ষার প্রহর শেষ কবে

কাঠমান্ডুর বিমান ট্র্যাজেডি : তিন দিনেও শনাক্ত হয়নি কোনো লাশ * ডিএনএ করে আনতে অন্তত ২১ দিন লাগবে

  সিরাজুল ইসলাম ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপাল

নেপালের কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা আছেন লাশের অপেক্ষায়। কেউ দেশে বসে লাশ গ্রহণের প্রহর গুনছেন। আবার কেউ লাশ শনাক্তে ঘুরছেন কাঠমান্ডুর হাসপাতালে। কিন্তু কারও লাশ এখনও শনাক্ত হয়নি। নিহতদের লাশ কবে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে- সে বিষয়ে নিশ্চিত করে এখনও কেউ কিছু বলতে পারছেন না। নিহতের স্বজনরা ব্যক্ত করেছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। আবার প্রক্রিয়াগত জটিলতাসহ নানা কারণে কোনো কোনো নিহতের স্বজন এখনও কাঠমান্ডুতে যেতে পারেননি। সব মিলিয়ে লাশ পেতে স্বজনদের অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় লাশ ফেরত আনতে আরও তিন থেকে সাত দিন সময় লাগতে পারে। আর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে লাশ আনতে হলে অন্তত ২১ দিন সময় লাগবে। তাছাড়া দুর্ঘটনার বিষয়টি নিয়ে যারা তদন্ত করছেন তাদের চূড়ান্ত ছাড়পত্র ছাড়া লাশ দেশে আনা যাবে না।

সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। তখন সেটিতে আগুনও ধরে যায়। উড়োজাহজের ৭১ আরোহীর মধ্যে এ পর্যন্ত ৫১ জন নিহত এরং ২০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও দু’জন ক্রুসহ বাংলাদেশের ২৬ জন, নেপালের ২৪ জন এবং চীনের ১ জন রয়েছেন। আর আহতদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশি ১০ জন, নেপালের ৯ এবং মালদ্বীপের ১ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুড়ে যাওয়ার কারণে বেশির ভাগ মরদেহ শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল। নেপালের সেনাপ্রধান রাজেন্দ্র ছত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে কাঠমান্ডুর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, নিহত ২৬ জন বাংলাদেশির মরদেহ হিমঘরে রাখা আছে। এদের মধ্যে আটজনকে শনাক্ত করা সম্ভব। বাকি কারও চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। মন্ত্রী বলেন, নিহত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্ত শেষ করতে অন্তত তিন দিন লাগবে। যাদের শনাক্ত করা যাবে, তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই মরদেহ ঢাকায় নেয়া হবে। যাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে না, তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এ পর্যন্ত ১১ জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলেও মন্ত্রী জানান।

নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বুধবার কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত শেষ করতে আরও চার দিন সময় লাগবে। তারপর তারা স্বজনদের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য নিশ্চিত করে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করবেন। এটা করতে আরও দু-একদিন সময় লাগতে পারে।’ তিনি বলেন, মরদেহ শনাক্ত করার পর দেশে কিভাবে পাঠানো হবে তা নিয়ে নেপাল ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

হিমালয় কন্যা নেপাল ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের তিনজন। তারা হলেন- রফিক জামান রিমু, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা এবং ছেলে অনিন্দ। রিমুর নিকটাত্মীয় মঞ্জুর মোর্শেদ বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, আমাদের তিনজন স্বজন কাঠমান্ডুতে গিয়েছেন। তারা এখনও লাশের হদিস পাননি। কবে নাগাদ লাশ আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে তাও জানানো হয়নি। ইউএস-বাংলা এবং বাংলাদেশ ও নেপালের সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আজ (বুধবার) বিকাল ৫টায় একটি ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনও কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, লাশ দেশে আনতে কমপক্ষে ২১ দিনের বেশি সময় লাগবে। কারণ লাশ শনাক্তের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট লাগবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের যে স্বজনরা সেখানে গেছেন, তারা সম্ভবত আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) দেশে ফিরে আসবেন।

নিহত কেবিন ক্রু শারমিন আক্তার নাবিলার চাচি ফাতেমা বেগম যুগান্তরকে জানান, লাশ শনাক্তের জন্য আমার স্বামী বেলাল হোসেন নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থান করছেন। নাবিলার স্বামী ইমাম হাসান আজ (বুধবার) গেছেন। এখনও লাশ শনাক্ত হয়নি। লাশ অনেক পুড়ে গেছে। কবে নাগাদ লাশ পাব, এ বিষয়ে কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ডিএনএ টেস্ট করতে হবে। তিনি জানান, আমাদের দুটি সমস্যা ছিল। দুর্ঘটনার পর নাবিলার বাচ্চা হারিয়ে গিয়েছিল। এখন সে আমাদের কাছে আছে। দোয়া করুন, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নাবিলার লাশটা দেশে আনতে পারি।

বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা নাজিয়া আফরিন চৌধুরীর বড় বোন সঈদা রেজা (সেলি আপা) সন্ধা ৭টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, কবে লাশ শনাক্ত করা যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। লাশ শনাক্ত করতে আমাদের চারজন লোক সেখানে গেছে। কিন্তু এখনও কাউকে লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। কেবল তাদের ১৫ পৃষ্ঠার একটি ফরম দিয়েছে। ওই ফরম পূরণ করে দেয়া হয়েছে। এর বেশি কোনো আপডেট আমাদের কাছে নেই। আমাদের এবং নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল মিটিং করছে। কবে নাগাদ লাশ পাব, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য কেউ দিচ্ছে না।

নিহত পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের বন্ধু আসাদুজ্জামান বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, এখনও আবিদের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ নিহত অনেকের স্বজনদের কাঠমান্ডু নিয়ে গেলেও আবিদের কোনো স্বজন যেতে পারেনি। তবে বুধবার বিকালে আবিদের ভাই নেপালের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, আমরা সব সময় কাঠমান্ডুতে যোগাযোগ রাখছি। এখনও আবিদের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাকর্মীরা আবিদের বাসা ঘিরে রাখে। যে কারণে কোনো সংবাদকর্মী আবিদের পরিবারের লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। এছাড়া ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষও আবিদের পরিবারকে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেছে।

বুধবার রাত ৮টার দিকে ক্যাপ্টেন আবিদের স্ত্রী আফসানা খানম যুগান্তরকে বলেন, আবিদের ভাই কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। এখনও পৌঁছতে পারেনি। সেখানে যাওয়ার পর আমরা তার কাছ থেকে আপডেট জানব। আমরা এখন আল্লাহ, আল্লাহ করছি। যা হওয়ার হয়েছে, এখন দ্রুত লাশ দাফন করতে চাই। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।

পাসপোর্ট না থাকায় ছেলের লাশ আনতে নেপাল যেতে পারেননি নিহত পিয়াস রায়ের বাবা সুখেন্দু রায়। আত্মীয়স্বজন কাউকেও পাঠাতে পারেননি। বুধবার বারিধারার ইউএস-বাংলা কার্যালয়ে এসে তিনি বলেন, ‘মেডিকেল পড়ুয়া একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ওর মা শয্যাশায়ী। আমি নিজেও হাই প্রেসারের রোগী। খবর শুনে আমি বরিশাল থেকে ছুটে এসেছি। অন্তত লাশটি শনাক্ত করে দ্রুত কীভাবে দেশে আনা যায়, সে বিষয়ে ইউএস-বাংলার সহযোগিতা চেয়েছি। পাসপোর্ট না থাকায় নেপালে আমাদের কোনো স্বজনও যেতে পারছে না। আমরা জানতে পারি, স্বজনদের নেপাল নিয়ে যাওয়া হবে। তাই আমার এক আত্মীয়কে এখানে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তার পাসপোর্ট না থাকায় তাকে নেয়া হয়নি। আমার একটি পাসপোর্ট ছিল, তারও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমরা কী করতে পারি তা জানতে এখানে এসেছি।’ তিনি জানান, তার ছেলে প্রায় ডাক্তার হয়ে গিয়েছিল। কেবল ইন্টার্নি বাকি ছিল। গত ৫ মার্চ তার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়। এরপর ঘুরতে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন পিয়াস। এ বিষয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পিয়াসের পরিবারের কারও কোনো পাসপোর্ট নেই। আমরা নিজ খরচে তাদের পাসপোর্ট করিয়ে নেপাল নিয়ে যাব।’

নিহত ক্রু খাজা শফির বোন বাসিমাহ সাইফুল্লাহ বুধবার কাঠমান্ডুতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বজনদের আনাই হয়েছে লাশ শনাক্তকরণের জন্য। কিন্তু এখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের একটি ফরম ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা এখনও কোনো লাশ দেখতে পারিনি। জানি না কবে লাশ দেখতে পারব। আর শনাক্ত শেষে কবে ভাইয়ের লাশ দেশে নিতে পারব। আমাদেরকে যেহেতু লাশই দেখতে দেয়া হচ্ছে না, তাহলে লাশ শনাক্ত করব কীভাবে?’

এদিকে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের দেশে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

নিহতদের মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা করে ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল হাসান বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও নেপাল সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা এলে তারা যে কোনো মুহূর্তে নেপাল থেকে মরদেহগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসতে প্রস্তুত। লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়ে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে নেপালে লাশের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লাশ শনাক্তে কিছুটা জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ বেশিরভাগ লাশই আগুনে পুড়ে গেছে। তাই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। ১৫ পাতার একটি ফরম পূরণ করতে হয়। সেটা দেখে লাশ শনাক্ত করতে না পারা গেলে ডিএনএ টেস্ট করার প্রয়োজন হবে। ফলে লাশ হস্তান্তরে একটি দীর্ঘ সময় ব্যয় হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রশাসন যেভাবে কাজ করে নেপালের প্রশাসন সেভাবে কাজ করে না। আমাদের হাতে যথেষ্ট ফ্লাইট আছে। শনাক্তকরণ হলে আমরা দ্রুত লাশ দেশে নিয়ে আসতে প্রস্তুত আছি।’

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter