সাগরে ট্রলার ডুবে ১৬ রোহিঙ্গা নিহত

জীবিত উদ্ধার ৭৬, নিখোঁজ ৪৬, তিন দালাল আটক

  শফিউল্লাহ শফি, কক্সবাজার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাগরে ট্রলার ডুবে ১৬ রোহিঙ্গা নিহত
বঙ্গোপসাগরে ডুবে যিওয়া ট্রলার থেকে মঙ্গলবার মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের লাশ উদ্ধার করছেন কোস্টগার্ড সদস্যরা। সেন্টমার্টিনের ছবি। যুগান্তর

প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের কাছে সাগরে ট্রলার ডুবে কমপক্ষে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭৬ জনকে, নিখোঁজ ৪৬।

সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ছেঁড়াদ্বীপের কাছে মঙ্গলবার ভোরে ট্রলারটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রলারটিতে প্রায় ১৩৮ জন যাত্রী ছিল। নিহতদের মধ্যে চারজন শিশু, ১২ জন নারী।

উদ্ধারকৃত জীবিতদের মধ্যে ২৭ জন পুরুষ, ৪৬ জন নারী ও তিন শিশু। হতাহতদের সবাই রোহিঙ্গা নাগরিক। তারা অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় টেকনাফ থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত তিন দালালকে আটক করেছে।

সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার লে. নাঈম উল হক বলেন, ট্রলারডুবিতে মৃত ও জীবিত সবাই রোহিঙ্গা নাগরিক। এরা সবাই উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাস করে। ওই এলাকার কিছু রোহিঙ্গা দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে।

মঙ্গলবার ভোরে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য তারা ট্রলারে সাগরপথে যাত্রা শুরু করে। ট্রলারটি ছেঁড়াদ্বীপের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। ভোর পৌনে ৬টার দিকে ট্রলারটি সাগরে ডুবতে শুরু করলে কোস্টগার্ডকে খবর দেয়া হয়।

তিনটি স্টেশন থেকে কোস্টগার্ড সদস্যরা গিয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তাদের সঙ্গে অভিযানে যোগ দেয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ।

লে. নাঈম আরও বলেন, উদ্ধার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা বেশকিছু দালালের বিষয়ে জানতে পেরেছি। তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। জীবিতদের সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাবার দেয়া হয়েছে। সব মৃতদেহ টেকনাফে নিয়ে আসা হয়েছে।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মতে তাদের দাফন করা হবে। পাশাপাশি যাচাই-বাছাই শেষে জীবিত উদ্ধারকৃতদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হবে।

এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া এক তরুণী জানান, অনেক দিন থেকে তাদের ক্যাম্পের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বিনা খরচে বিদেশে নিয়ে বিয়ে দেয়ার কথা বলে আসছিল। তাদের কথামত বাবা-মা রাজি হওয়ার পর বিদেশে যাওয়ার জন্য একাধিকবার তারিখ পড়ে। কিন্তু ওইসব তারিখে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ সোমবার সন্ধ্যার আগে তাকে ক্যাম্প থেকে বের করে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখে, তার মতো আরও অনেকেই বিদেশ যাওয়ার জন্য ওই ঘরে অবস্থান করছে। পরে রাত ১১টার দিকে দালালরা তাদের ট্রলারে তুলে দেয়।

এ ব্যাপারে রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ উল্লাহ জানান, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে বেশকিছু দালাল সক্রিয় রয়েছে। বাইরের কিছু দালালের সহযোগিতায় তারা রোহিঙ্গাদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, রোহিঙ্গাদের বড় একটি দল মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সোমবার গভীর রাতে টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া থেকে মাছ ধরার দুটি ট্রলারে চেপে যাত্রা শুরু করে। মঙ্গলবার ভোর পৌনে ৬টার দিকে এর একটি ট্রলার দুর্ঘটনার মুখে পড়ে ডুবতে শুরু করে। খবর পেয়ে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্ধার অভিযানে নামেন।

ট্রলারের যাত্রী ছিলেন আবদুল নামের একজন। তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সোমবার রাতে ১৩৮ জন মালয়েশিয়াগামী যাত্রীকে টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া গ্রাম থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে বড় একটি ট্রলারে নিয়ে যায় দালালরা।

ভোরের দিকে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ দিকে ছেঁড়াদ্বীপের কাছে পৌঁছলে ট্রলারটি পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে তলা ফেটে ট্রলারটিতে পানি ঢুকতে থাকে। এ সময় দালাল ও মাঝিমাল্লারা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে পালিয়ে যায়। আবদুল জানান, প্রথমে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানান। সেখান থেকে কোস্টগার্ডের নম্বর দেয়া হয়। সেখানে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানান তিনি।

টেকনাফের স্থানীয় সাংবাদিক গিয়াস উদ্দিন ভুলু জানান, ট্রলারডুবির ঘটনায় মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭৬ জনকে। অন্যদের উদ্ধারেও নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড বিকাল পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার মো. এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম বলেন, প্রতিবছর শীতকাল এলেই মানব পাচার বেড়ে যায়। দালালরা শীত মৌসুমের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানব পাচার শুরু করে। তবে সম্প্রতি যারা এই কাজে পা দিয়েছে, তাদের সিংহভাগই রোহিঙ্গা। মূলত স্থানীয় ও কিছু রোহিঙ্গা দালাল নানা প্রলোভন দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাচার করছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি পাচারের সময় যেসব রোহিঙ্গা ট্রলারডুবিতে মারা গেছে, তাদের টেকনাফের বাহারছড়া ও উখিয়া-টেকনাফের মাঝামাঝি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বোটে তোলা হয়েছিল। এই পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে তিন দালালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হল টেকনাফের বাহারছড়ার আইয়ুব, রফিক ও সাদ্দাম।

এদিকে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) মঙ্গলবার প্রেসনোটে, নৌ দুর্ঘটনাকবলিতদের সাহায্যে জাতিসংঘ প্রস্তত বলে জানিয়েছে। এতে বলা হয়, আইওএম, ইউএনএইচসিআর এবং জাতিসংঘের সব সংস্থা ও অন্যান্য এনজিও এ ঘটনায় গভীরভাবে দুঃখিত।

আমরা সরকারের পাশে থেকে উদ্ধারকৃতদের খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা বা যে কোনো সহায়তায় এগিয়ে আসতে প্রস্তুত। কক্সবাজারে অনিয়মিত ও অনিরাপদ নৌযাত্রা নতুন কোনো ঘটনা নয়।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি জনগণ উভয়েই বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই ঝুঁকি নিয়ে থাকে। সাগরপথের অনিরাপদ ভ্রমণের কথা বিবেচনা করে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে আসছে।

কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে পরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে আগেও রোহিঙ্গারা এসেছিল। ১৯৯২ সালেও রোহিঙ্গারা আসে। ওই সময় যারা এসেছিল, তারাও কিন্তু আছে। এরা আমাদের ক্যাম্পে নয়, ক্যাম্পের বাইরে থাকছে। ট্রলারে ওরা হয়তো যেতে পারে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া রয়েছে। তাদেরকে ক্যাম্পের ভেতরেই রাখা হচ্ছে। মঙ্গলবার জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শোকবার্তা : কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে রোহিঙ্গা মৃত্যুর ঘটনায় শোকবার্তা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।

মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির কাছে এ শোকবার্তাটি পাঠানো হয়েছে। শোকবার্তায় ট্রলারডুবিতে তার দেশের নাগরিক রোহিঙ্গাদের মৃত্যুতে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৩০ ৩৩ ২১
বিশ্ব ১৬,০৪,৫৩৫ ৩,৫৬,৬৬০ ৯৫,৭৩৪
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত