করোনাভাইরাসের প্রভাব: দেশের অর্থনীতিতে ছয় ধরনের ক্ষতি
jugantor
করোনাভাইরাসের প্রভাব: দেশের অর্থনীতিতে ছয় ধরনের ক্ষতি
গার্মেন্টের কাঁচামালের মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে * চীন থেকে আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেড়েছে * পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পণ্য খালাসের দাবি ব্যবসায়ীদের

  মনির হোসেন  

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে এখনও চীনের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব মেলেনি। দেশে ভাইরাসটির প্রবেশ রোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এসব দিক থেকে ভাইরাসটি সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় নেই। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য সেভাবে আগলে রাখা যাচ্ছে না।

ইতিমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। সুনির্দিষ্ট ৬টি খাতে এর প্রভাব পড়ছে। ভোগ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, রফতানি খাতে সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে। এছাড়া বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা আছে। এ ধরনের সংকটের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ মুনাফা লুটে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পায়নের স্বাভাবিক চেইন ভেঙে পড়েছে।

রফতানি নির্ভর গার্মেন্টস খাতে বিভিন্ন জিনিসপত্র আমদানি বন্ধ। এর মধ্যে রয়েছে- শিল্পের কাপড়, পলি, জিপার, কার্টন, লেস, হ্যাঙ্গার, বোতাম, পলি, রং ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এবং আরও অনেক যন্ত্রাংশ।

তাদের মতে, এতদিন বোঝা যায়নি। কিন্তু এখন দ্রুতই ক্ষতির বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা চলতি মাসের মধ্যে দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য শুরু না হলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, চীন এমন অবস্থান তৈরি করেছে যে, তারা খারাপ থাকলে বিশ্বের কেউ ভালো থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ওই দেশের স্থবিরতা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রথমত, আমাদের ভোগ্যপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চীন থেকে আসে। এর প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মূলধনী যন্ত্রপাতি না আসায় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তৃতীয়ত, কাঁচামাল আমদানি ব্যহত হয়, শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আমাদের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চতুর্থ বিষয় হল, চীনেও আমাদের বেশ কিছু পণ্য রফতানি হয়। এ খাতেও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান।

পঞ্চমত, আমাদের দেশের অনেক বড় বড় প্রকল্পে কাজ করছে চীন। এক্ষেত্রে টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য চীন থেকে আসছে। ফলে এসব প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। সবশেষ কথা হল, আমাদের দেশে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি গ্রুপ অনৈতিক সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। সরকারকে বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে।

জানতে চাইলে বিসিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম আজিজুল আকিল বুধবার যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের ঘটনাটি আকস্মিক। এটি মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। সে কারণে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে চীন থেকে আমদানিকৃত বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এরমধ্যে মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, মাস্ক, আদা এবং রসুন ইত্যাদি। তিনি বলেন, দেশটির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কথা হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। কিছু কিছু রাজ্যে কোম্পানি খুলে দেয়া হচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি নগাদ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হতে পারে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোয় সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকে। বড় কারখানাগুলোয় থাকে ৩ মাস। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে আমদানি বন্ধ থাকলেও এতদিন ধরে উৎপাদন চলায় অনেক কারখানারই মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের পুরো রফতানির ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক। আর এ তৈরি পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। আর এসব পণ্য উৎপাদন করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়।

কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক আমদানি বন্ধ। চীনের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করছেন, এ ধরনের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ইতিমধ্যে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্ধ নতুন এলসিও (ঋণপত্র)। আর বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশ তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগিরই অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্য। আটকে গেছে শত শত এলসি। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বহু ব্যবসায়ী। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্নভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

তিনি বলেন, এমনিতেই পণ্যের সরবরাহ নেই। এরপর আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তারা মজুদ করছে। এতে সংকট বাড়ছে। যে কারণে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তার মতে, মূলত আমরা সুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করি। আর যে রাজ্যে সুতা হয়, ভাইরাসের উৎপত্তি সেখানেই। তিনি বলেন ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর হাতে ১ থেকে ২ মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকে। বড় ফ্যাক্টরিতে ৩ থেকে ৪ মাস। কিছু পণ্য চীন থেকে আমদানি হলেও আমরা দেশ থেকে কিনি। কিন্তু বর্তমানে সংকটের পাশাপাশি দেশীয় ব্যবসায়ীরা মজুদ করে আরও সংকট তৈরি করছে। এতে কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ কারণে সবাই উদ্বিগ্ন। ওভেন পোশাকের ২০-৩০ শতাংশ দেশীয় বাজারে উৎপাদন হয়, বাকি ৭০-৮০ শতাংশই চীন থেকে আসে। এ বিশাল পরিমাণ কাঁচামাল আপাতত বাংলাদেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। ফলে পুরো চেইন ভেঙে পড়েছে।

এ অবস্থায় সরকারের কাছে আমাদের দু-একটি দাবি রয়েছে। এগুলো হল- বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা এবং এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দ্রুততার সঙ্গে করা। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে নতুন করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

দেশটির সরকারি হিসাবেই ইতিমধ্যে এ ভাইরাসে ৪৫ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে মারা গেছেন সাড়ে তেরশো’র বেশি মানুষ। বন্ধ রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্ব অর্থনীতি, শেয়ারবাজার এবং আমদানি-রফতানিতে এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ চীন থেকে যে সব পণ্য আমদানি করে এর মধ্যে রয়েছে- টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সার, টায়ার, লৌহ ও ইস্পাত, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও গম। অন্যদিকে বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রফতানি করে এগুলো হল- চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, তৈরি পোশাক এবং মৎস্যজাতীয় পণ্য।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এসেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, চীন থেকে আমরা বিশাল অংকের পণ্য আমদানি করি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্পকারখানায় ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দেশটিতে রফতানিও রয়েছে। ভাইরাসের কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিসিসিসিআইর তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এ সম্ভাবনায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে।

কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ না এগোলে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়ও। বাংলাদেশে কর্মরত অনেক চীনা সে দেশে আটকে পড়েছেন। আর সময়মতো কাজ না এগোলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে বা বাড়ানোর অজুহাত তোলা হতে পারে। কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন। শুধু পদ্মা সেতুতেই চীনের ১১শ’ নাগরিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ছুটিতে দেশে গিয়েছিলেন ২৫০ জন।

এছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত আছেন। এসব প্রকল্পে দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন। তার বাইরে আরও কিছু প্রকল্পে ৫শ’ চীনা নাগরিক সহায়তা করছেন।

এরই মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত ৩৫ চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত চীনের অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের ফেরা অনিশ্চিত।

করোনাভাইরাসের প্রভাব: দেশের অর্থনীতিতে ছয় ধরনের ক্ষতি

গার্মেন্টের কাঁচামালের মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে * চীন থেকে আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেড়েছে * পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পণ্য খালাসের দাবি ব্যবসায়ীদের
 মনির হোসেন 
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে এখনও চীনের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব মেলেনি। দেশে ভাইরাসটির প্রবেশ রোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এসব দিক থেকে ভাইরাসটি সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় নেই। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য সেভাবে আগলে রাখা যাচ্ছে না।

ইতিমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। সুনির্দিষ্ট ৬টি খাতে এর প্রভাব পড়ছে। ভোগ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, রফতানি খাতে সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে। এছাড়া বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা আছে। এ ধরনের সংকটের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ মুনাফা লুটে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পায়নের স্বাভাবিক চেইন ভেঙে পড়েছে।

রফতানি নির্ভর গার্মেন্টস খাতে বিভিন্ন জিনিসপত্র আমদানি বন্ধ। এর মধ্যে রয়েছে- শিল্পের কাপড়, পলি, জিপার, কার্টন, লেস, হ্যাঙ্গার, বোতাম, পলি, রং ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এবং আরও অনেক যন্ত্রাংশ।

তাদের মতে, এতদিন বোঝা যায়নি। কিন্তু এখন দ্রুতই ক্ষতির বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা চলতি মাসের মধ্যে দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য শুরু না হলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, চীন এমন অবস্থান তৈরি করেছে যে, তারা খারাপ থাকলে বিশ্বের কেউ ভালো থাকতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ওই দেশের স্থবিরতা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রথমত, আমাদের ভোগ্যপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চীন থেকে আসে। এর প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মূলধনী যন্ত্রপাতি না আসায় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তৃতীয়ত, কাঁচামাল আমদানি ব্যহত হয়, শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আমাদের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চতুর্থ বিষয় হল, চীনেও আমাদের বেশ কিছু পণ্য রফতানি হয়। এ খাতেও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান।

পঞ্চমত, আমাদের দেশের অনেক বড় বড় প্রকল্পে কাজ করছে চীন। এক্ষেত্রে টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য চীন থেকে আসছে। ফলে এসব প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। সবশেষ কথা হল, আমাদের দেশে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি গ্রুপ অনৈতিক সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। সরকারকে বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে।

জানতে চাইলে বিসিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম আজিজুল আকিল বুধবার যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের ঘটনাটি আকস্মিক। এটি মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। সে কারণে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে চীন থেকে আমদানিকৃত বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এরমধ্যে মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, মাস্ক, আদা এবং রসুন ইত্যাদি। তিনি বলেন, দেশটির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কথা হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। কিছু কিছু রাজ্যে কোম্পানি খুলে দেয়া হচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি নগাদ ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হতে পারে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোয় সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকে। বড় কারখানাগুলোয় থাকে ৩ মাস। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে আমদানি বন্ধ থাকলেও এতদিন ধরে উৎপাদন চলায় অনেক কারখানারই মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের পুরো রফতানির ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক। আর এ তৈরি পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। আর এসব পণ্য উৎপাদন করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়।

কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক আমদানি বন্ধ। চীনের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করছেন, এ ধরনের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ইতিমধ্যে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্ধ নতুন এলসিও (ঋণপত্র)। আর বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশ তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগিরই অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্য। আটকে গেছে শত শত এলসি। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বহু ব্যবসায়ী। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্নভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

তিনি বলেন, এমনিতেই পণ্যের সরবরাহ নেই। এরপর আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তারা মজুদ করছে। এতে সংকট বাড়ছে। যে কারণে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তার মতে, মূলত আমরা সুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করি। আর যে রাজ্যে সুতা হয়, ভাইরাসের উৎপত্তি সেখানেই। তিনি বলেন ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর হাতে ১ থেকে ২ মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকে। বড় ফ্যাক্টরিতে ৩ থেকে ৪ মাস। কিছু পণ্য চীন থেকে আমদানি হলেও আমরা দেশ থেকে কিনি। কিন্তু বর্তমানে সংকটের পাশাপাশি দেশীয় ব্যবসায়ীরা মজুদ করে আরও সংকট তৈরি করছে। এতে কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ কারণে সবাই উদ্বিগ্ন। ওভেন পোশাকের ২০-৩০ শতাংশ দেশীয় বাজারে উৎপাদন হয়, বাকি ৭০-৮০ শতাংশই চীন থেকে আসে। এ বিশাল পরিমাণ কাঁচামাল আপাতত বাংলাদেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। ফলে পুরো চেইন ভেঙে পড়েছে।

এ অবস্থায় সরকারের কাছে আমাদের দু-একটি দাবি রয়েছে। এগুলো হল- বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা এবং এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দ্রুততার সঙ্গে করা। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে নতুন করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

দেশটির সরকারি হিসাবেই ইতিমধ্যে এ ভাইরাসে ৪৫ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে মারা গেছেন সাড়ে তেরশো’র বেশি মানুষ। বন্ধ রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্ব অর্থনীতি, শেয়ারবাজার এবং আমদানি-রফতানিতে এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ চীন থেকে যে সব পণ্য আমদানি করে এর মধ্যে রয়েছে- টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, সার, টায়ার, লৌহ ও ইস্পাত, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও গম। অন্যদিকে বাংলাদেশ চীনে যেসব পণ্য রফতানি করে এগুলো হল- চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চা, তৈরি পোশাক এবং মৎস্যজাতীয় পণ্য।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এসেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, চীন থেকে আমরা বিশাল অংকের পণ্য আমদানি করি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্পকারখানায় ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দেশটিতে রফতানিও রয়েছে। ভাইরাসের কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিসিসিসিআইর তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এ সম্ভাবনায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে।

কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ না এগোলে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়ও। বাংলাদেশে কর্মরত অনেক চীনা সে দেশে আটকে পড়েছেন। আর সময়মতো কাজ না এগোলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে বা বাড়ানোর অজুহাত তোলা হতে পারে। কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন। শুধু পদ্মা সেতুতেই চীনের ১১শ’ নাগরিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ছুটিতে দেশে গিয়েছিলেন ২৫০ জন।

এছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত আছেন। এসব প্রকল্পে দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন। তার বাইরে আরও কিছু প্রকল্পে ৫শ’ চীনা নাগরিক সহায়তা করছেন।

এরই মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত ৩৫ চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত চীনের অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের ফেরা অনিশ্চিত।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস