কাঠমান্ডুর বিমান ট্র্যাজেডি

যান্ত্রিক ত্রুটির দিকেই নজর তদন্ত দলের

  মুজিব মাসুদ ১৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ড্যাস-৮ কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফটের ‘যান্ত্রিক ত্রুটির ক্লু’ সামনে রেখে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি। পাশাপাশি রানওয়ের সংকেত নিয়ে টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের ‘রেডিও টেলিফোনি’র (আরটি) ভুল বোঝাবুঝি, পাইলটের ভুল ‘রিড ব্যাক’, টাওয়ারের ভুল সংশোধন না করা ও ‘ল্যান্ডিং কন্ট্রোল’ কার হাতে ছিল- এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে এ কমিটি।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নেপাল সরকারের গঠিত ৬ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির সঙ্গে কাজ করছেন- বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনের এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত পাওয়া দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে মনে করছে, দুর্ঘটনাটি এয়ারক্রাফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও হতে পারে। আর এ কারণেই পাইলট দ্রুততার সঙ্গে রানওয়ের ‘টু জিরো (উত্তর)’ প্রান্ত দিয়ে অবতরণের চেষ্টা করেছেন।

তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিদের আরও ধারণা, অবতরণের সময় ‘এয়ারক্রাফটের ল্যান্ডিং কন্ট্রোল’ কো-পাইলট অর্থাৎ ফার্স্ট অফিসারের হাতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান ‘আরটি’ (পাইলটের সঙ্গে বিমানবন্দর টাওয়ারে যোগাযোগ) করেছেন, আর ককপিটের ডান পাশে বসে ‘ল্যান্ডিং কন্ট্রোল’ করেছেন কো-পাইলট পৃথুলা রশিদ। অবতরণের আগমুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই টাওয়ারের সংকেত না মেনে দ্রুত রানওয়ের ‘টু জিরো (উত্তর)’ প্রান্ত দিয়ে অবতরণের চেষ্টা করা হয়। আর অভিজ্ঞতা কম থাকায় ও রানওয়েতে আইএলএস (ইনস্ট্র–মেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম) না থাকায় কো-পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। যার কারণে রানওয়ে খুঁজে পাওয়ার আগেই উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

আরও জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত সব তথ্য নিশ্চিত করতে এয়ারক্রাফটের ফ্লাইট ডাটা মনিটর (এফডিএম) ও রেডিও টেলিফোনি’র তথ্য খুঁজতে উড়োজাহাজের ‘ব্ল্যাক বক্সটি’ পাঠানো হয়েছে

সিঙ্গাপুরে। ফ্লাইট উড্ডয়ন থেকে শুরু করে দুর্ঘটনার আদ্যোপান্ত তথ্য সংরক্ষিত আছে ব্ল্যাক বক্সে।

দুর্ঘটনার প্রাথমিক আলামত সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য শিগগির উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সিভিল এভিয়েশনের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে পুরো বিষয়টি খুঁজে বের করা ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা আছে তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছেন, ঘটনার সময় ‘আরটি’র নিয়ন্ত্রণ ছিল মূল পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের হাতে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশনের অপারেশন ম্যানুয়াল অনুযায়ী, যেসব এয়ারপোর্টে ‘অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম’ থাকবে না, সেসব বিমানবন্দরে দুই ক্যাপ্টেনের মধ্যে একজন টাওয়ারের সঙ্গে ‘আরটি’ করবেন, আর অপর পাইলট ওই কথোপকথন শুনে ফ্লাইট অবতরণ করাবেন। টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি দেখতে পেয়েছে- ওই দিন অবতরণের আগে অন্তত ৩০ বার টাওয়ারের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান। আর কো-পাইলটের (ফার্স্ট অফিসার) ভয়েস ছিল মাত্র ৪ বার, যার দুটিই ছিল পাইলটের সঙ্গে। এ থেকে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, ঘটনার আগে উড়োজাহাজের ‘ল্যান্ডিং কন্ট্রোল’ ছিল কো-পাইলট পৃথুলা রশিদের হাতে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ। এখানে ফ্লাইট অবতরণ ও উড্ডয়নে ঝুঁকি রয়েছে। কাজেই এ বিমানবন্দরে অভিজ্ঞ পাইলট ছাড়া ফ্লাইট অবতরণ মোটেই উচিত নয়। তাদের আরও ধারণা, বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে ফার্স্ট অফিসার পৃথুলা রশিদের অভিজ্ঞতা খুব বেশি নয়। এ কারণে ল্যান্ডিং কন্ট্রোল তার হাতে থাকায় এ রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

নাম প্রকাশ না করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, উড়োজাহাজটি অবতরণের আগমুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়তে পারে। যে কারণে পাইলট দ্রুততার সঙ্গে অবতরণ করতে চেয়েছিলেন। যেহেতু ওই সময় রানওয়ের জিরো টু (দক্ষিণ) প্রান্ত বন্ধ ছিল, সে কারণে তারা বিপজ্জনক জেনেও উত্তর প্রান্ত দিয়ে অবতরণের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রানওয়ে খুঁজে না পেয়ে ফ্লাইটটি পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠে অবতরণ করাতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। এদিকে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেছেন, নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তদন্তে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। তিনি বলেন, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) নিয়ম অনুযায়ী ৩৬৫ দিনের মধ্যে এ ধরনের তদন্ত শেষ করতে হয়। প্রয়োজনে আরও বেশি সময় নেয়া যেতে পারে।

এদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- পাইলট ও এয়ারক্রাফটে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না। নেপাল সিভিল এভিয়েশনের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানও বলেছেন, এয়ারক্রাফটে কোনো সমস্যা ছিল না। তাই তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য না দেয়ার জন্য তারা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিমান সংস্থাটির জেনারেল ম্যানেজার কামরুল হাসান বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

সোমবার কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ৭১ আরোহীর মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে চার ক্রুসহ ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজটি কেন দুর্ঘটনায় পড়ল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের একটি রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে, যাতে মনে হয় রানওয়েতে নামা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

ত্রিভুবন কর্তৃপক্ষ বলেছে, যেদিক দিয়ে বিমানটির রানওয়েতে নামার কথা ছিল, পাইলট নেমেছেন তার উল্টো দিক দিয়ে। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ এ দুর্ঘটনার জন্য ত্রিভুবনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনেছে।

সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ তদন্ত করছে নেপাল। আমাদের টিম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। এ প্রক্রিয়া চলামান থাকবে।’

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter