যুগান্তর নিয়ে বিশেষ লেখা: যুগান্তরকে পছন্দ করি
jugantor
যুগান্তর নিয়ে বিশেষ লেখা: যুগান্তরকে পছন্দ করি

  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

যুগান্তর পত্রিকার সঙ্গে আমার অনেকদিনের যোগাযোগ। ঢাকায় পত্রিকাটির দফতরেও গিয়েছি। ঈদ সংখ্যাতেও লিখেছি। আমার সঙ্গে পরিচয় আছে ওদের অনেক সাংবাদিক এবং পত্রিকার লেখক-সাহিত্যিকের।

পত্রিকার ২০ বছর পূর্ণ হওয়ায় পত্রিকার স্বত্বাধিকারী, সম্পাদক, সাংবাদিক, সংবাদকর্মী ও পাঠকদের গভীর প্রীতি শুভেচ্ছা জানাই। আমি মাঝেমধ্যে ঢাকায় যাই। দেখতে পাই খবরের কাগজগুলোর মধ্যে যুগান্তরের বেশ ভালোই জনপ্রিয়তা রয়েছে। যুগান্তর, প্রথম আলোকে বেশ পছন্দ করি।

ওদের সার্কুলেশন ভালোই, পড়ার জন্য ভালো লাগে। আমার বেশ পছন্দের কাগজ। যুগান্তর নামটি আমাদের মতো কলকাতার বাসিন্দাদের স্মৃতিকে আর একটু উসকে দেয়। এক সময় কলকাতায় অমৃতবাজার, যুগান্তর কাগজ ছিল। আনন্দবাজারের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেই যুগান্তর।

সেটি বেশ কয়েক বছর আগে উঠে গেছে। পরিবর্তে বাংলাদেশের যুগান্তরকে পেয়েছি। যদিও সেই কাগজে বাংলাদেশের খবর প্রাধান্য পায়। তবে নানা সময়ে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের খবরকেও ওরা গুরুত্ব দেয়।

আমার মতো যাদের নাড়ি বাংলাদেশে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই সংবাদপত্রকে ঘিরে একটু বেশি আবেগ-অনুভূতি তো থাকবেই। দুই বাংলার সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে ২০ বছর পার হওয়া যুগান্তরের পাতায়। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং কৃতিত্বের।

মৌলবাদ তথা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে দুই দশক ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা ‘যুগান্তর’ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে, তা বিশ্বের বাঙালি সমাজে অতীব প্রশংসার দাবি রাখছে। একটা কথা সবাইকে বলা উচিত- মৌলবাদ সারা পৃথিবীর মাথাব্যথার কারণ।

মৌলবাদ মানেই ধ্বংসাত্মক। গঠনমূলক সমাজের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের একটা নীতি- ভেঙে ফেল, মেরে ফেল। নানা ধরনের মৌলবাদের জন্ম নিচ্ছে। আমরা যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, আমরা কেউই এই মৌলবাদকে পছন্দ করি না। যারা স্থিতধী, যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, ছেলেমেয়ে-পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে ভালোবাসি, তারা সবাই মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করি।

আমাদের কাছে মৌলবাদ একটা চরম অভিশাপের মতো। মৌলবাদের অগ্ন্যুৎপাতে, বিস্ফোরণের ধাক্কায় সারা পৃথিবী ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই অদূরদর্শী আন্দোলন কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়।

দেখা যায়, কিছু কাগজ, কতিপয় মানুষ এসব মৌলবাদকে সমর্থন করছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যের। কিন্তু সেই মৌলবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে যুগান্তর বছরের পর বছর নিজেদের লড়াই জারি রেখে দায়িত্ব পালন করছে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে এই পত্রিকার পাতায় অনেক লেখকই বছরের পর বছর কলম ধরেছেন, এটা শুধু প্রশংসার।

ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদীদের পক্ষে জনমত তৈরি করে যুগান্তর যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে বলে আমরা সবাই বিশেষভাবে খুশি। বস্তুত এ কারণেই আমি বা আমরা যুগান্তর কাগজের গুণগ্রাহী। কারণ, সন্ত্রাসবাদ ও হিংসার বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে এই পত্রিকা জনমত গঠনে মূল্যবান ভূমিকা পালন করছে, যা দুই দেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমার অবিভক্ত ভারতের ময়মনসিংহে জন্ম। তা হলে আমি লুকাব কেন? আমি লুকাইনি। আমার কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই, কাগজ নেই, তার মানে কি আমি পাকিস্তানি? না, ভারতীয় নই? এর জবাব কে দেবে? তাই নাগরিকত্বের নামে কাগজ চেয়ে ভারত সরকার এখন যে নিয়ম চালু করতে চাইছে, তা কিন্তু আমি সমর্থন করি না।

আসলে আমি ছেলেবেলা থেকে মানুষের পক্ষে, কোনো জাত-ধর্ম-বর্ণের পক্ষে নই। এটা কিন্তু ময়মনসিংহের মাটি থেকেই শিখে এসেছি। আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। ট্রান্সফারের চাকরি ছিল তার। বাবার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি।

বাংলার নদী-খাল-বিলের পরিচয় জেনেছি। এখনও বাংলাদেশে যখন যাই, তখন ওই গ্রাম-জনপদের টানে ঘুরে বেড়াই। বাবার সঙ্গে একবার চলে এসে ফের ময়মনসিংহে গিয়েছি। ফের কলকাতা এসেছি।

তবে ওখানকার জল-হাওয়া আজও আমায় টানে। বছর কয়েক আগে একবার গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। দেখা হয়েছে অনেক মানুষের সঙ্গে। ফিরে পেয়েছি ছেলেবেলার স্মৃতি। যেমন ঢাকার এই নবকলেবরের যুগান্তরের হাত ধরে কলকাতার পুরনো পত্রিকার গন্ধ খুঁজে ফিরছি।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, কথাসাহিত্যিক

যুগান্তর নিয়ে বিশেষ লেখা: যুগান্তরকে পছন্দ করি

 শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

যুগান্তর পত্রিকার সঙ্গে আমার অনেকদিনের যোগাযোগ। ঢাকায় পত্রিকাটির দফতরেও গিয়েছি। ঈদ সংখ্যাতেও লিখেছি। আমার সঙ্গে পরিচয় আছে ওদের অনেক সাংবাদিক এবং পত্রিকার লেখক-সাহিত্যিকের।

পত্রিকার ২০ বছর পূর্ণ হওয়ায় পত্রিকার স্বত্বাধিকারী, সম্পাদক, সাংবাদিক, সংবাদকর্মী ও পাঠকদের গভীর প্রীতি শুভেচ্ছা জানাই। আমি মাঝেমধ্যে ঢাকায় যাই। দেখতে পাই খবরের কাগজগুলোর মধ্যে যুগান্তরের বেশ ভালোই জনপ্রিয়তা রয়েছে। যুগান্তর, প্রথম আলোকে বেশ পছন্দ করি।

ওদের সার্কুলেশন ভালোই, পড়ার জন্য ভালো লাগে। আমার বেশ পছন্দের কাগজ। যুগান্তর নামটি আমাদের মতো কলকাতার বাসিন্দাদের স্মৃতিকে আর একটু উসকে দেয়। এক সময় কলকাতায় অমৃতবাজার, যুগান্তর কাগজ ছিল। আনন্দবাজারের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেই যুগান্তর।

সেটি বেশ কয়েক বছর আগে উঠে গেছে। পরিবর্তে বাংলাদেশের যুগান্তরকে পেয়েছি। যদিও সেই কাগজে বাংলাদেশের খবর প্রাধান্য পায়। তবে নানা সময়ে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের খবরকেও ওরা গুরুত্ব দেয়।

আমার মতো যাদের নাড়ি বাংলাদেশে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই সংবাদপত্রকে ঘিরে একটু বেশি আবেগ-অনুভূতি তো থাকবেই। দুই বাংলার সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে ২০ বছর পার হওয়া যুগান্তরের পাতায়। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং কৃতিত্বের।

মৌলবাদ তথা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে দুই দশক ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা ‘যুগান্তর’ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে, তা বিশ্বের বাঙালি সমাজে অতীব প্রশংসার দাবি রাখছে। একটা কথা সবাইকে বলা উচিত- মৌলবাদ সারা পৃথিবীর মাথাব্যথার কারণ।

মৌলবাদ মানেই ধ্বংসাত্মক। গঠনমূলক সমাজের বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের একটা নীতি- ভেঙে ফেল, মেরে ফেল। নানা ধরনের মৌলবাদের জন্ম নিচ্ছে। আমরা যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, আমরা কেউই এই মৌলবাদকে পছন্দ করি না। যারা স্থিতধী, যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, ছেলেমেয়ে-পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে ভালোবাসি, তারা সবাই মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করি।

আমাদের কাছে মৌলবাদ একটা চরম অভিশাপের মতো। মৌলবাদের অগ্ন্যুৎপাতে, বিস্ফোরণের ধাক্কায় সারা পৃথিবী ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই অদূরদর্শী আন্দোলন কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়।

দেখা যায়, কিছু কাগজ, কতিপয় মানুষ এসব মৌলবাদকে সমর্থন করছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যের। কিন্তু সেই মৌলবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে যুগান্তর বছরের পর বছর নিজেদের লড়াই জারি রেখে দায়িত্ব পালন করছে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে এই পত্রিকার পাতায় অনেক লেখকই বছরের পর বছর কলম ধরেছেন, এটা শুধু প্রশংসার।

ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদীদের পক্ষে জনমত তৈরি করে যুগান্তর যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে বলে আমরা সবাই বিশেষভাবে খুশি। বস্তুত এ কারণেই আমি বা আমরা যুগান্তর কাগজের গুণগ্রাহী। কারণ, সন্ত্রাসবাদ ও হিংসার বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে এই পত্রিকা জনমত গঠনে মূল্যবান ভূমিকা পালন করছে, যা দুই দেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমার অবিভক্ত ভারতের ময়মনসিংহে জন্ম। তা হলে আমি লুকাব কেন? আমি লুকাইনি। আমার কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই, কাগজ নেই, তার মানে কি আমি পাকিস্তানি? না, ভারতীয় নই? এর জবাব কে দেবে? তাই নাগরিকত্বের নামে কাগজ চেয়ে ভারত সরকার এখন যে নিয়ম চালু করতে চাইছে, তা কিন্তু আমি সমর্থন করি না।

আসলে আমি ছেলেবেলা থেকে মানুষের পক্ষে, কোনো জাত-ধর্ম-বর্ণের পক্ষে নই। এটা কিন্তু ময়মনসিংহের মাটি থেকেই শিখে এসেছি। আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। ট্রান্সফারের চাকরি ছিল তার। বাবার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি।

বাংলার নদী-খাল-বিলের পরিচয় জেনেছি। এখনও বাংলাদেশে যখন যাই, তখন ওই গ্রাম-জনপদের টানে ঘুরে বেড়াই। বাবার সঙ্গে একবার চলে এসে ফের ময়মনসিংহে গিয়েছি। ফের কলকাতা এসেছি।

তবে ওখানকার জল-হাওয়া আজও আমায় টানে। বছর কয়েক আগে একবার গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। দেখা হয়েছে অনেক মানুষের সঙ্গে। ফিরে পেয়েছি ছেলেবেলার স্মৃতি। যেমন ঢাকার এই নবকলেবরের যুগান্তরের হাত ধরে কলকাতার পুরনো পত্রিকার গন্ধ খুঁজে ফিরছি।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, কথাসাহিত্যিক