খরচ বাড়িয়ে বিপাকে নির্বাচন কমিশন

  কাজী জেবেল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনা, ভোটার নিবন্ধন, সেমিনার, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসহ নানা খাতে বরাদ্দের চেয়ে ব্যয় বাড়িয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনা ছাড়াই মাঝপথে প্রবাসীদের ভোটার করা, ৬৪৮টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেয়ায় ইসির সংকট আরও বেড়েছে।

কমিশনের অধীনস্ত জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ ও নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের অন্তত ৫টি খাতে বরাদ্দের অতিরিক্ত ১৬৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের বাইরেই রয়েছে ৩টি নতুন খাত। বাকি দুটি খাতে বরাদ্দের দ্বিগুণের বেশি চাহিদা দেয়া হয়েছে।

অর্থবছরের মাঝপথে এভাবে খরচের প্রস্তাব বাড়িয়ে দিলেও কাঙ্ক্ষিত টাকা পাচ্ছে না ইসি। উল্টো নির্বাচন খাত থেকে ৯০ কোটি টাকা কমিয়ে দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এর মধ্যে ৩০ কোটি টাকা নির্বাচনী প্রশিক্ষণ খাতে দেয়া হচ্ছে। এই টানাটানির মধ্যে অনেক কর্মসূচি কমিয়ে বছরের বাকি সময় চলতে হবে ইসিকে। যদিও এ সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩৩৫টি নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্রগুলো বলছে, ভোটে ইভিএম ব্যবহার, প্রবাসীদের ভোটার করা ও ভোটের কার্যক্রমে নতুন যন্ত্রপাতি কেনার চাহিদা আসায় বরাদ্দের চেয়ে খরচ বেড়ে গেছে। এছাড়া প্রকল্পের বাইরে অর্থের সংস্থান ছাড়াই ২০১৮ সালে ৪ দফায় ২ হাজার ৫৩৫ সেট ইভিএম কেনা হয়।

ওই টাকা চেয়ে বারবার চিঠি দিচ্ছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। এসব খাতে বাড়তি টাকা চেয়ে বারবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেও কাঙ্ক্ষিত টাকা মেলেনি। শুধু নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটকে এ পর্যন্ত ৩০ কোটি টাকা উপযোজনের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।

জানতে চাওয়া হলে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ভোটার দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সেমিনার করার পরিকল্পনা থাকলেও করোনাভাইরাসের কারণে বাতিল করা হয়েছে। এখানেই অনেক টাকা খরচ হবে না। এছাড়া যে টাকা বরাদ্দ থাকছে তাতে আশা করি হয়ে যাবে।

চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না পেলে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতি কমে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২ হাজার ৫৩৫ সেট ইভিএম চুক্তিকে কিনেছিলাম।

এখনও টাকা দিতে পারিনি। বাস্তবতার নিরিখে প্রবাসীদের ভোটার করার কার্যক্রমসহ অনেক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না পেলে যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে তা হবে না। তবে পর্যায়ক্রমে টাকা পাওয়ার পর তা বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, বাড়তি বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আমরা অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনে চিঠি লিখব, যোগাযোগ করব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বছরের মাঝপথে এসে এ চাহিদা প্রমাণ করে চলতি বাজেট তৈরির আগে পরিকল্পনার অভাব ছিল। আবার বাজেটের বাইরে কয়েক শ ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কারণেই শুধু প্রশিক্ষণ খাতেই খরচ বেড়েছে ৮ গুণের বেশি। অথচ ব্যয় কমাতে বারবার নানাভাবে তাগিদ দিয়ে আসছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাদ্দ ঠিক থাকলেও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ সবচেয়ে বেশি টাকা চাইছে। প্রতিষ্ঠানটি বাড়তি চেয়েছে ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৮৭ হাজার ৮১৫ টাকা। আর নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট বাড়তি ২০ কোটি টাকা পেয়ে তাদের বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটি আরও ৩৭ কোটি ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫০ টাকা চেয়েছে। যদিও এই অর্থ দিতে রাজি নয় অর্থ মন্ত্রণালয়। আরও জানা যায়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বরাদ্দকৃত টাকায় চলে যাবে বছরের বাকি পাঁচ মাস। উল্টো নির্বাচন খাত থেকে ৯০ কোটি টাকা কমিয়ে দেয়ায় ৩১০ কোটি টাকার বরাদ্দ কমে ২২০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ ৫টি খাতে ২৯৮ কোটি ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৮১৫ টাকা চেয়েছে। অথচ সংস্থাটির জন্য অর্থের সংস্থান রয়েছে ১৬৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বাড়তি চাহিদা ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৮৭ হাজার ৮১৫ টাকা। পাঁচটি খাতের তিনটির বিপরীতে কোনো টাকা বরাদ্দই নেই।

খরচের খাতায় এ তিনটি খাতও যুক্ত হয়েছে। এতে অর্থের চাহিদা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (১০+ নাগরিক নিবন্ধন বাবদ ব্যয়) খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৬৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ খাতে ব্যয় বাড়িয়ে সংশোধিত বাজেটে ১৩০ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার টাকা চেয়েছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ভোটার নিবন্ধনের জন্য ৬৪৮টি ল্যাপটপ এবং ৬০০টি রেজিস্ট্রেশন কিটের ৫টি আইটেমসহ (আইরিশ, স্ক্যানার, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড ও ডকুমেন্ট স্ক্যানার) বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার কথা বলা হয়েছে।

সূত্র বলছে, নির্বাচন কমিশন মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার করার কার্যক্রম উদ্বোধন করেছে। অথচ এ খাতে কোনো টাকা বরাদ্দ নেই। প্রবাসীদের ভোটার করতে চলতি অর্থবছরে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ জানিয়েছে ওই তিন দেশের পাশাপাশি সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের ভোটার কার্যক্রম শুরু হবে জুনের আগে। চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ছয়টি দেশে ইসির ৮টি টিম কাজ করবে।

একটি টিম ২০ দিন অবস্থান করে দেশে ফেরত আসবে, আবার আরেকটি টিম যাবে। এদের যাতায়াত ও খরচ বাবদ ১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এ টাকা বরাদ্দের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পায়নি ইসি।

সূত্রমতে, ইভিএম কেনার একটি প্রকল্প চলমান আছে। ওই প্রকল্পের বাইরে গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনের জন্য ২০১৮ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার দফায় ২ হাজার ৫৩৮ সেট ইভিএম সংগ্রহ করে ইসি। কিন্তু প্রতিটি ইভিএমের দাম ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৭৫ টাকা দরে মোট ৪৮ কোটি ৯১ লাখ ৯১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা এখনও বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে পরিশোধ করেনি ইসি।

গত ডিসেম্বর মাসেও চিঠি দিয়ে টাকা পরিশোধের অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশোধিত বাজেটে ওই টাকা চেয়েছে ইসি। এছাড়া ভোটার দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সেমিনারের পরিকল্পনা করে ইসি। বাজেট না থাকা এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে তা বাতিল করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট : ভোটে ইভিএম ব্যবহারের কারণে বেড়ে গেছে প্রশিক্ষণ ব্যয়। চলতি অর্থবছরে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে (ইটিআই) ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে তা উপযোজনের মাধ্যমে বাড়িয়ে ৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। সম্প্রতি ইটিআই’র মহাপরিচালক এক চিঠিতে আরও ৩৭ কোটি ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫০ টাকা বাড়তি বরাদ্দ চেয়েছেন। এর সংযুক্তি হিসেবে ৩৩ পৃষ্ঠার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন তিনি।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত