বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর কেলেঙ্কারি: অর্ধশত কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতি
jugantor
বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর কেলেঙ্কারি: অর্ধশত কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতি
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন: বিভিন্ন প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ, নিশ্চিত হয়নি কাজের গুণগতমান এবং তোয়াক্কা করেনি বিধিবিধানের

  যুগান্তর রিপোর্ট  

০২ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) মিলেছে আরেক পিকে হালদারের সন্ধান। তিনি হচ্ছেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী। তবে হালদারের মতো এই গোস্বামী বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি করে পালিয়ে যাননি। কিন্তু বেবিচকের প্রায় সব প্রকল্পে পড়েছে তার দুর্নীতির থাবা।

পদে পদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ করেছেন পছন্দের ঠিকাদার। তোয়াক্কা করেননি বিধিবিধানের। কাজের গুণগতমান নিশ্চিতে ছিল না আন্তরিকতা। শুধু তা-ই নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে বেবিচকের নানা কাজের মেইনটেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ), কনস্ট্রাকশন (অবকাঠামো তৈরি), কেনাকাটা ও ফান্ড ম্যানেজমেন্টে (তহবিল ব্যবস্থাপনা) নানা অনিয়মের অভিযোগ। আর এসব অনিয়মের মধ্য দিয়েই সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলী নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি দেশে-বিদেশেও গড়েছেন অঢেল সম্পদ- এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো ইতিমধ্যে পৃথকভাবে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তদন্তে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৫ ফেব্রুয়ারি সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীকে ‘জনস্বার্থে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর’ দেয়া হয়।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টের আলোকে গোস্বামীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতি করার অভিযোগে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীকে ২০১৮ সালের জুনে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ১১ ফেব্রুয়ারি আবারও তাকেসহ ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে দুদক। সুধেন্দু ছাড়া বাকি পাঁচ কর্মকর্তা হলেন বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম মাকসুদুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম, মো. শহীদুজ্জামান, মো. মোকাব্বর আলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী কাজী বায়েজিদ আহমেদ।

জানতে চাইলে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেইনি। প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিকালীন কোনো ধরনের শপথ ভঙ্গ করিনি। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রশ্নই আসে না। আয়কর ফাইলের বাইরে আমার নামে কোনো সম্পদ নেই। বাপ-দাদা যে সম্পত্তি রেখে গেছেন, সেই সম্পদের বাইরে আমার কিছু নেই। অর্ধশত কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো সত্য নয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। সবকিছুর লিখিত জবাব দিয়েছি।

ইমপোর্ট কার্গো ক্যানোপি নির্মাণে দুর্নীতি : মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমপোর্ট কার্গো ক্যানোপি নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এই প্রকল্প থেকে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কাজটি ১নং সিভিল ডিভিশনের আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি করার জন্য বিধিবহির্ভূতভাবে সিভিল ডিভিশন-২-কে দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি ইজিপির পরিবর্তে নন-ইজিপি ও এলটিএম পদ্ধতিতে করানো হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪টি প্যাকেজের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন করা হয়। অথচ ৪টি প্যাকেজই একই ঠিকাদারের মাধ্যমে করানো হয়।

আনসার ব্যারাক নির্মাণে অনিয়ম : কুর্মিটোলার বেবিচকের আবাসিক এলাকায় দোতলাবিশিষ্ট আনসার ব্যারাক নির্মাণেও প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রকল্পের নির্মাণকাজে প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিনি কোনো ধরনের তদারকি করেননি। দরজার চৌকাঠ ও পাল্লায় নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করায় কিছুদিনের মধ্যে এতে ফাটল দেখা দিয়েছে। চিটাগাং টিকের বদলে নিম্নমানের আমকাঠ লাগানো হয়েছে। ভাঙাচোরা টেন হোল ব্রিক লাগানো হয়েছে। ভবনের সামনের রাস্তায় আরসিসি ঢালাই প্রাক্কলনের চেয়ে প্রস্থে দেড় ফুট কম দেয়া হয়েছে। কিউরিং করা হয়নি। আনসার সদস্যদের থাকার জন্য স্টিল ফ্রেমের খাট তৈরিতে গর্জন কাঠের বদলে নিম্নমানের আম-শিমুল কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি এই প্রকল্প থেকে ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

প্রধান প্রকৌশলীর যথাযথ তদারকি ও সমন্বয় না করায় সিভিল এভিয়েশনের মসজিদের বাইরে এবং ডিজাইনের চারদিকে ফাইবার শিট ব্যবহারের কথা উল্লেখ না থাকলেও বিনা কারণে উন্মুক্ত স্থানে ৮ মিমি. থিকনেস ফাইবার শিট অযৌক্তিকভাবে ব্যবহার করে সরকারের কমপক্ষে ৭৮ লাখ টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। এজন্য সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী সরাসরি দায়ী বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং তার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলীরা অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন প্রকল্প ভাগ করে তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে সম্পন্ন করে সরকারের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেন। এর মধ্যে সৈয়দপুর ও রাজশাহী বিমানবন্দরের একক কাজকে অযৌক্তিকভাবে একাধিকভাবে বিভক্ত এবং ফাঁকফোকর তৈরি করে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। তার অবহেলা, উদাসীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং দুর্নীতির কারণে যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ এক বছরেও শেষ হয়নি। এ কারণে বিমানবন্দরগুলোয় চরমভাবে যাত্রী ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর তদারকি, সমন্বয় ও দক্ষতার অভাবে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির নির্মাণাধীন হেড কোয়ার্টার ভবনটির নির্মাণকাজ ৯ বছরেও সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্পটি ৬১ কোটি টাকায় তিন বছরে করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রধান প্রকৌশলীর অদক্ষতা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে ব্যয় বেড়ে ১৪৭ কোটি টাকা হয়েছে। এতে সরকারি কাজের মারাত্মকভাবে বিঘ্ন হওয়াসহ কর্তৃপক্ষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেবিচকের অর্থবছর সম্পন্ন হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গৃহীত প্রকল্পের তালিকা দিতে মন্ত্রণালয় থেকে চারবার তাগিদ দেয়া হলেও সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী দিতে ব্যর্থ হন। তালিকা অনুযায়ী দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ ৮টি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে- এ মর্মে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষ ওইসব প্রকল্পে বিধিসম্মতভাবে ঠিকাদার নিয়োগ না করেই প্রধান প্রকৌশলীর মৌখিক নির্দেশে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যা পিপিআরের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির শামিল। প্রধান প্রকৌশলী নিজের পছন্দমতো ঠিকাদারকে দিয়ে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে প্রকল্প গ্রহণ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী সিভিল এভিয়েশনের স্বার্থে বা প্রয়োজনে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেননি। এক্ষেত্রে পিপিআরের চরম ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি প্রকল্পকে একাধিক ভাগে ভাগ করে একই এবং তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েক কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। মূলত তার পছন্দের ৫-৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের দিয়ে তিনি ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করা হয়।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম : তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির জন্য বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীই মূলত দায়ী। কারণ, প্রকল্পের কাজ সরাসরি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজেই তত্ত্বাবধান করেননি তিনি। অধিগ্রহণের মতো আইনি জটিল কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের বিষয়ে তিনি কোনো উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেননি। পুরো কাজটিই তিনি প্রকল্প পরিচালকের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রকল্পটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করেছেন। তাই সরকারি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। যথাসময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টাকা জমা দিতে না পারার বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাননি।

মূলত তার অবহেলার কারণে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যথাসময়ে টাকা জমা দেয়া সম্ভব হয়নি। যদি তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে অতীতের নজির হিসেবে বেবিচকের নিজস্ব তহবিল থেকেও এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হতো।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করে তিনি নিজে প্রকল্পের ‘দি ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করেছেন। তার অবহেলা, উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ৯ হাজার বর্গফুট থেকে ১২ হাজার বর্গফুটে উন্নীতকরণের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। একইভাবে তার অদক্ষতায় রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজের ডিপিপি ১ বছরেও প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন ১ ও ২ এর নবরূপায়ণ কার্যক্রমের ডিপিপি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের চাপে তড়িঘড়ি করে যে ডিপিপি তৈরি করেছে, সেটিও ছিল অসংখ্য ভুলে ভরা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের ৩৭ কোটি টাকার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী এই প্রকল্পের দি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ের কাজ এক বছরেও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-প্রাচীর নির্মাণ না করায় বর্তমানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার প্রধান প্রকৌশলীকে জানানো হলেও তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী মন্ত্রণালয়কে দেয়া তার লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিনি প্রকল্পের ‘দি ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে ছিলেন। তার দায়িত্ব হচ্ছে বেবিচক ও ঠিকাদারের মধ্যে চুক্তি সম্পর্কিত যে কোনো উদ্ভূত সমস্যার বিষয়ে সমঝোতা করা।

এসব কাজ তিনি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছেন। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল এবং খরচের ক্ষমতা তাকে অথরাইজ করা হয়নি। যেসব কাজের ভেরিয়েশন হয়েছে, তা ‘ওয়ার্ক ডান’ হিসেবে আরডিপিপিতে অনুমোদন করা হয়েছে। একই ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়ে উল্লেখ করা আছে।

তিনি বলেন, ভেরিয়েশন কনসালটেন্টের সুপারিশের ভিত্তিতে সবকিছু অনুমোদন দেয়া হয়। এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এখনও ভেরিয়েশন যথাযথভাবে অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের শুরুতেই অনিয়ম : প্রায় ২৪শ’ কোটি টাকার সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের (প্রথম ফেজ) কার্যাদেশও একটি প্রভাবশালী গ্রুপকে পাইয়ে দেয়ার নেপথ্যে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। জানা গেছে, প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা বেশি দামে কাজটি ওই চক্রকে পাইয়ে দেয়ার পেছনে তার ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে কাজটি যাতে বিলম্বিত হয়, সেজন্য প্রকল্প সংক্রান্ত নানা স্পর্শকাতর তথ্য দিয়েও তিনি ওই চক্রকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।

ই-জিপি না করে এক বছরে সরকারের ৩০ কোটি টাকা গচ্চা : সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ- তিনি একটি বড় কাজকে ই-জিপি না করে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে এলটিএম পদ্ধতিতে তার পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে সম্পন্ন করে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে সব ধরনের দরপত্র ই-জিপি না করায় ৩০ কোটি টাকা সরকারের গচ্চা গেছে। একইভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও প্রায় কোটি টাকা গচ্চা গেছে সরকারের।

জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৩৭টি কাজ ই-জিপির মাধ্যমে না করিয়ে এলটিএম পদ্ধতিতে করানো হয়েছে। শতকরা হারে এটি প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ। জানা গেছে, এজন্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীই মূলত দায়ী।

বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর কেলেঙ্কারি: অর্ধশত কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতি

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন: বিভিন্ন প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ, নিশ্চিত হয়নি কাজের গুণগতমান এবং তোয়াক্কা করেনি বিধিবিধানের
 যুগান্তর রিপোর্ট 
০২ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) মিলেছে আরেক পিকে হালদারের সন্ধান। তিনি হচ্ছেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী। তবে হালদারের মতো এই গোস্বামী বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি করে পালিয়ে যাননি। কিন্তু বেবিচকের প্রায় সব প্রকল্পে পড়েছে তার দুর্নীতির থাবা।

পদে পদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ করেছেন পছন্দের ঠিকাদার। তোয়াক্কা করেননি বিধিবিধানের। কাজের গুণগতমান নিশ্চিতে ছিল না আন্তরিকতা। শুধু তা-ই নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে বেবিচকের নানা কাজের মেইনটেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ), কনস্ট্রাকশন (অবকাঠামো তৈরি), কেনাকাটা ও ফান্ড ম্যানেজমেন্টে (তহবিল ব্যবস্থাপনা) নানা অনিয়মের অভিযোগ। আর এসব অনিয়মের মধ্য দিয়েই সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলী নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি দেশে-বিদেশেও গড়েছেন অঢেল সম্পদ- এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো ইতিমধ্যে পৃথকভাবে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তদন্তে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৫ ফেব্রুয়ারি সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীকে ‘জনস্বার্থে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর’ দেয়া হয়।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টের আলোকে গোস্বামীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতি করার অভিযোগে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীকে ২০১৮ সালের জুনে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ১১ ফেব্রুয়ারি আবারও তাকেসহ ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে দুদক। সুধেন্দু ছাড়া বাকি পাঁচ কর্মকর্তা হলেন বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম মাকসুদুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম, মো. শহীদুজ্জামান, মো. মোকাব্বর আলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী কাজী বায়েজিদ আহমেদ।

জানতে চাইলে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেইনি। প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিকালীন কোনো ধরনের শপথ ভঙ্গ করিনি। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রশ্নই আসে না। আয়কর ফাইলের বাইরে আমার নামে কোনো সম্পদ নেই। বাপ-দাদা যে সম্পত্তি রেখে গেছেন, সেই সম্পদের বাইরে আমার কিছু নেই। অর্ধশত কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো সত্য নয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। সবকিছুর লিখিত জবাব দিয়েছি।

ইমপোর্ট কার্গো ক্যানোপি নির্মাণে দুর্নীতি : মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমপোর্ট কার্গো ক্যানোপি নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এই প্রকল্প থেকে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কাজটি ১নং সিভিল ডিভিশনের আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি করার জন্য বিধিবহির্ভূতভাবে সিভিল ডিভিশন-২-কে দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি ইজিপির পরিবর্তে নন-ইজিপি ও এলটিএম পদ্ধতিতে করানো হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪টি প্যাকেজের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন করা হয়। অথচ ৪টি প্যাকেজই একই ঠিকাদারের মাধ্যমে করানো হয়।

আনসার ব্যারাক নির্মাণে অনিয়ম : কুর্মিটোলার বেবিচকের আবাসিক এলাকায় দোতলাবিশিষ্ট আনসার ব্যারাক নির্মাণেও প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রকল্পের নির্মাণকাজে প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিনি কোনো ধরনের তদারকি করেননি। দরজার চৌকাঠ ও পাল্লায় নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করায় কিছুদিনের মধ্যে এতে ফাটল দেখা দিয়েছে। চিটাগাং টিকের বদলে নিম্নমানের আমকাঠ লাগানো হয়েছে। ভাঙাচোরা টেন হোল ব্রিক লাগানো হয়েছে। ভবনের সামনের রাস্তায় আরসিসি ঢালাই প্রাক্কলনের চেয়ে প্রস্থে দেড় ফুট কম দেয়া হয়েছে। কিউরিং করা হয়নি। আনসার সদস্যদের থাকার জন্য স্টিল ফ্রেমের খাট তৈরিতে গর্জন কাঠের বদলে নিম্নমানের আম-শিমুল কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি এই প্রকল্প থেকে ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

প্রধান প্রকৌশলীর যথাযথ তদারকি ও সমন্বয় না করায় সিভিল এভিয়েশনের মসজিদের বাইরে এবং ডিজাইনের চারদিকে ফাইবার শিট ব্যবহারের কথা উল্লেখ না থাকলেও বিনা কারণে উন্মুক্ত স্থানে ৮ মিমি. থিকনেস ফাইবার শিট অযৌক্তিকভাবে ব্যবহার করে সরকারের কমপক্ষে ৭৮ লাখ টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। এজন্য সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী সরাসরি দায়ী বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং তার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলীরা অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন প্রকল্প ভাগ করে তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে সম্পন্ন করে সরকারের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেন। এর মধ্যে সৈয়দপুর ও রাজশাহী বিমানবন্দরের একক কাজকে অযৌক্তিকভাবে একাধিকভাবে বিভক্ত এবং ফাঁকফোকর তৈরি করে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। তার অবহেলা, উদাসীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং দুর্নীতির কারণে যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ এক বছরেও শেষ হয়নি। এ কারণে বিমানবন্দরগুলোয় চরমভাবে যাত্রী ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর তদারকি, সমন্বয় ও দক্ষতার অভাবে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির নির্মাণাধীন হেড কোয়ার্টার ভবনটির নির্মাণকাজ ৯ বছরেও সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্পটি ৬১ কোটি টাকায় তিন বছরে করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রধান প্রকৌশলীর অদক্ষতা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে ব্যয় বেড়ে ১৪৭ কোটি টাকা হয়েছে। এতে সরকারি কাজের মারাত্মকভাবে বিঘ্ন হওয়াসহ কর্তৃপক্ষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেবিচকের অর্থবছর সম্পন্ন হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গৃহীত প্রকল্পের তালিকা দিতে মন্ত্রণালয় থেকে চারবার তাগিদ দেয়া হলেও সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী দিতে ব্যর্থ হন। তালিকা অনুযায়ী দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ ৮টি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে- এ মর্মে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষ ওইসব প্রকল্পে বিধিসম্মতভাবে ঠিকাদার নিয়োগ না করেই প্রধান প্রকৌশলীর মৌখিক নির্দেশে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যা পিপিআরের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির শামিল। প্রধান প্রকৌশলী নিজের পছন্দমতো ঠিকাদারকে দিয়ে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে প্রকল্প গ্রহণ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী সিভিল এভিয়েশনের স্বার্থে বা প্রয়োজনে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেননি। এক্ষেত্রে পিপিআরের চরম ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি প্রকল্পকে একাধিক ভাগে ভাগ করে একই এবং তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েক কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। মূলত তার পছন্দের ৫-৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের দিয়ে তিনি ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করা হয়।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম : তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির জন্য বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীই মূলত দায়ী। কারণ, প্রকল্পের কাজ সরাসরি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজেই তত্ত্বাবধান করেননি তিনি। অধিগ্রহণের মতো আইনি জটিল কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের বিষয়ে তিনি কোনো উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেননি। পুরো কাজটিই তিনি প্রকল্প পরিচালকের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রকল্পটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করেছেন। তাই সরকারি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। যথাসময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টাকা জমা দিতে না পারার বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাননি।

মূলত তার অবহেলার কারণে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যথাসময়ে টাকা জমা দেয়া সম্ভব হয়নি। যদি তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে অতীতের নজির হিসেবে বেবিচকের নিজস্ব তহবিল থেকেও এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হতো।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করে তিনি নিজে প্রকল্পের ‘দি ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করেছেন। তার অবহেলা, উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ৯ হাজার বর্গফুট থেকে ১২ হাজার বর্গফুটে উন্নীতকরণের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। একইভাবে তার অদক্ষতায় রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজের ডিপিপি ১ বছরেও প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন ১ ও ২ এর নবরূপায়ণ কার্যক্রমের ডিপিপি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের চাপে তড়িঘড়ি করে যে ডিপিপি তৈরি করেছে, সেটিও ছিল অসংখ্য ভুলে ভরা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের ৩৭ কোটি টাকার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী এই প্রকল্পের দি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ের কাজ এক বছরেও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-প্রাচীর নির্মাণ না করায় বর্তমানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার প্রধান প্রকৌশলীকে জানানো হলেও তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী মন্ত্রণালয়কে দেয়া তার লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিনি প্রকল্পের ‘দি ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে ছিলেন। তার দায়িত্ব হচ্ছে বেবিচক ও ঠিকাদারের মধ্যে চুক্তি সম্পর্কিত যে কোনো উদ্ভূত সমস্যার বিষয়ে সমঝোতা করা।

এসব কাজ তিনি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছেন। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল এবং খরচের ক্ষমতা তাকে অথরাইজ করা হয়নি। যেসব কাজের ভেরিয়েশন হয়েছে, তা ‘ওয়ার্ক ডান’ হিসেবে আরডিপিপিতে অনুমোদন করা হয়েছে। একই ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়ে উল্লেখ করা আছে।

তিনি বলেন, ভেরিয়েশন কনসালটেন্টের সুপারিশের ভিত্তিতে সবকিছু অনুমোদন দেয়া হয়। এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এখনও ভেরিয়েশন যথাযথভাবে অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের শুরুতেই অনিয়ম : প্রায় ২৪শ’ কোটি টাকার সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের (প্রথম ফেজ) কার্যাদেশও একটি প্রভাবশালী গ্রুপকে পাইয়ে দেয়ার নেপথ্যে সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। জানা গেছে, প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা বেশি দামে কাজটি ওই চক্রকে পাইয়ে দেয়ার পেছনে তার ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে কাজটি যাতে বিলম্বিত হয়, সেজন্য প্রকল্প সংক্রান্ত নানা স্পর্শকাতর তথ্য দিয়েও তিনি ওই চক্রকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।

ই-জিপি না করে এক বছরে সরকারের ৩০ কোটি টাকা গচ্চা : সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ- তিনি একটি বড় কাজকে ই-জিপি না করে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে এলটিএম পদ্ধতিতে তার পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে সম্পন্ন করে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে সব ধরনের দরপত্র ই-জিপি না করায় ৩০ কোটি টাকা সরকারের গচ্চা গেছে। একইভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও প্রায় কোটি টাকা গচ্চা গেছে সরকারের।

জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৩৭টি কাজ ই-জিপির মাধ্যমে না করিয়ে এলটিএম পদ্ধতিতে করানো হয়েছে। শতকরা হারে এটি প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ। জানা গেছে, এজন্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীই মূলত দায়ী।