একাত্তর হোক আমাদের সব যুদ্ধের প্রেরণা

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তর

এবারের স্বাধীনতা দিবসটি আমরা উদ্যাপন করতে যাচ্ছি এক অনিশ্চিত, ভীতিকর পরিবেশে। পুরো বিশ্বকে বিপন্ন, বিপর্যস্ত এবং বিচ্ছিন্ন করা করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, কয়েকজন মারা গেছেন; কিন্তু আগাম সংকেত দিয়ে আসা এই দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতির অভাব ছিল, সুসমন্বিত একটি জাতীয় উদ্যোগের অনুপস্থিতি ছিল এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের একটা গা-ছাড়া ভাব ছিল।

এসব অভাব কিছুটা হলেও এখন পূরণ হয়েছে; কিন্তু হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এখনও পৌঁছেনি। ডাক্তাররা নিরাপত্তার অভাববোধ করছেন। এদিকে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে।

সবচেয়ে বিপদে আছে নিম্নআয়ের, খেটে খাওয়া এবং প্রান্তিক মানুষজন। বিপর্যয়টি যদি শিগগির সামাল দেয়া না যায়, তাহলে দেশের এক বিশালসংখ্যক মানুষ আবার দারিদ্র্য-অপুষ্টি-অসুস্থতার চক্রে ঢুকে যাবে। হারানো চাকরি ও জীবিকা যদি দ্রুত এসব মানুষ ফিরে না পায়, তা হবে এক অনাকাক্সিক্ষত সামাজিক এবং জাতীয় দুর্যোগ।

করোনা-মহামারী নির্মূল শুধু সরকার করতে পারবে না, সমাজ ও ব্যক্তিকে এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে, যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমরা দেখছি, সমাজ পর্যায়ে মহামারী পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে উদাসীনতা এবং অজ্ঞতা রয়েছে, যেমন রয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে।

মহামারী-আক্রান্ত নানা দেশ থেকে প্রবাসীরা এসে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন। বাড়িতে থাকার আবেদনে কান দিচ্ছেন না। সমাজ তাদেরকে বিয়েতে নিমন্ত্রণ দিচ্ছে, বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের কেনাকাটা নির্বিঘ্ন করে দিচ্ছেন। এদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা (এদের সংখ্যাই ব্যবসায়ীদের মধ্যে এত বেশি কেন, এ প্রশ্ন মনে জাগে) সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে টাকার পাহাড় বানাচ্ছেন।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই বাংলাদেশকে দেখব- এমনটি আমরা ভাবতে পারিনি। তবে কিছু যে বিপরীত চিত্র নেই, তা তো নয়- গরিব মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করছেন, বিপন্নদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এমন ছবিও তো আমরা দেখি, এমন খবরও শুনি। তাহলে এই ছবিটাই কেন নিয়ম হবে না; কেন অসাধুতা, অজ্ঞতা এসব নগণ্য ব্যতিক্রম হবে না?

স্বাধীনতা দিবসের সকালে আমরা যদি একটু দম নেই, একাত্তরকে, একাত্তরের যুদ্ধ, শহীদদের আত্মত্যাগ, গ্রামের মানুষের মহানুভবতা, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়গুলো স্মরণ করি, একাত্তর থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি তা নিয়ে ভাবি, তাহলে গর্বের ছবিগুলো আমরা প্রতিদিনের ফ্রেমে স্থাপন করতে পারব। মহামারীটা সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পারব।

আগামী কয়েক মাস আমাদের জন্য এক বড় পরীক্ষার। আমরা যদি একাত্তরের শহীদ ও যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণায় দেশটাকে মাথায় রাখি, তাহলে আমাদের করণীয় কাজগুলো করব, আমার কারণে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না, একে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াব। এটিও একটি যুদ্ধ বটে এবং এ যুদ্ধে সামনে থেকে লড়ছেন ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ সব জরুরি সেবাদানকারীরা। আমরা যদি এদের সহায়তা করি, তাহলে যুদ্ধটা জেতা যাবে। একাত্তরে মানুষ খাদ্য মজুদ করেনি, নিত্যপণ্য কিনে ঘরভর্তি করেনি। একাত্তরে ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম বাড়াননি। যদি এই বিষয়গুলো ব্যক্তি, সমাজ, ব্যবসায়ী সবাই মিলে পরিহার করা হয়, কৃত্রিম কোনো সংকট সৃষ্টি হবে না।

একাত্তরে আমাদের শত্রু ছিল দৃশ্যমান। এখন অদৃশ্য। তবে করোনাভাইরাস একমাত্র শত্রু নয়- শত্রু আমাদের অজ্ঞতা আর কুসংস্কার, স্বার্থপরতা, দুর্নীতিপরায়ণতা এবং ভয়ংকর সব প্রবৃত্তি। যুদ্ধটা এসবের বিরুদ্ধে চালাতে হবে।

সরকারের দায়িত্বটা অনেক বড়। একাত্তরে ছোট ছোট গেরিলাবাহিনী পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাস্ত করেছে, কারণ তারা ছক কেটে, পরিকল্পনা করে অগ্রসর হয়েছে। সরকারকেও এখন ছক কেটে কেটে এগোতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি জাতীয় কমিটি করলে কেমন হয়, চিকিৎকের ৫০০ সদস্যের বিশাল কমিটি না করে?

৫০০ মানুষ সভা করবে কোথায়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে? এই ৫০০ জন নানা উপকমিটিতে যাবেন। প্রশাসন থেকে, পেশাজীবী নানা সংগঠন থেকে বেছে বেছে দক্ষ এবং পরীক্ষিত মানুষজনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জায়গায় বসাতে হবে।

সরকারের মন্ত্রীদের সবাইকে কথা বলার এখন প্রয়োজন নেই- দশ সদস্যের কমিটির যিনি মুখপাত্র হবেন, তিনিই কথা বলবেন। বাকিদের এখন আস্তিন গুটিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে। এখন কথা যত কম হবে, কাজ যত বেশি হবে, ততই মহামারীর বিপদ আমরা দূরে সরাতে পারব।

আমাদের কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ প্রয়োজনে স্থগিত রেখে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। টেস্টিং কিট, ভেন্টিলেটর, হাসপাতালের বেডসহ সব সাজসরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র এবং আনুষঙ্গিক যত সহায়ক উপকরণ- সব হাসপাতালে পৌঁছে দিতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা নিচ্ছে। আমরা যদি একাত্তরকে স্মরণে রেখে কাজে নামি, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন- একাত্তরের সেইসব প্রাতঃস্মরণীয় শহীদ, যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, যারা মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন এবং নাম না-জানা যোদ্ধা, যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন- সবার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমরা এই দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতাসহ যারাই এই সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন তাদের।

আজ হোক আমাদের একাত্তরের চেতনায় একাতাবদ্ধ হওয়ার দিন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১২৩ ৩৩ ১২
বিশ্ব ১৩,১০,১০২২,৭৫,০৪০৭২,৫৫৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×