ভয়াবহ কনটেইনার জটের মুখে চট্টগ্রাম বন্দর: ডেমারেজ কে দেবে প্রশ্ন ব্যবসায়ীদের

বন্দর ও শিপিং লাইনের ডেমারেজ মওকুফ চান ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা * আজ সংশোধিত আদেশ জারি করবে এনবিআর

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি

করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে পোর্ট ডেমারেজ (বন্দর ও শিপিং লাইনের ক্ষতিপূরণ)। আপৎকালীন সময়ে সরকার ঘোষিত ১০ দিনের ছুটির মধ্যে খাদ্যপণ্য ও ওষুধসামগ্রী ছাড়া বর্তমানে আর কোনো কিছু খালাস করছে না কাস্টমস।

ফলে এর বাইরে থাকা শিল্পের কাঁচামালের বিপুলসংখ্যক কনটেইনার খালাস আটকে গেছে। কিন্তু এতে করে শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হবে না, উল্টো মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ গুনতে হবে আমদানিকারকদের।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এমনিতে করোনার প্রভাবে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সেজন্য তাদের সাফ কথা, কোনো ক্ষতিপূরণ তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হবে না।

সরকার নিশ্চয় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সময়ে বন্দর-প্রাইভেট আইসিডির সব ধরনের ডেমারেজ মওকুফ করার বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে সার্কুলার জারি করবে। এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‘চলমান ছুটিতে সরকার বন্দর, কাস্টমসসহ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত আকারে খোলা রাখার কথা বলেছে। কিন্তু লোকবল স্বল্পতার কারণে বন্দর থেকে মালামাল খালাসে বিলম্ব হচ্ছে।

একদিকে এক্সপোর্ট বন্ধ, অন্যদিকে বন্দরে মালামাল পড়ে থাকায় পোর্ট ডেমারেজ দিতে হবে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা ক’দিক সামাল দেবেন। তাই সরকারকে এসব বিষয় বিবেচনায় এনে শিল্পের স্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে হবে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি কনটেইনার জাহাজ থেকে নামার পর ৪ দিন ফ্রি টাইম থাকে। এরপর বিভিন্ন স্ল্যাবে (স্তর) ডেমারেজ গুনতে হয় আমদানিকারককে।

২০ ফিট কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহের জন্য ৬ ডলার, দ্বিতীয় সপ্তাহের জন্য ১২ ডলার এবং তৃতীয় সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন ২৪ ডলার করে ডেমারেজ গুনতে হয়। ৪০ ফিট কনটেইনারের ক্ষেত্রে এ জরিমানা দ্বিগুণ হারে গুনতে হয়।

একইভাবে আমদানিকারককে শিপিং লাইনের ডেমারেজও গুনতে হয়। শিপিং লাইনগুলোর জরিমানার হার একেক শিপিং লাইন একেকভাবে নির্ধারণ করে থাকে। তারা ৭ দিন থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত ফ্রি টাইম দিয়ে থাকে।

এরপর বিভিন্ন স্ল্যাবে ৬ ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪৮ ডলার পর্যন্ত দৈনিক কনটেইনার প্রতি জরিমানা গুনতে হয়। অর্থাৎ আমদানি পণ্য গ্রহণ করে খালি কনটেইনার তাদের (শিপিং লাইনকে) বুঝিয়ে না দেয়া পর্যন্ত আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকা এভাবে জরিমানা গুনতে হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার ফখরুল আলম বলেন, ‘এনবিআর থেকে এই আপৎকালীন সময়ে খাদ্যপণ্য ও ওষুধসামগ্রী জরুরিভিত্তিতে খালাসের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ কারণে শিল্পের কাঁচামাল শুল্কায়ন আপাতত বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি এনবিআরকে জানানো হয়েছে।

আগামীকাল (সোমবার) এ ব্যাপারে নির্দেশনা আসবে বলে আশা করছি। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সবাইকে স্টেশনে থাকতে বলা হয়েছে। এনবিআরের নির্দেশনা পেলেই শিল্পের কাঁচামাল, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার পণ্য শুল্কায়ন শুরু হবে।’

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রভাবে এমনিতেই আমদানিকারক ও শিল্পকারখানার মালিকরা শিল্পের কাঁচামাল না পেয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কারণে তারা শত শত কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়বেন।

তার ওপর আমদানি পণ্য বন্দরে বা ডিপোতে পড়ে থাকার কারণে তাদের গলায় বসবে ডেমারেজ চার্জের খক্ষ। এমনিতে বন্দর-কাস্টমসের প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে সময়মতো কনটেইনার হাতে না পেয়ে কোটি কোটি টাকার ডেমারেজ গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।

এখন আবার করোনার কারণে স্থবির হয়ে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও ব্যবসায়ীদের এমন মাশুল দিতে হলে তারা যাবেন কোথায়।

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেহেতু আমদানি-রফতানি বাণিজ্য স্থবির হয়ে গেছে, ব্যবসায়ীরাও আর লোকসান গুনতে পারছেন না- এ অবস্থায় বন্দর তথা শিপিং লাইনের ডেমারেজসহ যত ধরনের সারচার্জ আছে তা মওকুফ করার বিষয়ে সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জারি করতে হবে সার্কুলার। নয়তো ব্যবসায়ীরা যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন তাতে তাদের আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি এএম চৌধুরী সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি কমে গেছে। শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন অনেকটাই কমে এসেছে। এতে করে বন্দরে ভয়াবহ কনটেইনার জট দেখা দিতে পারে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা পণ্য এনে বিপাকে পড়েছেন। তারা কল-কারখানায় উৎপাদন যেমন করতে পারছেন না কাঁচামালের অভাবে তেমনি পণ্যও ছাড়িয়ে নিতে পারছেন না।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের দু’দিকেই ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তারা লোকসান গুনছেন। অন্যদিকে বন্দর-শিপিং লাইনকে কনটেইনারের বিপরীতে ডেমারেজ গুনতে হবে।

আমি আশা করব, সরকার ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের এ ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করবে এবং যত দ্রুত সম্ভব ডেমারেজ মওকুফের বিষয়ে সার্কুলার বা পরিপত্র জারি করে তাদের (ব্যবসায়ীদের) উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটাবে।’

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দর-কাস্টম ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার কথা বলা হলেও এটা কাগজে-কলমে।

দেখা গেছে, বন্দর ও কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট শাখায় লোকজন না থাকায় যথা সময়ে তারা জাহাজের পিসি (পোর্ট ক্লিয়ারেন্স) নিতে পারছেন না। এ কারণে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ পুনরায় ফিরে যেতে বিলম্ব হচ্ছে।

তাই তাদেরও ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। শুধু কনটেইনার জট নয়, এ অবস্থা চলতে থাকলে জাহাজ জটও দেখা দেবে। তবে আশা করব, সরকার বিশেষ এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সারচার্জ মওকুফসহ ব্যবসা বান্ধব সিদ্ধান্ত নেবে।’

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য ডেলভারি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এ কারণে এরই মধ্যে বন্দরে ৪০ হাজার কনটেইনারের স্তূপ জমেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে তা ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে।

৪ হাজার ২০০ টিইইউএস ধারণ ক্ষমতার এ আইসিডিতে রোববার পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০০ টিইইউস কনটেইনার জমা হয়েছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং মানুষকে ঘর থেকে বের না হতে নির্দেশনা প্রদানের পর থকেই মূলত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কনটেইনার জট সৃষ্টি হলে আমদানিকারকদের ওপর যে ডেমারেজ ও সারচার্জের খক্ষ বসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে এখনও জট সৃষ্টি হয়নি। ধারণ ক্ষমতার নিচে আছে কনটেইনার। যে জনবল আছে তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা বন্দরের বহির্নোঙর ও বিভিন্ন ইয়ার্ডে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।

কনটেইনার ডেলিভারি কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি যুগান্তরকে বলেন, পরে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ আইসিডিতে কনটেইনার ধারণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআর থেকে ইস্যু করা একটি চিঠিতে চলমান সাধারণ ছুটির সময় জরুরি খাদ্যপণ্য ও ওষুধ পরিবহনের কথা বলা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনসহ অন্য বিষয়গুলো স্পষ্ট না থাকায় অনেক আমদানিকারক এসব পণ্য নিচ্ছেন না।

এ কারণে আমরা এনবিআরকে অবগত করেছি যে, তারা যেন এ চিঠিটি সংশোধন করে। এতে করে শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্যও ডেলিভারি নিতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা।’

চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৯টি বেসরকারি ডিপো বা আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) রয়েছে।

এসব ডিপোতে জনবল এবং পণ্য পরিবহন সংকটে কনটেইনার ডেলিভারি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোট অ্যাসোসিয়েশনের সচিব রুহল আমিন সিকদার বিপ্লব। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত