ফেরি ও ট্রাকে ভিড়

গাদাগাদি করে ফিরছেন শ্রমিকরা বিপর্যয়ের শঙ্কা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গার্মেন্ট শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব না মেনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শনিবার ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ফিরেছেন। করোনায় আক্রান্তের ভয়ও তাদের ঠেকাতে পারেনি। কারণ মালিকরা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র নির্দেশনা মোতাবেক শনিবার পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রেখেছিল।

পূর্বঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী রোববার থেকে কারখানা চালু হওয়ার কথা। তাই গার্মেন্টকর্মীসহ অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত মানুষজন ঢাকায় ফিরেছেন চাকরি হারানোর ভয়ে। মূলত কারখানা খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়ে সরকার বা মালিক পক্ষের তরফ থেকে নতুন নির্দেশনা না পাওয়ায় কেউ হেঁটে, ট্রাকে আবার কেউ লঞ্চে-ফেরিতে গাদাগাদি করে ঢাকা ফিরেছেন।

যারা যানবাহন পেয়েছেন তাদের কয়েকগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে। আর যারা পাননি তাদের অনেকে মহাসড়কে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান। ফেরিতে ও ট্রাকে ছিল উপচেপড়া ভিড়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেককে ট্রাক থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। জরিমানাও করা হয়। এসব শ্রমিক আসায় নগরবাসীর মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের নির্দেশনায় বলা আছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে অর্ডার আছে এবং যারা পিপিই বানাচ্ছে সেসব কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কারখানা চালু রাখতে পারবে।

এখন সবচেয়ে বড় ও প্রথম দায়িত্ব হল কিভাবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা দেব। দ্বিতীয়ত, মার্চ মাসের বেতন নিয়ে কোনো অনীহা, অনাগ্রহের অবকাশ নেই। যত কষ্ট হোক শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন দেয়া হবেই।

মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শ্রমিক যদি সঙ্গত কারণে কারখানায় উপস্থিত না থাকেন তাহলে মানবিক বিবেচনায় তার চাকরি হারাবেন না, এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রত্যেক সদস্যের (কারখানা মালিক) কাছে অনুরোধ করছি।

আমি বিশ্বাস করি, অর্থনীতিতে অবদান রাখা এ খাতের মালিকরা অন্ততপক্ষে শ্রমিকের অনুপস্থিতির কারণে কিছুতেই চাকরিচ্যুত করবেন না। জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের মহাপরিচালক শিবনাথ রায় যুগান্তরকে বলেন, মালিকরা নিজেদের সিদ্ধান্তেই সরকারি ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রেখেছেন।

অধিদফতর থেকে এ বিষয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ১ এপ্রিলের নির্দেশনা সঠিকভাবে কারখানাগুলো পালন করছে কিনা তা সরেজমিন যাচাই করা হবে। এদিকে ২ মার্চ নিট খাতের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সমিতির সদস্যদের উদ্দেশে খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা জারি করে।

এতে বলা হয়েছে, ৪ এপ্রিলের পর কারখানা পরিচালনা করবেন কিনা তা একান্তই মালিকদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। যদি কারখানা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে অবশ্যই করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে শ্রমিক-কর্মকর্তাদের রক্ষার স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে কারখানা পরিচালনা করতে হবে।

এক্ষেত্রে শ্রমিকের সব দায়-দায়িত্ব মালিকের নিতে হবে। মালিকদের উদ্দেশে নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কারখানা খোলা বা বন্ধ- যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুন না কেন, সব শ্রমিকের মার্চের বেতন অবশ্যই সময়মতো দিতে হবে।

কোনো অবস্থাতেই মার্চ মাসের বেতন দেয়ার বিষয়ে কোনো রূপ ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। কোনো অবস্থাতেই শ্রমিক অসন্তোষ যাতে সৃষ্টি না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

শ্রমিকরা ফেরায় নগরবাসী আতঙ্কিত : এদিকে শনিবার রাজধানীর নগর ভবনে নিুমধ্যবিত্তদের জন্য খাবার পৌঁছে দেয়ার একটি কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে লাখ লাখ গার্মেন্টকর্মী শহরে প্রবেশ করছে। এর ফলে করোনা পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে বহু নাগরিক ফোন করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি পুনঃবিবেচনার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানান তিনি।

সারা দেশের চিত্র জানিয়েছেন যুগান্তর ব্যুরো, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিরা-

ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) : হাজারও গার্মেন্টকর্মী শনিবার ভৈরব বাসস্ট্যান্ডে ভিড় জমায়। তারা হাওর এলাকাসহ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সকালে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করেন। দুপুর পর্যন্ত অনেকেই কোনো যানবাহন পাননি।

বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অসংখ্য লোকজন জমায়েত দেখে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাদের সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের তাড়া খেয়েও তারা আশপাশের গোপন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক নারীকে ছোট ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

হাওরের মিঠামইন উপজেলার গার্মেন্টকর্মী শায়লা বেগম জানান, লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও ট্রলার ও সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে গাজীপুর যেতে অনেক কষ্ট করে ভৈরবে এসেছি। সুপারভাইজার মোবাইলে মেসেজ দিয়েছে রোববার কাজে যোগ না দিলে চাকরি যাবে।

এখন ভৈরবে এসেও কোনো যানবাহন পাচ্ছি না। তিনটি ছোট ছোট সন্তান নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়ীয়ার রতনপুর থেকে নারীকর্মী জোহরা খাতুন ভৈরব বাসস্ট্যান্ডে এসে বিপদে পড়েছেন।

শ্রীপুর (গাজীপুর) : গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার বাসস্ট্যান্ডে জটলা পাকিয়ে গাজীপুর মহানগর ও ঢাকা অভিমুখে ছুটছে গার্মেন্ট শ্রমিকরা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের চেয়ে চাকরি রক্ষা করাটা বেশি প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তারা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে ঢাকামুখী যাত্রীরা কেউ হেঁটে যাচ্ছেন।

আবার যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা ভালো তারা ভ্যান বা পিকআপে করে ছুটে চলছেন। ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরের ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা আর সেখানে এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজে যাওয়ার জন্য ভাড়া গুনতে হচ্ছে দেড়শ’ থেকে দু’শ টাকা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা উড়ালসেতুর নিচে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন শ্রমিক বলেন, আজ রোববার গার্মেন্ট খোলা। কারখানা থেকে আমাদের ফোন দেয়া হয়েছে ৫ এপ্রিল কাজে যোগ দিতে হবে।

মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ট্রাক-পিকাপচালকদের বাধা দেয়া হচ্ছে। যাত্রীদেরও ওইসব পরিবহন থেকে নেমে যেতে বলা হচ্ছে। অনেকে দলবেঁধে হেঁটে গাজীপুর মহানগর ও ঢাকা অভিমুখে চলছেন।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে শনিবার দুপুরের পর কর্মমুখী মানুষের ঢল নামে। গোয়ালন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা ফরিদ হোসেন বলেন, তিনি ঢাকায় একটি ছোট কারখানায় কাজ করেন। কারখানার মালিক ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন, ৫ তারিখ কাজে যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না।

তাই বাধ্য হয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছি। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক আবু আবদুল্লাহ রনি বলেন, নৌপথে শুধু পণ্যদ্রব্য পারাপারের জন্য সীমিত আকারে ফেরি চালু রাখা হয়েছে। যানবাহন কমে যাওয়ায় এ নৌরুটের ১৬টি ফেরির মধ্যে ১১টি বসিয়ে রেখে আমরা মাত্র ৫টি ফেরি চালু রেখেছি। কিন্তু শনিবার দুপুর থেকে মানুষের চাপে আমরা ঠিকমতো পণ্যবাহী যানবাহন পারাপার করতে পারছি না।

বরিশাল : বরিশাল কেন্দ্রীয় নথুলাবাদ বাসস্ট্যান্ডে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কাজ করা নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই সুজিত কুমার বলেন, তারা চেষ্টা করছেন যাতে মানুষের ভিড় না হয়।

ময়মনসিংহ, ত্রিশাল, ভালুকা ও ফুলপুর : নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ও উপজেলা থেকে আসা গার্মেন্টকর্মীরা ময়মনসিংহ সদরের শম্ভুগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে ঢাকামুখী যানবাহনের আশায় হেঁটেই পাড়ি দেন। একদিকে দু’শ টাকার ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৮ থেকে ৯শ’ টাকা।

মানিকগঞ্জ : ফেরিযোগে আবার কেউ নৌকাযোগে পদ্মা নদী পার হয়ে পাটুরিয়া ঘাটে এসে শনিবার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে হাজারও মানুষ। মানিকগঞ্জ পুলিশ-প্রশাসন কঠোরভাবে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব রোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশে গণপরিবহন বন্ধ রেখেছে। এ কারণে পণ্যবাহী ট্রাক, রিকশা, ভ্যানে করে ভেঙে ভেঙে কিছুর দূর গিয়ে থামছে আবার যাচ্ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. জিল্লুর রহমান বলেন, গণপরিবহন চলাচল নিষেজ্ঞা থাকার কারণে এ নৌরুট দিয়ে শুধু জরুরি কাঁচামালবাহী ট্রাক ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপার করা হচ্ছে। ঘাট দিয়ে যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে জোর করে ফেরিতে উঠছে। হাজারও যাত্রীকে আটকানো সম্ভব হচ্ছে না।

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) : লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকামুখী মানুষের ঢল নামে। যাত্রীরা করোনাভাইরাস সচেতনতা শুনছেন না। শনিবার বিকালে শিমুলিয়া ঘাটে দেখা যায়, ফেরিতে করে হাজার লোক পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে। তবে দক্ষিণবঙ্গের চেয়ে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপই ছিল বেশি।

এসব যাত্রী একে অপরের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে ফেরি পার হয়ে শিমুলিয়া ঘাটে আসছে। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন বলেন, সকাল থেকেই মাওয়া ঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীদের ভিড় ছিল। ফেরিতে কোনো যানবাহন না থাকলেও যাত্রীদের ভিড় ছিল অনেক বেশি।

ঝালকাঠি : ঝালকাঠির বাসস্ট্যান্ডগুলোতে লোকসমাগম ও ভিড়ে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গার্মেন্ট শ্রমিক বলেন, আমাদের ছুটি শেষ হয়েছে এখন যে কোনো উপায়ে ঢাকা যেতে হবে। পেটে খাবারের ব্যবস্থা রক্ষা করতে হলে জীবনের ঝুঁকি তো নিতেই হবে। আমাদের জীবনের কোনো দাম নেই।

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) : শ্রমিকরা উত্তরবঙ্গ থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড়ে নামছে। যানবাহনগুলো চন্দার প্রায় এক মাইল দূরে খাড়াজোড়া ও ফায়ার সার্ভিসের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে। পরে তারা হেঁটে চন্দা স্ট্যান্ডে এসে যে যার গন্তব্যে যাচ্ছে। ফলে যেখানে বলা হচ্ছে দূরত্ব বজায় রাখতে তা কোনোভাবেই পালন হচ্ছে না।

হিমশিম খাচ্ছে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে চন্দা ত্রিমোড় এলাকায় কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশকে দেখা গেলেও তারা কোনো যাত্রী বা শ্রমিকের গতিরোধ করছে না। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কাউকে একসঙ্গে জড়ো হতে দেয়া হচ্ছে না। যে যেমন পাড়ছে তেমনি দ্রুত চলে যাচ্ছে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত