মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

আক্রান্ত হলেই লকডাউন

মাস্ক ও পিপিই তৈরির কারখানা ছাড়া বাকিগুলো বন্ধের নির্দেশ * মুক্তি পাচ্ছে লঘু দণ্ডপ্রাপ্ত ৫০০০ আসামি * রমজানে সরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকা লকডাউন করার জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দিলেই হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে বলা হয় । এছাড়া কারাগারে বন্দিদের ঝুঁকিমুক্ত করতে অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো অপরাধে দীর্ঘদিন আটক তাদের মুক্তির নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সোমবার গণভবনে মন্ত্রিসভার এ বৈঠক হয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বৈঠকে ‘হিজরি ১৪৪১ (২০১৯ খ্রিস্টাব্দ) সালের পবিত্র রমজান মাসে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য অফিস সময়সূচি নির্ধারণ’ করা হয়। সে অনুযায়ী রমজান মাসে সরকারি দফতরগুলোয় সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস চলবে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ রেফারেন্স ইন্সটিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস আইন’ এবং ‘মৎস্য ও মৎস্যপণ্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মন্ত্রী যুগান্তরকে জানান, মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের পর মৃত্যু হলে শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকা লকডাউন করা হতো। এখন মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আক্রান্ত হলেই ওই এলাকা লকডাউন করা হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখতে পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার আলোকেই সন্ধ্যা ৬টার পর সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া ছোটখাটো অপরাধের মধ্যে ছিঁচকে চুরি, টাকা আত্মসাৎ, প্রতারণার মতো অপরাধে যারা অনেক দিন ধরে কারাগারে আটক রয়েছে তাদের মুক্তি দেয়ার জন্য নীতিমালা করতে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে হত্যা, ধর্ষণ ও অ্যাসিড মামলার আসামিদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
মন্ত্রিসভা বৈঠকের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) যেসব কারখানা মাস্ক ও পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) তৈরি করে এগুলো খোলা রেখে বাকি সব বন্ধ রাখারও নির্দেশনা এসেছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন জেলখাটা আসামিদের মুক্তির নীতিমালা তৈরি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার চিন্তিত। কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিষয়েও সরকারকে চিন্তা করতে হচ্ছে। ছোটখাটো অপরাধে যারা দীর্ঘদিন জেলে আছে এবং হত্যা, ধর্ষণ ও অ্যাসিড মামলার আসামি নয় কিন্তু ইতোমধ্যে বহুদিন সাজা খেটেছে এমন কয়েদিদের কীভাবে মুক্তি দেয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা পর্যালোচনা করেছি। বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। উনি শুনে বলেছেন, তাদের কীভাবে মুক্তি দেয়া যায়, কোন প্রক্রিয়ায় সেটাও আপনাদের খুঁজে বের করতে হবে। সে বিষয়ে একটি নীতিমালা করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই আলোচনার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি। এ ধরনের আসামির সংখ্যা কতজন হতে পারে- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৪-৫ হাজারের মতো হবে। যারা ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন সাজাও খেটেছে। নীতিমালা প্রণয়ন হলে তার আলোকে এ ধরনের আসামিদের মুক্তি দেয়া হবে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেখানে আক্রান্ত বেশি, সেখানে লকডাউন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আগেই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন এবং একাধিক নির্দেশনাও দিয়েছেন।
মানুষ ঘরে না থাকলে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় : করোনা প্রসঙ্গে পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বা কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। নইলে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা জনগণের প্রতি বারবার অনুরোধ জানিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে আগের থেকে বেড়েছে। সে জন্য সামাজিক দূরত্ব বা কোয়ারেন্টিন বজায় রাখতে মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অন্যথায় কোনোভাবেই এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা দেখছি আজ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও একটু সতর্ক এবং স্ট্রিক্ট ভিউতে সবকিছু দেখছে। প্রশাসনকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে আরেকটু স্ট্রিক্ট ভিউতে সোশ্যাল আইসোলেশন বাস্তবায়ন করার জন্য। সেই সঙ্গে ব্যাপক প্রচারণাও চালাবে গ্রাম এলাকায়, যাতে মানুষ আরও বেশি সতর্ক হতে পারে। আমরা নিজেরা যদি নিজেদের রক্ষা না করি, তাহলে এটা আমাদের পক্ষে দুরূহ হবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। বিশেষ করে আমাদের চিকিৎসকরা বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন- আমরা চিকিৎসা কার্যক্রম দেয়ার জন্য বাইরে আছি। আপনারা অনুগ্রহ করে ঘরে থাকবেন।’ পহেলা বৈশাখ বাইরের সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যা করবেন ডিজিটালি।
নামাজের বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মুসল্লিদের বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে মসজিদের আঙ্গিনার বাইরে থেকে কেউ এসে নামাজ পড়বেন না। মক্কা-মদিনায়ও দেখবেন যারা মসজিদের ভেতরের কর্মী তাদের নিয়ে তারা জামাত করছেন। মসজিদের আঙিনায় ইমাম আছেন, মুয়াজ্জিন আছেন আশপাশের দু-একজন আছেন তারা হয়তো আসতে পারেন। যদি আমরা গুরুত্ব না দিই তবে কিন্তু এটা কন্ট্রোল করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে লাইলাতুল বরাতের বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনও বলে দিয়েছে। মন্ত্রিসভায়ও এটা আলোচনা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণরূপে নফল ও একাকী করার ইবাদত। এটা কোনো জামাত বা দলবদ্ধ ইবাদত নয়। এটা আমাদের সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে আমরা সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব, যাতে এ করোনা থেকে মুক্ত থাকতে পারি।
রমজানে অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা : রমজান মাসের অফিস সময়সূচি উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, রোজার সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস সময় নির্ধারণ করেছে সরকার। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৫ বা ২৬ এপ্রিল থেকে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সিয়াম সাধনার মাস রমজান শুরু হবে। রমজানে দুপুর সোয়া ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জোহরের নামাজের বিরতি থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটি থাকবে যথারীতি শুক্র ও শনিবার। এছাড়া সুপ্রিমকোর্ট ও এর আওতাধীন সব কোর্টের সময়সূচি, ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডাক, রেলওয়ে, হাসপাতাল ও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা এবং অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এ সময়সূচির আওতার বাইরে থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে রমজান মাসের অফিস সময় নির্ধারণ করবে।
মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশালে ৭ বছরের জেল : এ প্রসঙ্গে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অনুমোদিত আইনের খসড়া অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি রফতানি বা অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে মৎস্য বা মৎস্যপণ্য বাজারজাত করলে শাস্তি অনধিক ৭ বছর, কিন্তু ৫ বছরের নিচে নয়, কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এর আগে এ ক্ষেত্রে শাস্তি ছিল ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। করোনা পরিস্থিতির কারণে মন্ত্রিসভার বৈঠকটি গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাতজন মন্ত্রী ও আট-নয়জন সচিব উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত