১৫ জেলায় ১২৩ শনাক্ত, মৃত ১২: দেশে শতক ছাড়িয়ে ছুটছে করোনা

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৩৫, মৃত্যু ৩ * আগামী ১৫ দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সবাই সাবধান : স্বাস্থ্যমন্ত্রী * করোনাভাইরাস বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে -মহাপরিচালক

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষার আওতা বাড়ার পর থেকে দেশে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করেছে। গত এক মাসে আক্রান্তের সংখ্যা একশ’ ছাড়িয়েছে। ১৫ জেলায় ৪টি ক্লাস্টারে কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া গেছে। সোমবার একদিনে নতুন ৩৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৩ ।

এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৩ জনের। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা এখন ১২। নতুন রোগীর এ সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। করোনাভাইরাসটি দেশে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

তবে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে কেউ বাড়ি ফেরেননি। ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তদের মধ্যে ১২ জন নারায়ণগঞ্জের। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য দেন। এক অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে করোনা রোগের বিস্তার বাড়ছে।

আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন আমাদের সবার জন্যই অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবেই আগামী ১৫ দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যাবেন না। সবাইকে সাবধানে থাকার আহ্বান জানান তিনি। এ অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা পুরো দেশ লকডাউনের পরামর্শ দেন। তারা বলেন, এখনই পুরো দেশ লকডাউন করা না হলে এ ভাইরাস আগামী ১০ দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, করোনাভাইরাস এখন আর দেশের একস্থানে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশ থেকে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৪৬৮টি। আর এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনাক্ত হয়েছেন ১২৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে কারও বাড়ি ফেরার খবর নেই।

আক্রান্তদের ৬৪ জন ঢাকার, ২৩ জন নারায়ণগঞ্জের । তিন মৃতের একজন এক সপ্তাহ আগে শনাক্ত হন। তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। বাকি দু’জন হাসপাতালে আসার পরপরই মারা গেছেন। তারা দু’জন নারায়ণগঞ্জের। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আক্রান্তদের ৩৫ জনের বয়স ছিল ৪১ থেকে ৫০ বছর, তাদের মধ্যে ৩০ জনই পুরুষ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৩৯ জনকে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭০৯ জন হোম কোয়ারেন্টিনে এবং ৩০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন। এর বাইরে ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেয়া হয়েছে ২৩ জনকে।

দুদকের যে পরিচালক করোনায় মারা গেছেন, তার বয়স ছিল ৪৮ বছর। তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। শনাক্ত ১২৩ জনের কোন জেলায় কত জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, এ মুহূর্তে আইইডিসিআরের কাছে তথ্য আছে ১২১ জনের। এর মধ্যে ঢাকায় ৬৪, নারায়ণগঞ্জে ২৩, মাদারীপুরে ১১, চট্টগ্রামে ২, কুমিল্লায় ১, গাইবান্ধায় ৫, চুয়াডাঙ্গায় ১, গাজীপুরে ১, জামালপুর ৩, শরীয়তপুরে ১, কক্সবাজারে ১, নরসিংদীতে ১, মৌলভীবাজারে ১, সিলেটে ১, রংপুরে ১ এবং ঢাকার মহানগরীর বাইরে চার উপজেলায় ৪ জন করোনায় আক্রান্ত।

সবমিলিয়ে এখন বাংলাদেশে ১৫টি জেলায় করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। তবে যে জায়গায় একাধিক রোগী আছেন সেটাকে ক্লাস্টার বলা হয়। ঢাকা মহানগীর, গাইবান্ধা, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুর এ চারটি এলাকাকে ক্লাস্টার বলা হচ্ছে।

এর আগে আজ সকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে দুই ধরনের তথ্য প্রকাশ প্রসঙ্গে মহাপরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোমবার সকালে একটি বৈঠক চলার সময় তিনি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) ফোন করেছিলেন। আইইডিসিআর তাকে তথ্য দিয়েছিল।

সেটা সেই সময়ের জন্য ঠিক ছিল। পরে অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে শেষ আপডেট তথ্য জানানো হয়েছে। মৃতের সংখ্যা কেন কমে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে একই নাম দু’বার লেখা হয়েছিল, আলাদা নামে। সে কারণেই আগে মৃত্যু বেশি দেখা গেছে। পরে যেটা দেয়া হয়েছে সেটাই সঠিক।

অধিদফতর জানায়, নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৩০ জন, পাঁচজন নারী। মহাপরিচালক জানান, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪ হাজার ১১ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪৬৮টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৩৯ জনকে নতুন করে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে এবং আইসোলেশনে আছেন ১০৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হটলাইনে ফোন কলা এসেছে ৬৭ হাজার ২১০টি।

এর আগে সোমবার সকালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে এক সভা শেষে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক গণমাধ্যকে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে করোনার বিস্তার বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে আরও ২৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪ জন মারা গেছেন।

সুতরাং আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবেই আগামী ১৫ দিন আমরা যেন কেউই অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হই। আর একান্তই যদি জরুরি কাজে বের হতেই হয় তাহলে মুখে মাস্ক ব্যবহার না করে কেউই ঘরের বাইরে বের না হই।

‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এক জরুরি বৈঠকে সভাপতি হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সের (নিন্স) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বর্তমান পরিস্থিতে তার উদ্বেগ প্রকাশ করে এখনি দেশে শক্ত অবস্থান নেয়ার অনুরোধ করেন। বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর জানান, দেশে সামনে কঠিন সময় আসছে।

এখনই পুরো দেশে লকডাউন করা জরুরি। এখনই পুরো দেশ লকডাউন না করা হলে এ ভাইরাস আগামী ১০ দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার অনুরোধ জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবার কথা শোনেন ও দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেন। সভায় চিকিৎসক পরিষদ নেতারা চিকিৎসদের সুবিধাদি বৃদ্ধি করার ব্যাপারেও মন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত