করোনা প্রভাব : ৫ হাজার কোটি টাকার প্রথম প্যাকেজ

নীতিমালায় সংশোধন চান শিল্পোদ্যোক্তারা

প্রধানমন্ত্রীর ৭৩ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজ সর্বত্র প্রশংসিত, সদ্ব্যবহারে প্রয়োজন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ -ব্যবসায়ীদের অভিমত * কল-কারখানার শুধু শ্রমিক-কর্মচারী নয়, সব জনবলের জন্য বেতন দেয়া জরুরি * আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়লে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যাবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ কর্মসূচি নিয়ে সব মহলে এখন ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে। সবাই বলছেন, এটি একটি সময়োপযোগী সাহসী পদক্ষেপ। যথাযথভাবে এর সদ্ব্যবহার করতে পারলে দেশ সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।

তবে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ ব্যবহারে পলিসি বা নীতিমালা প্রণয়নে যেন আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতার দেয়াল তৈরি করা না হয়, সে বিষয়ে দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা বলছেন, জনস্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে তাদের কোনো মনোকষ্ট নেই। কিন্তু ইতোমধ্যে এ প্যাকেজের অর্থ ব্যবহারে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে প্রথম ধাপে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজের নীতিমালা নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা জোর আপত্তি তুলেছেন। এ বিষয়ে সোমবার যুগান্তরকে তারা ক্ষোভ-অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন।

তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বলা হয়েছে- প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের এ বিশেষ ঋণ দিয়ে শুধু কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেয়া হবে। কিন্তু এটি তো একটি অবাস্তব ফর্মুলা। কোনো শিল্পকারখানা কী শুধু শ্রমিক-কর্মচারী দিয়ে চালানো যায়? সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির জনবল থাকে। শিল্প মালিকরা প্রতি মাসে যখন কারখানার বেতন শিট অনুমোদন করেন তখন সবার বেতন হিসাব করেই পুরো বেতন শিটের বিপরীতে চেক ইস্যু করা হয়। শিল্পোদ্যোক্তারা বলেন, সরকার আপৎকালীন সংকট মোকাবেলা করতে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রথম ঘোষিত প্যাকেজ থেকে যা দেবে সেটি তো কোনো অনুদান নয়। ২ শতাংশ সুদে সহজ শর্তের ঋণ। অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে এটিও একটি বড় ধরনের সহায়তা। কিন্তু সেটি দিয়ে যদি শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন জোগান দেয়া হয়, তাহলে অন্যদের বেতন কে দেবে? সংকটকালীন এ মুহূর্তে তাদের বেতনও মালিকরা দিতে পারছেন না। তাই এভাবে যারা খণ্ডিত নীতিমালা করেছেন তারা বিষয়টির বাস্তবতা অনুধাবন করেছেন বলে মনে হয় না।

এদিকে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এর সমাধানও কোনো জটিল বিষয় নয়। সদিচ্ছা থাকলে যে কোনো সময় এতে সংশোধনী আনা সম্ভব। তাদের মতে, জারিকৃত নীতিমালায় অন্তত দুটি সংশোধনী আনা জরুরি। প্রথমত, ‘শ্রমিক কর্মচারী’ শব্দের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বিশেষে সবার বেতন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ একটি ফ্যাক্টরি চালাতে প্রতি মাসে মালিকপক্ষ যে অংকের বেতন শিট এতদিন অনুমোদন করে আসছেন, সেই অংকের অর্থ সরকারের বিশেষ এ ঋণ প্যাকেজ থেকে দ্রুত অনুমোদন দেয়া। এছাড়া অনুমোদন প্রক্রিয়া এমনভাবে হতে হবে, যেন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় এবং এপ্রিলের বেতন সবাই যেন মে মাসের ৫-৭ তারিখের মধ্যে পেয়ে যান। দ্বিতীয়ত, শ্রমিক-কর্মচারীসহ সবার জাতীয় পরিচয়পত্রের শিট জমা দেয়ার বিড়ম্বনা থেকে অব্যাহতি দিয়ে কোম্পানির বেতন শিট জমা নেয়া। যাচাই করার ক্ষেত্রে আগের ২ মাসের বেতন শিটের ফটোকপি নিতে পারে। কিন্তু এর বাইরে প্রত্যেকের ভোটার আইডি কার্ড জমা দেয়ার মতো শর্ত প্রত্যাহার করতে হবে।

উদ্যোক্তারা বলেছেন, করোনার প্রভাব মোকাবেলায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপটি অবশ্যই ইতিবাচক। এ পদক্ষেপে রফতানিমুখী শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তহবিল ব্যবহারের জটিল নীতিমালার কারণে প্রধানমন্ত্রীর ভালো উদ্যোগটির সুফল রফতানিমুখী শিল্পের উদ্যোক্তা ও সব শ্রেণির কর্মীরা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। এমন আশঙ্কা এখন অমূলক নয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আশার কথা হচ্ছে, ‘প্রধানমন্ত্রী যেহেতু মালিক-শ্রমিকদের জুন পর্যন্ত সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অবশ্যই কোনো না কোনোভাবে সব পক্ষকে সহায়তা করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার কারণে অনেক শ্রমিকের এপ্রিলের বেতন পাওয়া কষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, অনেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নেই। আবার অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এখনই বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান না হলে সামনে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। এছাড়া তহবিল থেকে শুধু শ্রমিকদের বেতন দেয়া যাবে। কিন্তু অন্য কর্মীদের বেতন দেয়া যাবে না। ফলে তাদের বেতন কিভাবে দেয়া হবে সে বিষয়গুলো নিয়ে জরুরিভিত্তিতে আলোচনা হওয়া দরকার।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের এ তহবিল থেকে ৩ মাসের বেতন দেয়া হবে। এর বাইরে কারখানার কোনো কর্মকর্তা এ সুবিধা পাবেন না। মূলত বিশেষ তহবিলটি গঠন করেছে সরকার। আর সরকারের নির্দেশনার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক আলোচ্য নীতিমালাটি জারি করেছে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছুই করার নেই।’

রফতানিমুখী শিল্পের জন্য প্যাকেজ নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বাজেট) সিরাজুন নুর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ শুধু শিল্পের শ্রমিকদের দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রণয়ন করা হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে। সেটি যাতে না হয় সরকার তা বিবেচনা করে এ প্যাকেজ দিয়েছে।’

রফতানি বাণিজ্যের ওপর করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার জন্য ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল গঠনের ঘোষণা দেন। এর আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর আলোকে ২ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা জারি করে। এতে বলা হয়, ওই তহবিল থেকে শুধু সচল রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোই শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে ঋণ নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকগুলো সংগ্রহ করবে।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত