অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত: কারখানা চালুর উপায় বের করা জরুরি
jugantor
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত: কারখানা চালুর উপায় বের করা জরুরি
উৎপাদন ব্যবস্থা চালু না হলে বড় বিপদে পড়বে অর্থনীতি, সেজন্য ভারত, চীন ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের আদলে কিছু সেক্টরে কাজ শুরু করার তাগিদ * উৎপাদন বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়, ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনা থাকবে, তাই বলে ততদিন উৎপাদন বন্ধ থাকবে -আহসান এইচ মনসুর

  যুগান্তর রিপোর্ট  

২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত: কারখানা চালুর উপায় বের করা জরুরি

করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ কার্যক্রম ঠিক রেখে বিকল্প কোনো উপায়ে কিছু শিল্প-কারখানা চালু করার বিষয়ে অভিমত দিয়েছেন দেশের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা।

কেননা চলমান লকডাউনে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এক রকম বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। ব্যবসা-বাণিজ্য. শিল্প-কলকারখানার ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয়।

দোকানপাট, শপিংমল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের সবকিছু। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। চোখের সামনে অনেকের বহু কষ্টে অর্জিত শিল্প প্রতিষ্ঠান কঠিন এক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধ করা নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। অথচ এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিতে এখন পর্যন্ত কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত আকারে হলেও পর্যায়ক্রমে শিল্প-কারখানা লকডাউন থেকে মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের পাশাপাশি দ্রুত উৎপাদনে যেতে হবে। যেখানে রফতানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আগেভাগে সেসব বাজার আমাদের ধরতে হবে। পাশাপাশি যেসব শিল্প-কলকারখানার মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদার অনেকখানি মেটানো সম্ভব, সেগুলো বিকল্প উপায়ে হলেও চালু করতে হবে। তা না হলে এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতির যে ভয়াবহ ক্ষতি হবে সেটি সহ্য করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই।

প্রসঙ্গত, ৩ মে পর্যন্ত লকডাউন বহাল থাকলেও অর্থনীতির চরম ক্ষতির কথা মাথায় নিয়ে ভারত সরকারের নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী ২০ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ শুরু হয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কাজে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত অনেক দেশ ইতোমধ্যে এর বিস্তার রোধ করে সীমিত আকারে লকডাউন তুলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে চীন। এরপরই আছে জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আরও কয়েকটি দেশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে ঢালাওভাবে সব অর্থনৈতিক কমর্কাণ্ড বন্ধ করা যাবে না। তাই উৎপাদন সচল রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু প্রতিষ্ঠান চালু রাখা উচিত। না হলে সংকট আরও বাড়বে।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর রোববার যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু কারখানা অবশ্যই চালু করা উচিত। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউন হয়নি। আবার কিছু লকডাউন হলেও তারা আবার খুলে দিয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের গার্মেন্ট বন্ধ রাখলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে। দ্বিতীয়ত, কারখানা বন্ধ রাখলে শ্রমিকদের আয়ের পথ নেই। তৃতীয়ত, উৎপাদন বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনা থাকবে। তাই বলে ততদিন উৎপাদন বন্ধ থাকবে? নিশ্চয়ই নয়। ধাপে ধাপে কারখানা চালু করতে হবে।

এফবিসিসিআইর সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে জীবনের সুরক্ষা সবচেয়ে বড়। কিন্তু বাংলাদেশে কতজন মানুষ লকডাউন মানছে, ঘরে থাকছে? অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার স্থানান্তরে চাপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই একাধিক বায়ার তাদের ফ্যাব্রিক্স চীনে ফেরত পাঠাতে বলেছে। কারণ চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। এসব অর্ডার একবার চলে গেলে ২-৪ বছরে আর পাওয়া যাবে না। সেজন্য এখন যে করেই হোক দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে একটি ফর্মুলায় কারখানা চালু রাখার বিষয়ে নির্দেশনা আসা উচিত।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, করোনার প্রভাবে বিদেশি অর্ডার বাতিল-স্থগিতসহ টেক্সটাইল শিল্পের যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন ঈদ সামনে রেখে শিল্প চালু করতে পারলে অন্তত পক্ষে লোকসান কিছুটা কমানো যাবে। তিনি বলেন, সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে শিল্প চালুর বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা চেয়েছি। বর্তমানে শিল্প চালু রাখার বিষয়ে সরকারের একেকটি সংস্থা একেক ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সীমিত আকারে উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করার জন্য আগে করোনা ভাইরাস বহনকারীদের শনাক্ত করতে পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতের সঙ্গে জড়িতদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা করে যাদের মধ্যে করোনা নেগেটিভ পাওয়া যাবে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। সরকারি সহায়তা নিয়ে তাদের থাকা ও খাওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এভাবে করোনা সংক্রমণমুক্ত রেখে উৎপাদন খাতকে পর্যায়ক্রমে চালু করা যেতে পারে। সরকার চাইলে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেন, এটা ঠিক যে টানা লকডাউনের ফলে দেশের উৎপাদন, রফতানি খাতসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তারপরও করোনার সংক্রমণ রোধে লকডাউন চলমান রয়েছে। কেননা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে আগে। এ অবস্থায় লকডাউন তুলে বা সীমিত আকারে শিথিল করে উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি একেবারেই সরকারের নীতিনির্ধারণীর উচ্চ পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এ ব্যাপারে ওই পর্যায় থেকেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত আসবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকারকে দু’দিকেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। একদিকে মানুষের জীবন রক্ষা, অন্যদিকে সার্বিক প্রয়োজন মেটাতে নিত্যপণ্যের জোগান নিশ্চিত করা। জনগণকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাস্থ্য শিষ্টাচার মানতে প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে। তেমনি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। তিনি বলেন, উৎপাদন ঠিক রাখতে নতুন আয়োজন এবং নতুন চিন্তার দরকার। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সে বিষয়ে সরকার অবশ্যই সতর্ক রয়েছে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার উৎপাদন ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ৩-৪ মাসের মধ্যেই করোনার ভয়াল থাবা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে করোনার থাবায় আক্রান্ত দেশগুলোতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে এখন বিশ্বব্যাপী করোনার সংক্রমণ রোধের বিভিন্ন উপকরণের চাহিদা তুঙ্গে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ (পিপিই) বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সামগ্রী। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব সামগ্রী বিদেশে রফতানির সুযোগ থাকবে। এছাড়া নানা পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। এ বিষয়েও বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।

ইতোমধ্যে জাপান ঘোষণা দিয়েছে, চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে। ফলে ওইসব বিনিয়োগ আকর্ষণে এখন ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভারতও জাপানের বাজার ধরার চেষ্টা করছে। তাই বাংলাদেশকেও এসব নিয়ে ভাবতে হবে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিবাচক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে।

পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ শরাফাত বলেন, করোনার ফলে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। চীন থেকে জাপান বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে। সেগুলোকে বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধরতে এখনই কাজ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমের বাজারে বড় পরিবর্তন আসবে। সেটা ধরতে দক্ষ শ্রমিক তৈরির কাজে এখনই হাত দিতে হবে। তিনি বলেন, তবে সবার আগে এখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপর উৎপাদন ব্যবস্থা নিজস্ব গতিতে চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারই নয়, দেশের উদ্যোক্তা, শ্রমিক-কর্মচারী সব শ্রেণি-পেশার লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণে আমরা কোন পর্যায়ে আছি সেটা আগে দেখতে হবে। এটা পর্যালোচনা করতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কারখানা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন চলছে। ২৫ এপ্রিল এর মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে সূত্র জানায়, নতুন করে সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়লেও সীমিত আকারে কিছু খাতে ছাড় দেয়া হতে পারে। সেজন্য উপায় খুঁজে বের করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত: কারখানা চালুর উপায় বের করা জরুরি

উৎপাদন ব্যবস্থা চালু না হলে বড় বিপদে পড়বে অর্থনীতি, সেজন্য ভারত, চীন ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের আদলে কিছু সেক্টরে কাজ শুরু করার তাগিদ * উৎপাদন বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়, ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনা থাকবে, তাই বলে ততদিন উৎপাদন বন্ধ থাকবে -আহসান এইচ মনসুর
 যুগান্তর রিপোর্ট 
২০ এপ্রিল ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত: কারখানা চালুর উপায় বের করা জরুরি
করোনাভাইরাসের প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ কার্যক্রম ঠিক রেখে বিকল্প কোনো উপায়ে কিছু শিল্প-কারখানা চালু করার বিষয়ে অভিমত দিয়েছেন দেশের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা।

কেননা চলমান লকডাউনে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এক রকম বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। ব্যবসা-বাণিজ্য. শিল্প-কলকারখানার ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয়।

দোকানপাট, শপিংমল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের সবকিছু। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। চোখের সামনে অনেকের বহু কষ্টে অর্জিত শিল্প প্রতিষ্ঠান কঠিন এক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধ করা নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। অথচ এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিতে এখন পর্যন্ত কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত আকারে হলেও পর্যায়ক্রমে শিল্প-কারখানা লকডাউন থেকে মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের পাশাপাশি দ্রুত উৎপাদনে যেতে হবে। যেখানে রফতানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আগেভাগে সেসব বাজার আমাদের ধরতে হবে। পাশাপাশি যেসব শিল্প-কলকারখানার মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদার অনেকখানি মেটানো সম্ভব, সেগুলো বিকল্প উপায়ে হলেও চালু করতে হবে। তা না হলে এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতির যে ভয়াবহ ক্ষতি হবে সেটি সহ্য করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই।

প্রসঙ্গত, ৩ মে পর্যন্ত লকডাউন বহাল থাকলেও অর্থনীতির চরম ক্ষতির কথা মাথায় নিয়ে ভারত সরকারের নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী ২০ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ শুরু হয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কাজে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত অনেক দেশ ইতোমধ্যে এর বিস্তার রোধ করে সীমিত আকারে লকডাউন তুলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে চীন। এরপরই আছে জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আরও কয়েকটি দেশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে ঢালাওভাবে সব অর্থনৈতিক কমর্কাণ্ড বন্ধ করা যাবে না। তাই উৎপাদন সচল রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু প্রতিষ্ঠান চালু রাখা উচিত। না হলে সংকট আরও বাড়বে।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর রোববার যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু কারখানা অবশ্যই চালু করা উচিত। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউন হয়নি। আবার কিছু লকডাউন হলেও তারা আবার খুলে দিয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের গার্মেন্ট বন্ধ রাখলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে। দ্বিতীয়ত, কারখানা বন্ধ রাখলে শ্রমিকদের আয়ের পথ নেই। তৃতীয়ত, উৎপাদন বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনা থাকবে। তাই বলে ততদিন উৎপাদন বন্ধ থাকবে? নিশ্চয়ই নয়। ধাপে ধাপে কারখানা চালু করতে হবে।

এফবিসিসিআইর সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে জীবনের সুরক্ষা সবচেয়ে বড়। কিন্তু বাংলাদেশে কতজন মানুষ লকডাউন মানছে, ঘরে থাকছে? অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার স্থানান্তরে চাপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই একাধিক বায়ার তাদের ফ্যাব্রিক্স চীনে ফেরত পাঠাতে বলেছে। কারণ চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। এসব অর্ডার একবার চলে গেলে ২-৪ বছরে আর পাওয়া যাবে না। সেজন্য এখন যে করেই হোক দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে একটি ফর্মুলায় কারখানা চালু রাখার বিষয়ে নির্দেশনা আসা উচিত।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, করোনার প্রভাবে বিদেশি অর্ডার বাতিল-স্থগিতসহ টেক্সটাইল শিল্পের যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন ঈদ সামনে রেখে শিল্প চালু করতে পারলে অন্তত পক্ষে লোকসান কিছুটা কমানো যাবে। তিনি বলেন, সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে শিল্প চালুর বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা চেয়েছি। বর্তমানে শিল্প চালু রাখার বিষয়ে সরকারের একেকটি সংস্থা একেক ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সীমিত আকারে উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করার জন্য আগে করোনা ভাইরাস বহনকারীদের শনাক্ত করতে পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতের সঙ্গে জড়িতদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা করে যাদের মধ্যে করোনা নেগেটিভ পাওয়া যাবে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। সরকারি সহায়তা নিয়ে তাদের থাকা ও খাওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এভাবে করোনা সংক্রমণমুক্ত রেখে উৎপাদন খাতকে পর্যায়ক্রমে চালু করা যেতে পারে। সরকার চাইলে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেন, এটা ঠিক যে টানা লকডাউনের ফলে দেশের উৎপাদন, রফতানি খাতসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তারপরও করোনার সংক্রমণ রোধে লকডাউন চলমান রয়েছে। কেননা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে আগে। এ অবস্থায় লকডাউন তুলে বা সীমিত আকারে শিথিল করে উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি একেবারেই সরকারের নীতিনির্ধারণীর উচ্চ পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এ ব্যাপারে ওই পর্যায় থেকেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত আসবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকারকে দু’দিকেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। একদিকে মানুষের জীবন রক্ষা, অন্যদিকে সার্বিক প্রয়োজন মেটাতে নিত্যপণ্যের জোগান নিশ্চিত করা। জনগণকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাস্থ্য শিষ্টাচার মানতে প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে। তেমনি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। তিনি বলেন, উৎপাদন ঠিক রাখতে নতুন আয়োজন এবং নতুন চিন্তার দরকার। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সে বিষয়ে সরকার অবশ্যই সতর্ক রয়েছে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার উৎপাদন ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ৩-৪ মাসের মধ্যেই করোনার ভয়াল থাবা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে করোনার থাবায় আক্রান্ত দেশগুলোতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে এখন বিশ্বব্যাপী করোনার সংক্রমণ রোধের বিভিন্ন উপকরণের চাহিদা তুঙ্গে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ (পিপিই) বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সামগ্রী। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব সামগ্রী বিদেশে রফতানির সুযোগ থাকবে। এছাড়া নানা পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। এ বিষয়েও বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।

ইতোমধ্যে জাপান ঘোষণা দিয়েছে, চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে। ফলে ওইসব বিনিয়োগ আকর্ষণে এখন ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভারতও জাপানের বাজার ধরার চেষ্টা করছে। তাই বাংলাদেশকেও এসব নিয়ে ভাবতে হবে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিবাচক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে।

পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ শরাফাত বলেন, করোনার ফলে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। চীন থেকে জাপান বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে। সেগুলোকে বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধরতে এখনই কাজ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমের বাজারে বড় পরিবর্তন আসবে। সেটা ধরতে দক্ষ শ্রমিক তৈরির কাজে এখনই হাত দিতে হবে। তিনি বলেন, তবে সবার আগে এখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপর উৎপাদন ব্যবস্থা নিজস্ব গতিতে চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারই নয়, দেশের উদ্যোক্তা, শ্রমিক-কর্মচারী সব শ্রেণি-পেশার লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণে আমরা কোন পর্যায়ে আছি সেটা আগে দেখতে হবে। এটা পর্যালোচনা করতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কারখানা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন চলছে। ২৫ এপ্রিল এর মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে সূত্র জানায়, নতুন করে সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়লেও সীমিত আকারে কিছু খাতে ছাড় দেয়া হতে পারে। সেজন্য উপায় খুঁজে বের করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

০৪ ডিসেম্বর, ২০২১