ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের অভিমত

সমন্বিত জাতীয় প্রণোদনা পলিসি গ্রহণ জরুরি

শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, ঈদের আগে বেসরকারি সেক্টরের সবার বেতন-ভাতাও নিশ্চিত করতে হবে, ব্যর্থ হলে সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে * ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের সুফল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা -মোহাম্মদ আলী খোকন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে জাতীয় পলিসি গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাসহ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিলেও এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

যে কারণে দ্রুত ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সবে প্রথম প্যাকেজ থেকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন দেয়া শুরু হয়েছে। সেখানেও মাঝপথে এসে ৬৫ ভাগ বেতন দেয়ার সিদ্ধান্তে এ সেক্টরে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজসহ অন্যান্য প্যাকেজ নিয়ে ব্যাংকগুলো কোনো কাজই শুরু করেনি। তাহলে ঈদের আগে কিভাবে সব সেক্টরের বেতন-ভাতা প্রদানের বিষয়টির সুরাহা হবে।

শুধু গার্মেন্ট নিয়ে পড়ে থাকলে তো সংকটের গভীর খাদ তৈরি হবে। কেননা, গার্মেন্টের বাইরে দেশে আরও বহু শিল্প-কলকারখানা রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা বেতন না পেলে তারাও তো রাস্তায় নেমে আসতে পারেন। তাছাড়া এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ ও বৈশ্বিক সমস্যা। এখানে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা দিয়ে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিলে হবে না, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের সংস্থানও রাষ্ট্রকেই করতে হবে। বুধবার যুগান্তরের কাছে এমন মন্তব্য ও মতামত তুলে ধরেন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা ও অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের সুফল ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন না। শিল্প মালিকরা ঋণের জন্য আবেদন করলেও ব্যাংকগুলো তা প্রসেস করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়নি। প্রতিদিনই সদস্যদের কাছ থেকে অভিযোগ পাচ্ছি, এ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী নয়, নানা রকম টালবাহানা করছে। তাহলে ব্যাংক কবে ঋণ দেবে, আর কবে শ্রমিকদের বেতন দেব, তা বলতে পারছি না।

আর ঈদের আগে বেতন দিতে না পারলে টেক্সটাইল শ্রমিকরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের মতো রাস্তায় নামবেন। তখন মালিকদের দোষারোপ করে লাভ হবে না। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকনির্ভর প্যাকেজের পাশাপাশি সরকারের উচিত হবে, শ্রমিকদের জন্য রেশনিং চালু করা। অর্থসংস্থানের জন্য প্রয়োজনে সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য পদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কিছুটা কাটছাঁট করতে পারে।

অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন বলেন, সবাই এখন গার্মেন্ট খাত নিয়ে ব্যস্ত। এখন সময় এসেছে অন্য খাতগুলোর দিকে তাকানোর। সরকার ৩০ হাজার কোটি টাকার যে তহবিল ঘোষণা করেছে তা সংকট মোকাবেলায় পর্যাপ্ত না হলেও যত দ্রুত সম্ভব ব্যাংকগুলোকে এ প্যাকেজের ঋণ ছাড় করতে হবে। এক্ষেত্রে যত দেরি হবে, অর্থনীতিতে ঝুঁকির পরিমাণ তত বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, ঋণের বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। কিছু কিছু ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে না, এমনকি প্যাকেজ থেকে ঋণ দেবে না বলেও স্পষ্ট গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক টাকা ছাড় না করলে মে মাসের বেতন, ঈদ বোনাস দিতে হিমশিম খেতে হবে। তখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে। তিনি জানান, স্টিল খাতে প্রত্যক্ষভাবে সাড়ে ৩ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরও ৬ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এছাড়া সিমেন্ট খাতে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যাও কম নয়।

এদিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য কোনো ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী দায়ী নয়। সব খাতই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, একমাত্র তৈরি পোশাকের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি সচল আছে। তাই সরকারের সব চিন্তা এই খাতকে ঘিরে। করোনার শুরুতে এ খাতের শ্রমিকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করা হয়। এর বাইরে স্থানীয় শিল্পের অর্থনীতিতে যে অবদান আছে, তা বেমালুম সরকার ভুলে গিয়েছে।

এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও মঙ্গলবার নীতিমালা করা হয়েছে। আর ভারি শিল্পের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের নীতিমালা করলেও ব্যাংকগুলো এখন ব্যস্ত গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন নিয়ে। এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শিল্পমালিকরা টাকা না পেলে এপ্রিল-মে মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দিতে পারবেন না। তখন এসব শ্রমিকও রাস্তায় নামবে।

তারা বলেন, সরকারের উচিত ছিল, জাতীয় এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যবসায়ী মহল, অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে সমন্বিত পলিসি গ্রহণ করা। খাতভিত্তিক প্রণোদনা বিভাজন করে দ্রুত ঋণপ্রাপ্তির পথ সুগম করা। এ ছাড়া ব্যাংকনির্ভর প্রণোদনার পাশাপাশি অনুদান হিসেবে সরাসরি শ্রমিকদের সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে অর্থের সংকট হলে অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রেখে, মন্ত্রণালয়গুলো ব্যয় হ্রাস এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কিছুটা কম দিয়েও অর্থের সংস্থান করা যেতে পারে। কারণ, এক দেশে দু’ধরনের নিয়ম থাকতে পারে না।

গার্মেন্ট কারখানা লে-অফ বা খুলতে না পারার কারণে শ্রমিকদের এপ্রিল মাসে ৬৫ ভাগ বেতনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানা ভাংচুর, রাস্তা অবরোধ করছে। অন্য সব খাতও করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে কর্মীদের বেতন কমিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় ৬ দফা লকডাউনে ৫১ দিন অফিস না করেও ঘরে বসে অনেক সরকারি কর্মকর্তা শতভাগ বেতন পেতে পারে না। ক্ষুধা তো এমন না যে, শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের বেশি লাগে, অন্য শ্রমিকদের কম লাগে।

গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান যুগান্তরকে বলেন, সরকার বলছে শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না, সব শ্রমিককে বেতন দিতে হবে; কিন্তু এখন পর্যন্ত প্যাকেজের টাকা তো দূরের কথা ব্যাংকে পড়ে থাকা নিজস্ব টাকাই পাচ্ছি না। নভেম্বর-ডিসেম্বরের টাকা ওভারডিউ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এক্সেসরিজ খাতকে টাকা দেয়ার কথা। শুধু শুনছি টাকা পাব, পাব। কবে পাব, তা কেউ বলতে পারছে না।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থছাড় প্রক্রিয়ার নীতিমালা জারি করেছে। কিন্তু এই নীতিমালার আলোকে আবেদন করলে টাকা ঈদের আগে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে। এ খাতে ৭ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে। ঈদের আগে এসব শ্রমিকের বেতন-ভাতা দিতে না পারলে তারা তো বাধ্য হয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মতো রাস্তায় নামতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্প সেক্টরের বাইরেও বিপুলসংখ্যক পরিবহন শ্রমিক, দোকান শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিক, ফুটপাতের হকার, স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ রয়েছে। যাদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য পৃথক পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। কিন্তু এ ধরনের বৈষম্যের কারণে সামাজিক অসন্তোষ দানা বাঁধতে পারে। তাই সব খাতের উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলোচনার ভিত্তিতে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় বাস্তবধর্মী প্যাকেজ ঘোষণা করা এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থের সংস্থানে প্রয়োজনে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অযাচিত ব্যয় হ্রাস, অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অর্থায়ন সাময়িক বন্ধের পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনও হ্রাস করার পক্ষে মত দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাবে আছে। প্রথমত, ঋণের ঝুঁকি পুরোপুরি ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তাই ব্যাংকগুলোর প্যাকেজ বাস্তবায়নে অনীহা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্যাকেজ কার্যকর করতে চাইলে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহ ও পলিসি সহায়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রকের অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্যাকেজের সার্কুলার জারির পর দফায় দফায় সংশোধন করছে। এ কারণে প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া পদক্ষেপ নেয়ায় এ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, প্যাকেজগুলো শ্রমিকবান্ধব করা গেলে অর্থনীতি উপকৃত হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও আইএফসির সাবেক অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেন, সরকার ঘোষিত প্যাকেজে বড় গ্যাপ রয়েছে। ভারত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশ যে প্যাকেজ দিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কর্মসংস্থান ধরে রাখা। এ জন্য শ্রমিকদের সরাসরি অথবা ফার্মকে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ শুধু রফতানিমুখী খাতকে এ সহায়তা দিয়েছে। কার্যত এ সুবিধা শুধু গার্মেন্ট খাতই পাবে। এর বাইরে পরিবহন, রিটেইল, স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কথা ভাবা হয়নি।

যেহেতু আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে, তাই অর্থনীতিতে গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট খাতের শ্রমিকদের প্রণোদনা দেয়া উচিত। তা না হলে সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে থাকা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প স্থগিত রাখার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়গুলো অযাচিত খরচ হ্রাস করে অর্থ সাশ্রয় করা যেতে পারে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত