ত্রাণের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে নানা অনিয়ম

গরিবের চাল খাচ্ছে প্রভাবশালীরা

ওএমএসের কার্ড পেয়েছে ৫ তলা ভবনের মালিক আওয়ামী লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর * ৫৫ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত ১০৫ জনের তালিকা দুদকের হাতে ও ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা

  মিজান মালিক ও উবায়দুল্লাহ বাদল ১৪ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হতদরিদ্রের খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। এসব চাল বিভিন্ন কায়দায় আত্মসাৎ করছে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের প্রভাবশালীরা। তারা এগুলো গরিবকে না দিয়ে নিজের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও আস্থাভাজনদের নামে উত্তোলন করছেন।

এমনকি ৫ তলা ভবনের মালিক ও ক্ষমতাসীন দলের নেতার নামেও সরকারের বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির কার্ড হয়েছে। যারা সরকারি এই সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন। শুধু তা-ই নয়, অনেকে গরিবের নামে কার্ড করে বছরের পর বছর নিজেই ভোগ করছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, উল্লিখিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ পর্যন্ত ২০ জন ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৫৫ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এদের মধ্যে আরও আছে, ৩৩ জন ইউপি সদস্য, ১ জন জেলা পরিষদ সদস্য এবং ১ জন পৌরসভার কাউন্সিলর।

এদিকে একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া চাল চুরিতে জড়িত অন্তত ১০৫ জনের নামের তালিকা দুদকের হাতে রয়েছে। এই তালিকায় কয়েকজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, সরকারদলীয় সংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর নাম রয়েছে।

দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটসহ আরও কয়েকটি সরকারি সংস্থা এই ত্রাণ আত্মসাৎ ও চুরির বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করছে। এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ত্রাণসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা আত্মসাতের অভিযোগে ১৫টি মামলা হয়েছে।

প্রতিটি মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। এ ছাড়া আরও কিছু ব্যক্তির তালিকা নিয়ে কাজ করছে দুদক। মামলাগুলো প্রয়োজনে একটি বিশেষ কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠন করে তদন্ত ও প্রসিকিউশন কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে চলছে সাধারণ ছুটি। এ সময় জরুরি কাজ ছাড়া ঘরে থাকতে বলা হয় সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়ে দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য চালসহ বিভিন্ন খাদসামগ্রী সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

চাল চোরদের ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে আছে সরকারের শীর্ষমহল। এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার বলেন, ‘ত্রাণ কার্যক্রমে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করেছে। সরকার কঠোর অবস্থানে আছে বলেই সামান্য অপরাধ করলেও কেউ রেহাই পাচ্ছে না। ইতোমধ্যে সব অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত, প্রশাসনিক ও দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ তারই প্রমাণ।’

সারা দেশের হতদরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিতে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একাধিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (১০ টাকা কেজি দরের চাল), ওএমএস, বিশেষ ওএমএস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা), টেস্ট রিলিফ (টিআর), জেনারেল রিলিফ (জিআর), অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) কর্মসূচি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভিজিএফ কর্মসূচি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বয়স্ক ও বিধবা ভাতা কর্মসূচিসহ নানা ধরনের সামজিক কর্মসূচি রয়েছে।

এসব কর্মসূচি নেয়া হয়েছে সমাজের কর্মহীন শ্রমজীবী সুবিধাবঞ্চিত ভিক্ষুক, ভবঘুরে, শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, চায়ের দোকানদার ও হিজড়া সম্প্রদায়সহ হতদরিদ্র মানুষের জন্য।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : করোনার কারণে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তাতে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণ নিয়ে কোনো অনিয়ম নেই, যা হচ্ছে তা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএসসহ অন্য কর্মসূচির চাল নিয়ে। সারা দেশে এক কোটি পরিবারকে সরকার নানা ধরনের সহায়তা করছে। আমরা ৫০ লাখ পরিবারকে কিউআর কার্ড (কুইক রেসপন্স কার্ড) দিয়ে বিতরণ করছি, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এই কার্ড মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে ধরলেই কার্ডধারীর যাবতীয় তথ্য বের হয়ে আসবে। ফলে এখানে দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই।’

খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, ‘অধিকাংশ অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএসের চাল নিয়ে। আর সব চলছে ২০১৬ সাল থেকে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর এসব তালিকা হালনাগাদ ও নির্ভুল করতে একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছি। আর এসব তালিকা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। আমরা এই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচির দুর্নীতি বন্ধে আগামী দিনে কিউআর কার্ড করা হবে। এজন্য হয়তো একটু সময় লাগবে।’

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর বিশেষ ওএমএসের কার্ড পেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলর। তাদের আত্মীয়রাও কার্ড পেয়েছে- এমন বিষয়ের জবাবে সচিব বলেন, ‘এরকম তো হওয়ার কথা নয়। তারপরও আমি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

অনিয়ম ও দুর্নীতি : বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ সহায়তা কর্মসূচির কয়েকটি অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র নিচে দেয়া হল-

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হতদরিদ্রদের জন্য বিশেষ ওএমএস চালু হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায়। এ সুবিধা পেতে ৯ হাজার ৬০০ জনের তালিকা হয়েছে। এই কার্ডের তালিকায় পাঁচতলা ভবনের মালিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও ওএমএস ডিলার মো. শাহআলমের স্ত্রী-সন্তানসহ ১৩ স্বজনের অস্তিত্ব পেয়েছে জেলা প্রশাসন।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) হায়াত-উদ-দৌলা খান যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়ে ডিলার শাহ আলমকে শোকজ করেছি। শুধু শাহ আলমই নয়, এ ধরনের ৯১ জনের নাম পেয়েছি। যারা এ সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত নয়। ইতোমধ্যে তাদের কার্ড বাতিল করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেয়া হবে।’

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সংরক্ষিত আসনের একজন মহিলা ইউপি সদস্য নিজের নামে দুস্থ নারীদের ভিজিডি কার্ড করেছেন। এ ছাড়াও তিনি এক ভিজিডি কার্ডধারীর কার্ড চার বছর ধরে নিজের কাছে রেখে ওই কার্ডের চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। প্রাথমিক তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে অধিকতর তদন্ত করতে বলেছি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নামের তালিকায় এক ইউপি সদস্যসহ তার পরিবারের ১২ জনের নাম রয়েছে। ৯নং ইউপি সদস্য তাজির উদ্দিনসহ তার পরিবারের ১২ জন সদস্য চার বছর ধরে সুবিধা ভোগ করার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে তাজির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘ওই তালিকায় আমার কোনো হাত নেই। আমার পরিবারের নামগুলো কৃষি অফিসের একজন কর্মকর্তা তালিকায় ঢুকিয়েছেন। কিন্তু এসব তালিকার চাল আমরা কখনও নিইনি।’

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত