জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান আর নেই

নিভে গেল বাতিঘর

  সাংস্কৃতিক রিপোর্টার ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান আর নেই। সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ কীর্তিমান মানুষটি (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

তিনি হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতা, পারকিনসন্স ডিজিজ এবং প্রোস্টেটের সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুর দিন নমুনা পরীক্ষায় তার শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। তিনি স্ত্রী সিদ্দিকা জামান, দুই মেয়ে রুচিবা ও শুচিতা এবং ছেলে আনন্দ জামানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমাজহিতৈষী মনোভাব, গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল চেতনা, সুশীল বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা ও ব্যক্তিগত মনীষা দিয়ে নিজেকে পরিণত করেছিলেন দেশের অগ্রগণ্য পুরুষে। জাতির মনন গঠনে রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। শুধু তাই নয়, দেশের যে কোনো ক্রান্তিকালে দিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনা। তার লেখায় উঠে এসেছে দেশ বিভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে সারা দেশে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী অবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

শারীরিক নানা সমস্যার কারণে ২৭ এপ্রিল আনিসুজ্জামানকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে ২ মে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করেন। এতেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ৯ মে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাত ১০টার দিকে আনিসুজ্জামানের ছেলে আনন্দ জামান যুগান্তরকে জানান, পরীক্ষায় তার বাবার শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। এ কারণে পূর্ব পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনেই দাফন হবে। তিনি বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে আব্বার নমুনা নেয়া হয়। বিকালে মৃত্যুর পর আবারও নমুনা নেয়া হয়। একটু আগে জানতে পারলাম, রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পুরো নাম আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাট মহকুমার মোহাম্মদপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক আবু তাহের মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম ও মা গৃহিণী সৈয়দা খাতুন।

পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। তার বড় বোনও নিয়মিত কবিতা লিখতেন। বলা যায়, শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ছিল তাদের পরিবার। দেশ বিভাগের সময় তাদের পরিবার খুলনায় চলে আসে।

১৯৫১ সালে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে বাংলায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন আনিসুজ্জামান। অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৃতিত্বস্বরূপ ‘নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক’ বৃত্তি লাভ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৫৮ সালে বাংলা একাডেমি বৃত্তি পেয়েও তা ছেড়ে দিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এডহক ভিত্তিতে ৩ মাসের জন্য যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। যুদ্ধ শুরু হলে ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। সেখান থেকে অবসর নেন ২০০৩ সালে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপকে পদে সম্মানিত করে।

আনিসুজ্জামান অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বটে কিন্তু তার নেশা ছিল লেখালেখি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে। তার রচিত ও সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, স্বরূপের সন্ধানে, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, পূর্বগামী, কাল নিরবধি, বিপলুা পৃথিবী উল্লেখযোগ্য। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ এবং নানা বিষয়ে বই সম্পাদনা করেছেন তিনি।

শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আনিসুজ্জামান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত পুরস্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার (১৯৯০), দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক (১৯৯৩), অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৪) লাভ করেন। এছাড়া তিনি ভারত রাষ্ট্রের সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি. লিট লাভ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর শোক : জাতীয় অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি ড. আনিসুজ্জামানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ছিলাম স্যারের টিউটোরিয়াল গ্রুপের শিক্ষার্থী।’ প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অনন্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি আরও বলেন, তার মতো বিদগ্ধ ও জ্ঞানী মানুষের মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হল।

বিভিন্ন ব্যক্তি, দল ও সংগঠনের শোক : অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ছায়নট, গণফোরাম, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।

আজ সকালে দাফন : আজ সকাল সাড়ে দশটায় রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে প্রয়াত শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামানকে। তার দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে আল মারকাজুল ইসলাম। করোনায় মৃতদের যে প্রক্রিয়ায় দাফন করা হয় তার সব নিয়ম মেনেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ শিক্ষককে শেষ বিদায় জানানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত