কেউ যাতে বঞ্চিত না হয় খেয়াল রাখার নির্দেশ: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

রমজান ও ঈদ উপলক্ষে ৫০ লাখ পরিবারকেনগদ অর্থ সহায়তা দেয়া শুরু * ২০১৯ সালের স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বিতরণ কার্যক্রম শুরু * বিকাশ, নগদ, রকেট ও শিওরক্যাশের মাধ্যমে টাকা পৌঁছে যাবে

  বাসস ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে ঈদ উপলক্ষে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দিয়েছে সরকার।

বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে এসব সুবিধাভোগীদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ পাঠানোর কার্যক্রম ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘এ অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। আমরা হয়তো অনেক বেশি দিতে পারব না। কিন্তু কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সবাই যাতে সামান্য হলেও সহায়তা পায় সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।’

এদিন একই সঙ্গে অনলাইন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের ২০১৯ সালের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি বিতরণ কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৪ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি এবং উপবৃত্তি প্রদান করা হয়ে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে সুইচ চেপে দুটি কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, ‘এটাই হল আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ। কারও কাছে যেতে হবে না, ধরনা দিতে হবে না, বলতে হবে না, কিন্তু সবার কাছে টাকা হেঁটে পৌঁছে যাবে। মানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পৌঁছে যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের জীবনে প্রয়োজন অনেক বেশি। মানুষদের ক্ষুধার জ্বালা আমরা বুঝি। এজন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

করোনাভাইরাসকে অদৃশ্য শক্তি আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘এমন একটি অদৃশ্য শক্তির মোকাবেলা কোনো দেশই করতে পারছে না। কত শক্তিশালী দেশকেও আমরা দেখেছি, এই করোনাভাইরাস শক্তির কাছে সারেন্ডার করছে।’

জানা গেছে, বিকাশ, নগদ, রকেট ও শিওরক্যাশের মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে টাকা পৌঁছে যাবে। মোট ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে বিকাশের ভাগে রয়েছে ১৫ লাখের দায়িত্ব। সবচেয়ে বেশি ১৭ লাখ পরিবারের কাছে টাকা পাঠাবে নগদ। বাকি ১৮ লাখ পরিবারের কাছে পৌঁছাবে রকেট ও শিওরক্যাশ।

উদ্যোগটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ জড়িত। স্থানীয় সরকার অর্থাৎ জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের সাহায্যে পরিবার চিহ্নিত করা হয়েছে। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোলট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকসহ পরিবহন শ্রমিক, হকারসহ নানা পেশার মানুষকে তালিকায় রাখা হয়েছে।

সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সহায়তায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী বর্তমানে যেসব সহায়তা পাচ্ছে, এ তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তালিকার কাজ শেষ করা হয়েছে ৭ মে। অবশ্য এখনও যাচাইয়ের কাজ চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার সাহায্য দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বৈধতা পরিহারের চেষ্টা করেছে এবং আসন্ন ঈদ ও রমজান উপলক্ষ করেই এই সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। একেবারে বেকার ঘরে বসে না থেকে করোনার জন্য সাবধানতা অবলম্বন করে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই কিছু কিছু কাজকর্ম করার জন্য মেহেনতি মানুষদের পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশে তখন মঙ্গা থাকে না, দরিদ্র থাকে না, এটা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, লাভ হয়েছে প্রকৃতির। জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশ-প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। প্রকৃতি তার আপন গতিতে ফিরে যাচ্ছে। এটি একটি অদ্ভুত ব্যাপার, এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীতে আর কখনও ঘটেনি। অনেক মহামারী ও দুর্ভিক্ষের কাহিনী আমরা জানি। কিন্তু এবারের বিষয়টা ভিন্ন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। ৮ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম। আমাদের দুর্ভাগ্য, এমন সময় একটি অদৃশ্য শক্তির আঘাত, যার ফলে সমগ্র বিশ্ব একেবারে থমকে গেছে। সারাবিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে আক্রান্ত।’

কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে যেভাবে করোনা আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে সে তুলনায় আমরা কিন্তু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।’

ভিডিও কনফারেন্স সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সংযুক্ত হয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া গণভবন প্রান্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পিএমও এবং গণভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বরগুনা, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ এবং লালমনিরহাটের উপকারভোগী জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে ৫শ’ ও কর্মসংস্থান ব্যাংককে দুই হাজার কোটি টাকা আমানত দেয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া লোকজন এবং বিদেশ ফেরত জনগণ যাতে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সেজন্য কর্মসংস্থান ব্যাংককে ২ হাজার কোটি এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে ৫শ’ কোটি টাকা আমানত হিসেবে দেবে সরকার।

তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থান ব্যাংকের ঋণ প্রদান বৃদ্ধি করার জন্য আরও ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আমানত দেয়া হবে। ‘যুবক শ্রেণিকে যাতে বেকার হয়ে ঘুরে না বেড়াতে হয় সেজন্য সেখান থেকে তারা ঋণ নিতে পারবে। নিজেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে।’

প্রবাসীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যারা প্রবাসী, তারা রেমিটেন্স পাঠায়। তাদের যেন ঘরবাড়ি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে না হয়। এজন্য প্রবাসী কল্যাণ নামে আরেকটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেই ব্যাংকেও আমরা আরও টাকা দেব। সেখানে আমরা অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা দেব। এর আগে ওখানে আমরা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, এখন প্রবাসে কাজের পরিধি সীমিত হয়ে গেছে। সেখানেও বহু মানুষ কাজ হারাচ্ছে এবং অনেকে দেশে ফিরে আসছে। তারা আমার দেশের নাগরিক। তারা ওখানে কষ্ট করুক সেটা আমি চাই না। তারা ফিরে এলে ফিরে আসবে। কিন্তু এখানে এসে তারা যেন কাজ করে খেতে পারেন, তাদের সেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি যখন প্রথমবার সরকারে আসেন তখন দেশের যুব সমাজের বেকারত্বের অভিশাপ দূর করার জন্যই এই কর্মসংস্থান ব্যাংক সৃষ্টি করেন। এ ব্যাংক থেকে শিক্ষিত হোক আর অশিক্ষিত হোক, যে কোনো যুবক বা তরুণ-তরুণী কোনো জামানত ছাড়াই স্বল্প সুদে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন।’ ‘এই ঋণ নিয়ে তারা একা ব্যবসা করতে পারেন অথবা বন্ধু-বান্ধব মিলে ব্যবসা করতে পারেন’, যোগ করেন তিনি।

এবারের করোনা পরিস্থিতিতে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কষ্টের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের একটা দায়িত্ব আছে- আমি ইতোমধ্যে একটা তালিকা করতে বলে দিয়েছি- সব মসজিদে ঈদ-রমজান উপলক্ষে আমি কিছু আর্থিক সহায়তা দেব, সেই তালিকাটাও আমরা করে দিচ্ছি।’

দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৭ হাজার কওমি মাদ্রাসাকে ঈদের আগে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। সেই পদক্ষেপও আমি নিয়েছি।

প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসায় সহায়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে এতিমখানা আছে তারা খুব একটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কথা চিন্তা করে ইতোমধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৮৬৫টি কওমি মাদ্রাসায়, যেখানে এতিমখানা আছে সেখানে আমরা আর্থিক সহায়তা দিয়েছি।

এ খাতে সরকারের প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো মাদ্রাসায় কতজন এতিম আছে আমরা হিসাব নিয়েছি, সে হিসাব অনুযায়ী প্রত্যেক মাদ্রাসায় আমরা টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি। এভাবে বিভিন্ন জায়গায় যারা এতিম-অসহায় যারাই আছে কোনো শ্রেণিই যেন অবহেলিত না থাকে। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, যোগ করেন তিনি।

ধান কাটায় কৃষকদের সাহায্য করায় ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগ নেতারা ধান কাটায় সাহায্য করায় আজ সারা বাংলাদেশের কৃষকের গোলাভরা ধান।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে। আল্লাহর রহমতে, অন্তত খাদ্যের কষ্ট হবে না। সেটা আমরা ব্যবস্থা করতে পারব। কিছু নগদ সাহায্য দেয়া অপরিহার্য। আমরা সেটুকু ব্যবস্থা করছি।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ‘এন-৯৫ ’ সম্পর্কেও কথা বলেন এবং এটি সাধারণের জন্য নয় বরং করোনা রোগীকে যারা সেবা প্রদান করবে তাদের পরিধানের জন্যই দেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ঘরে সংক্রমণমুক্ত পরিবেশে থাকলে তিনি মুখের মাস্ক খুলে রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত