করোনা চিকিৎসায় আগ্রহ নেই বেসরকারি হাসপাতালের, সংকটেও বাণিজ্য মুখ্য

প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর ব্যবসায়িক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে -অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান * জাতির এ সংকটে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে -অধ্যাপক কামরুল হাসান খান * সব হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন নেই -ডা. এবিএম হারুন

  রাশেদ রাব্বি ১৬ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসেনি দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল। রোগীর চাপ সামলাতে সরকারি হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ হাসপাতাল হাত গুটিয়ে আছে।

বেশকিছু হাসপাতাল-ক্লিনিক অঘোষিত আধা-লকডাউন করে রাখা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চারটি বেসরকারি হাসপাতাল এগিয়ে এসেছে বটে। তবে তারা সরকারের সঙ্গে দেনা-পাওনা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছে।

একটির কর্তৃপক্ষ ২শ’ শয্যার জন্য বিভিন্ন খাতে সরকারের কাছে মাসে ১৭ কোটি টাকার বেশি দাবি করেছে। অপর একটি চেয়েছে ডাক্তার ও স্টাফদের থাকা-খাওয়ার খরচও। অন্যরাও প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। দরদামে বনিবনা না হওয়া পর্যন্ত প্রায় কেউই সেবা দিতে রাজি হচ্ছে না। রফা হলেই তারা কাজে নামছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে তাদের বাণিজ্যিক মনোভাবের বহির্প্রকাশ বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

তাদের মতে, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো মূলত সেবা দেয়ার নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেখানে সেবার চেয়ে আর্থিক মুনাফার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল গড়েই ওঠে সেইসব বিশেষায়িত বিভাগ নিয়ে, যে রোগগুলো উপশমে রোগীদের বিপুল অর্থ প্রদান করতে হয়ে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগের চিকিৎসা হয় না। এমনকি দেশে করোনা আসার পর থেকে বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল সব ধরনের চিকিৎসা বন্ধ রেখেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

করোনা আক্রান্ত নন এমন রোগীদের প্রতিনিয়ত ফিরিয়ে দেয়ার অভিযোগে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী এ ধরনের হাসপাতাল ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করার হুশিয়ারি দেন। যদিও সেই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের একটি সংগঠন মঙ্গলবার এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, লাইসেন্স বাতিলের হুশিয়ারি কোনো সমাধান হতে পারে না।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, করোনা একটি জাতীয় মহামারী। এখানে জোরাজুরির বিষয় নেই, জাতির এ সংকটে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আলোচনার মাধ্যমে।

করোনা চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালগুলো পিছিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. এবিএম হারুন যুগান্তরকে বলেন, সব হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন নেই। করোনার জন্য যথেষ্ট সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তাছাড়া দু-একটি বেসরকারি হাসপাতাল যুক্ত হয়েছে। অন্যান্য রোগের চিকিৎসা কেনা দেয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা যেই হাসপাতালগুলো দিচ্ছে না, তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ভাবে জানতে হবে।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা সেবার মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার পর দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ বছরে বেসরকারি খাত থেকে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে থাকেন। কিন্তু সেখানেও বাণিজ্যিক মুনাফাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্য এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান যুগান্তরকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো মূলতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এখন তাদের ব্যবসায়িক চরিত্রের বহির্প্রকাশ ঘটছে। তারা যে জনহিতকর কাজ করে না সেই বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ৬৯টি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া সারা দেশে বেসরকারি খাতে শুধু হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে ১০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুটি বেসরকারি হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। একটি রিজেণ্ট হাসপাতাল অন্যটি সাজেদা ফাউন্ডেশন হাসপাতাল।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে আরও দুটি হাসপাতালের এমওইউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়েছে। তারও হয়তো শিগগিরই এ সেবায় যুক্ত হবে। কিন্তু এ চারটি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র একটি হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রাপ্ত সহযোগিতা নিয়েই সেবা দিচ্ছে। বাকিগুলো সরকারের সঙ্গে নানা ধরনের দেন-দরবার করে তবেই সেবা প্রদানে সম্মত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখা সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে প্রথম এমওইউ চুক্তি হয় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে। ১২ মে তারা এমওইউ পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছে।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. শাহেদ স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বলা হয়েছে, আমরা প্রথম থেকেই কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে কাজ করে আসছি এবং সরকারে কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেয়েছি। ইতোমধ্যে সরকার কর্তৃক ১১ জন চিকিৎসক ও ৯ জন নার্স পেয়েছি। রোগী বাড়ার কারণে তারা আরও ৩৫ জন ডাক্তার এবং ১৫ নার্সের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

পাশাপাশি ওইসব ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার বিষয়টি সরকার কর্তৃক নিশ্চিত করার বিষয়টি অনুরোধ করেছেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল এক চিঠিতে তিনি হাসপাতালের রোগী, ডাক্তার, নার্স ওয়ার্ডবয়সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের খাবারের খরচ বহনের অনুরোধ করেন। যদিও সেখানে চিকিৎসা নেয়া রোগীরা যুগান্তরকে বলেছেন, রিজেন্টে চিকিৎসার জন্য তাদের ওষুধ ও খাবারের টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

রাজধানীর ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসায় তাদের ২০০ শয্যা ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখায় একটি প্রস্তাবনা দেয়।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইহতেশামুল হক স্বাক্ষরিত ওই প্রস্তাবনায় বলা হয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মীদের বেতন বাবদ দরকার ৪ কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। মেডিকেল কলেজের বেতন বাবদ দরকার ১ কোটি ২৫ লাখ ৬৮ হাজার ৭১৫ টাকা, হাসপাতাল ব্যয় ২ কোটি ৮৩ লাখ ২২ হাজার ৬শ’ টাকা। এছাড়া যন্ত্রপাতি বাবদ ব্যয় ৮৯ লাখ ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ১০ লাখ টাকা। ১৭ কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৫ টাকা প্রতি মাসে ব্যয়।

২৫ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক চিঠিতে জানানো হয়, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে শুধু কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য চিকিৎসা ব্যয়ও সরকার বহন করবে।

সর্বশেষ যুক্ত হওয়া তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল হল হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল ও আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ তিনটিতে করোনা রোগীদের জন্য শয্যা আছে ৮৫০। তবে ইমপালস হাসপাতালটি আক্রান্ত পুলিশদের জন্য নির্দিষ্ট।

হাসপাতাল শাখার এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রতি মাসে ওই পরিমাণ টাকা দিলেই রোগীদের সেবা দেবে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন দেন-দরবার চলে। তবে শেষ পর্যন্ত কত টাকায় তারা রাজি হয়েছে সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি এ কর্মকর্তা।

হাসপাতাল শাখার অন্যান্য কর্তকর্তারা জানান, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা চলছে। টাকা ছাড়া কেউই সেবা দিতে রাজি নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক অঘোষিত আধা-লকডাউন করে রাখা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে গেলে আবার ব্যবসায় নামবে। এজন্য অনেক হাসপাতাল কর্মরত ডাক্তার-নার্স-ওয়ার্ডবয়দের ছুটি দিয়ে দেয়। এমনকি তাদের করোনাকালে বেতন না দেয়ার ঘোষণা দেয়।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বেতন দিতে রাজি হলেও বোনাস না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল কর্তৃপক্ষ। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো করোনাকালে চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকার করায় অনেক রোগীকে এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে ছুটতে হয়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পাওয়ার এমন অনেক অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। এমন ভুক্তভোগীর অনেকের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও অনেক আলোচনা হয়েছে।

সম্প্রতি সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার কিডনি জটিলতায় অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে স্বজনরা একের পর এক হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি করতে পারেনি। পরে তাকে সরকারি পর্যায়ের একটি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

এসব বিষয়ে জনস্বাস্থ্য সংগ্রম পরিষদের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম যুগান্তরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার সেটি হল- সরকারি হাসপাতাল ছাড়া তাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। বেসরকারি হাসপাতালগুলো পুঁজি আর মুনাফা ছাড়া কিছুই বোঝে না। জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাই সরকারের উচিত দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল রাষ্ট্রীয়করণ করা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আমিনুল হাসান বলেছেন, আমরা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোকে যুক্ত করতে মালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছি। তাদের আমরা অনুরোধ করেছি, তারা যেন করোনাভাইরাস ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করে এবং সেভাবে রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তারা সেটা করছে না। সে কারণে যেভাবে সাধারণ রোগীর সেবা পাওয়ার কথা সেভাবে পাচ্ছে না।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত