শোকে ‘পাথর’ মাহি দু’চোখে শুধু শূন্যতা

পাইলট আবিদের কবরের পাশে শেষ শয্যা * একা হয়ে গেল মাহি

  আহমদুল হাসান আসিক ২৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাহী
তানজিদ সুলতান মাহি

তানজিদ সুলতান মাহির যেন কোনো বিকার নেই। চোখে পানি নেই। ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তার মহাঘোর। বাবাকে হারানোর ১১ দিনের ব্যবধানে মা আফসানা খানমকেও হারিয়ে শোকে ‘পাথর’ হয়ে গেছে মাহি। রাজধানীর উত্তরার বাসার গ্যারেজে শুক্রবার বিকালে দাঁড় করানো অ্যাম্বুলেন্সে আফসানা খানমের লাশ ওঠানো হল। চালকের পাশে বসানো হল তার একমাত্র ছেলে তানজিদ সুলতান মাহিকে। তাকে ধরে পাশে বসলেন চাচা খুরশিদ মাহমুদ। মাহির চোখে একরাশ শূন্যতা ছাড়া যেন আর কিছু নেই।

১২ মার্চ নেপালে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মারা যান মাহির বাবা পাইলট আবিদ সুলতান। শুক্রবার সকালে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মা আফসানা খানমও। এ শোকে স্তব্ধ মাহি কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছে না, এমনকি কান্নাও করছে না।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পাইলট আবিদের স্ত্রী আফসানা খানম। স্বামীর মৃত্যুশোক সইতে না পেরে ছয়দিন আগে ১৮ মার্চ স্ট্রোক করেন আফসানা। দ্রুতই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তাকে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সকালে আফসানার মৃত্যুর খবরে স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে এলে সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আফসানার ফুফাতো ভাই খন্দকার রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, ছেলেটি (মাহি) একা হয়ে গেল। সে একেবারে চুপ হয়ে গেছে। সে কান্না করছে না। কাঁদলে হয়তো তার মন হালকা হতো। আবিদের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তার স্ত্রী আফসানাও কাঁদেননি। শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। তখন মাহি তার মায়ের পাশেই ছিল। আর বাবা-মাকে হারিয়ে এখন ছেলেও কাঁদছে না। মাহিকে নিয়েই এখন যত চিন্তা।

এদিকে শুক্রবার বিকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে আফসানাকে তার স্বামী আবিদের পাশেই কবর দেয়া হয়েছে। বাদ আসর উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরের গাউছুল আজম জামে মসজিদে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

আফসানার চাচা ইয়াদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ভোরেই আমরা খবর পাই আফসানার অবস্থা আরও খারাপের দিকে। সকাল সাড়ে ৯টায় খবর পাই আফসানা মারা গেছে।

পাইলট আবিদের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, নেপালে বিমান দুর্ঘটনার খবর শুনে আফসানা বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর খবরে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। এতবড় শোক তিনি সইতে পারলেন না। ১৭ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল।

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সম্ভব সব চেষ্টাই করেছি। সকালে আফসানার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। এরপর আর করার কিছু ছিল না।

আফসানা খানমের ফুফাতো ভাই শাহিনুর ইসলাম স্বপন যুগান্তরকে বলেন, স্ট্রোক করার দিন আফসানার সঙ্গে মাহি ঘুমাচ্ছিল। সে প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। ঘুম থেকে উঠে দেখে আফসানার কোনো সাড়া নেই। তখন সে-ই চিৎকার শুরু করে। খবর পেয়ে আমরা আফসানাকে হাসপাতালে ভর্তি করি।

মায়ের মৃত্যুর খবরে বাকরুদ্ধ মাহি : দুপুরের পর আফসানার লাশ আনা হয় উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের বাসায়। তখনও মাহিকে জানানো হয়নি তার মায়ের মৃত্যুর খবর। কিছুক্ষণ পর মাহিকে তার স্বজনরা আফসানার মৃত্যুর খবর জানায়। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর খবর শুনেও তার মধ্যে দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পাননি স্বজনরা। সে একদম চুপ হয়ে যায়। ওই সময় তাকে মায়ের লাশ দেখানো হয়নি। স্বজনরা তাকে নিয়ে একটি কক্ষে বসে থাকেন, সান্ত্বনা দেন, কিন্তু তার কান্নাও আসে না, সে কোনো কথাও বলে না। বিকাল ৫টার দিকে মাহিকে তার মায়ের লাশ দেখানো হয়।

আফসানার চাচা ইয়াদ আলী যুগান্তরকে বলেন, মায়ের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে গেছে মাহি। ওকে আমরা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মাহির বয়স ১৫ বছর। সে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দেবে। পাইলট আবিদ বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের বৈমানিক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগরে। আবিদের বাবা এমএ কাশেমও ছিলেন বৈমানিক। অন্যদিকে আফসানার গ্রামের বাড়ি নাটোরে। তার বাবা কাশেম শেখ একজন চিকিৎসক। একমাত্র ছেলে মাহিকে নিয়ে আবিদ-আফসানা দম্পতি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর বাসায় থাকতেন।

স্বজনরা জানান, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এখন মাহি তার চাচা খুরশিদ মাহমুদের কাছে থাকবেন। খুরশিদ মাহমুদ একজন চিকিৎসক। তিনি পরিবার নিয়ে পল্লবীতে থাকেন। ১২ মার্চ কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজের ৭১ আরোহীর মধ্যে ৫১ জন নিহত হন। আর আহত হন ২০ জন। নিহতদের মধ্যে বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও দুজন ক্রুসহ বাংলাদেশের ২৬ জন, নেপালের ২৪ জন ও চীনের একজন। এছাড়া আহতদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি, নয় জন নেপালের ও একজন মালদ্বীপের নাগরিক।

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×