এমন ঈদ আগে কখনও দেখেনি মুসলিম বিশ্ব

  সালমান রিয়াজ ২৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারা মাস রোজার পরেই আসে সারা বছরের সেই শ্রেষ্ঠতম দিন। ঈদুল ফিতর- মুসলিম জাহানের হাজার বছরের ঐতিহ্য। মুসলমানদেরর বৃহত্তম উৎসব। শোক-দুঃখ ভুলে উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা মুসলিম বিশ্ব। পথে পথে ঘোরে চাঁদ দেখার আনন্দ। কিন্তু এবার সব এলোমেলা হয়ে গেল। করোনাভাইরাসে এবার সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। পাল্টে গেছে ঈদ উৎসবের সব রীতিনীতি। পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া, উপহার আদান-প্রদান, খাবার ভাগাভাগি, বন্ধুদের সঙ্গে চাঁদ দেখার উচ্ছ্বাস, ঈদ রাতের আনন্দ- সবকিছুই ম্লান হয়ে গেছে। ঈদের নামাজে থাকবে না আগের সেই জনসমাগম। থাকবে না ঘুম থেকে ওঠার তাড়া। দেখা মিলবে না ভাইয়ে ভাইয়ে কোলাকোলির চিত্র। উৎসবকে সামনে রেখে চাঁদরাতে বেচাকেনারও হুড়োহুড়িও এবার নেই। সব মিলিয়ে এমন ঈদ আগে কখনও দেখেনি মুসলিম বিশ্ব। শতাব্দীর সবচেয়ে নিরানন্দের ঈদ পালন করছে বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিম।

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ পুরো এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ঈদের নামাজের জন্য মুসল্লি সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় ৩০ জনেরও বেশি মানুষ নামাজে জড়ো হতে পারবে না। জামাতে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সিরিয়া, ওমান, ইরাক, তুরস্ক, জর্ডান, আলজেরিয়া, সোমালিয়া ও মিসর। মসজিদের বদলে বাসায় আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে সৌদি আরব ২৩ থেকে ২৭ মে এবং তুরস্ক ২৩ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার কারফিউ ঘোষণা করেছে। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের বেথেলহাম সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার কয়েক হাজার মসজিদে জনসমাগম হ্রাসে নজরদারি চালানো হবে। ঈদের নামাজে বেশি মানুষ হাজির হলে জরিমানাও করা হবে বলে হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। জাকার্তাভিত্তিক ইন্সটিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্ট (আইপিএসি) বলেছে, উম্মদিয়া ও নাহদালাতুল উলামাসহ বড় বড় ইসলামী সংগঠন মুসলমানদের ঘরে ইদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এটি কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। আইপিএসি হুশিয়ারি করে বলেছে, ধর্মীয় সমাবেশ ভাইরাস সংক্রমণের ‘সুপার স্প্রেডার’ হয়ে উঠতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ঈদের ছুটিতে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। জাকার্তার বাসিন্দা রিতা অমরেতা বলেন, ‘এবারের ঈদ হবে ভার্চুয়াল। আশা করছি, ঈদুল আজহায় আমরা আমাদের প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারব। মহামারীর মধ্যে সবার উচিত প্রথমে নিরাপত্তা বজায় রাখা।’ করোনার কারণে অর্থনৈতিক দুরাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে লেবানন। বৈরুতের বাসচালক মোহাম্মদ বলেন, ‘গৃহযুদ্ধের সময়ও হাতে টাকা ছিল, কেউ না খেয়ে ছিল না। এবার আমাদের কোনো ঈদ আনন্দ নেই।’ সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে বিদেশে থাকা অভিবাসী শ্রমিকরা। ইন্দোনেশিয়ান অভিবাসী ইউনিয়নের সমন্বয়ক মাজিদ সালাহ বলেন, ‘অভিবাসী শ্রমিকরা কাজ হারিয়েছে, দেশে থেকে বহু দূরে তারা একা, অসহায়। এবারের ঈদ তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে কষ্টের ঈদ। মালয়েশিয়ার অভিবাসী শ্রমিক ওয়াসিতো রয়টার্সকে বলেন, মাসের ২ হাজার ২০০ ডলার নিয়মিত বেতনও পাইনি। ধার করে চলছি। আমার স্ত্রী বাড়ি থেকে প্রতিদিন ফোন দিয়ে কাঁদে। আমাদের জীবনে এবার কোনো ঈদ নেই।’

মুসলিম দেশগুলো খুচরা বিক্রেতারা সারা বছর ধরে রমজান মাস এবং ঈদুল ফিতরের ওপর নির্ভর। বার্ষিক বিক্রয়ের এক-তৃতীয়াংশই এ সময়ে হয়ে থাকে। করোনাভাইরাসের কারণে দোকানপাট বন্ধ ও লকডাউন থাকায় এ বছর বেচাকেনা অনেকাংশে কমে গেছে। ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৯ সালের মে মাসের তুলনায় এবার মুদি দোকানের বিক্রি ২০ শতাংশ কমেছে। পোশাক, গৃহস্থালির সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের ইত্যাদির কেনাকাটা ৯০ শতাংশ কমেছে। মালয়েশিয়ায় কমেছে ৮০ শতাংশ। যদিও অনলাইন বেচাকেনা বেড়েছে। এত কিছুর পরেও এশিয়ার কিছু কিছু দেশ ‘জীবন হাতে নিয়ে’ দোকানপাট খুলেছে। কেনাকাটা চলছে হরদম। মার্কেটে বাড়ছে মানুষের ভিড়। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির একটি বাজারে শপিং করতে এসেছেন চার সন্তানের মা ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আমার সন্তানরা ঘরবন্দি। এ উৎসব তো বাচ্চাদের জন্যই!’ আফগানিস্তানের এক দোকানদার বলেন, ‘এ ভাইরাস খুবই ভয়ঙ্কর। তবু মানুষ কোয়ারেন্টিন বিধি না মেনে বাজারে আসছেন। ঈদের শপিং করতে মানুষের ভিড় বাড়ছে।’ ইন্দোনেশিয়ার সিয়ানজুর জেলার একটি মার্কেট থেকে সিতি নেশা বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত। তবুও একটি নতুন পোশাক কিনতে আমাকে বাজারে আসতে হল।’

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত