প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা

পরিস্থিতির অবনতি হলে ফের সাধারণ ছুটি

যদি দেখি ব্যাপক অবনতি ঘটছে তাহলে তো আমাদের ছুটিতে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না - জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী * লঞ্চ, বাস, মার্কেটগুলোতে গেলে মনেই হয় না দেশে একটি মহামারী আছে। কোনোখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজনে কারফিউ দেয়া যেতে পারে -প্রফেসর ডা. এবিএম আবদুল্লাহ * ‘লকডাউন’ চেয়ে ৩৩৪ বিশিষ্ট ব্যক্তির বিবৃতি

  উবায়দুল্লাহ বাদল ০৪ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আবারও ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণার চিন্তাভাবনা করবে সরকার। এজন্য আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

পাশাপাশি সাধারণ ছুটিতে অথবা ছুটি না থাকলে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি খাতের সার্বিক লাভ-ক্ষতির যাবতীয় তথ্য-উপাত্তও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দেশে করোনা মহামারী ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় পুরো দেশকে পূর্ণাঙ্গ লকডাউন করার দাবি জানিয়েছেন ৩৩৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা যদি দেখি আমাদের ব্যাপক অবনতি ঘটছে তাহলে তো আমাদের (ছুটিতে যাওয়া ছাড়া) বিকল্প কিছু থাকবে না। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেয়ার জন্যই এটা খুলে দেয়া হয়েছে। মানুষ যাতে মাস্ক পরে নিরাপদ দূরত্বে থাকে, আমরা সেটা বলছি। যখন মানুষ এটা করতে ব্যর্থ হবে এবং এটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তখন তো ঘরে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

এদিকে সাধারণ ছুটি বাড়ানো বা প্রয়োজনে কারফিউ দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি প্রফেসর ডা. এবিএম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘দিন দিন করোনা পরিস্থিতি অবনতির দিকেই যাচ্ছে। কোনোখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। লঞ্চ, বাস, মার্কেটগুলোতে গেলে মনেই হয় না দেশে এ ধরনের একটি মহামারী আছে। ছুটি তুলে নেয়ার পর রাস্তাঘাটে একজন আরেকজনের ওপর এসে পড়ছে। পরিবহন ও বাজারে গেলে মানুষ গায়ের ওপর গা দিয়ে বাজার করছে। ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও বাড়ছেই। আল্লাহ না করুন- করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সরকারকে সাধারণ ছুটির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে লকডাউন বা কারফিউ দেয়া যেতে পারে। শুধু লকডাউন দিলেই হবে না, তা জনগণকে মানাতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। মোট কথা লকডাউন বা কারফিউ কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।’

২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ৬৬ দিনের ছুটি শেষে ৩১ মে থেকে সীমিত আকারে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বন্ধ থাকা গণপরিবহনও (বাস, লঞ্চ, ট্রেন) চালু হয়। তবে কমেনি করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার।

বরং দিন দিনই বাড়ছে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনাভাইরাসবিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে বলা হয়, আরও ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৪৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৬৯৫ জন। এতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৫ হাজার ১৪০ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন আরও ৪৭০ জন। এ নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১১ হাজার ৫৯০ জনে।

সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক প্রায় একই সুরে বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শ্রমজীবী, গরিব, খেটে খাওয়া, স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন তুলে দেয়া হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে ও ভয়ংকর পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে অন্য কোনো উপায় থাকবে না।

বাধ্য হয়ে পুনরায় সাধারণ ছুটি দেয়া হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমন নীতিগত সিদ্ধান্তই রয়েছে। তারা জানান, এই সময়ে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য পরীক্ষা আরও বাড়ানো হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, ১৫ দিন সময় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আগামী এক সপ্তাহ কঠোরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। সংক্রমণের এই মাত্রা আরও বাড়লে পুনরায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে তা কার্যকর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সোমবার (১ জুন) সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছেন, ‘আমাদের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানায় পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হয় এবং তা যদি জনস্বার্থের বিপরীতে চলে যায়, তাহলে সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

তবে এ বিষয়ে অনেকটাই ভিন্নমত পোষণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এই দুই মাসে অনেকে করোনাভাইরাসের বিষয়ে সচেতন হয়েছে। সাধারণ ছুটি দিয়ে তো এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মাস্ক, গ্লাভস, সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আবারও ছুটি আসবে কিনা- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত হবে।’

মার্চ মাসের শুরুতে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী প্রথম ধরা পড়ে। পরিস্থিতি ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকলে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে সরকার।

এরপর ৭ দফায় ছুটি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ মে ছুটি শেষ হয়। দীর্ঘ ছুটির কারণে ইতোমধ্যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমেছে। কষ্টে পড়েছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাই এখনও করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না থাকলেও জীবিকা ও অর্থনৈতিক কারণে ছুটির পথ থেকে সরে এসেছে সরকার।

লকডাউনের দাবি : দেশে করোনা মহামারী ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় পুরো দেশকে পূর্ণাঙ্গ লকডাউন করার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের ৩৩৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ দাবি করেন।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরশাদ মোমেন, রোবায়েত ফেরদৌস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সায়েমা খাতুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইন্সটিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা শনাক্তের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি।’ সরকারি পর্যায়ে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মোট টেস্টের শতকরা ২০-২৫ ভাগ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত। তার মানে হল টেস্টের সংখ্যা বাড়লে রোগীর সংখ্যা নিশ্চিতভাবে আরও বেশি বাড়বে।

আমাদের টেস্টের সক্ষমতা প্রতিদিন ৩০ হাজার। অথচ এ সক্ষমতার অর্ধেকও আমরা এখনও কার্যকর করতে পারিনি। অথচ এ রকম অবস্থাতেই ৩১ মে থেকে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে’ অফিস, গণপরিবহনসহ সবকিছু খুলে দেয়া হল।

বিবৃতিতে বলা হয়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পোশাক কারখানা খুলে দিলে রোগীর সংখ্যা দ্রুতই বাড়তে থাকে। এক মাসের মধ্যে রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আবারও মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঈদ উপলক্ষে দোকানপাট, কারখানা খোলা এবং অন্যান্য ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেও রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

এখন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাই এ রকম পরিস্থিতিতে মহামারী মোকাবেলায় গঠিত ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি’ তাদের পরামর্শ ছিল আরও বেশি কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার। তাদের পরামর্শকে বিবেচনা না করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সচল করার সিদ্ধান্ত খুবই আত্মঘাতী হবে বলে আমরা মনে করছি।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত