মহাসমাবেশে জনতার ঢল

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ব্যাপক শোডাউন

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পার্টি নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের মহাসমাবেশ ঘিরে জনতার ঢল নেমেছিল রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। উৎসব-আমেজে দেশের ৬৪ জেলা থেকে লাখো মানুষ বাস-লঞ্চ-ট্রেনে আসেন মহাসমাবেশে। সকাল ১০টার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জনতার উপচে পড়া ঢেউ কাকরাইল মোড় হয়ে মৎস্য ভবন; ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সামনে থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন থেকে হাইকোর্ট ফোয়ারা হয়ে দোয়েল চত্বর দিয়ে টিএসসির মোড় পর্যন্ত তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না এদিন। এ সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের সবক’টি রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ ছিল।

আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী জাতীয় পার্টি ও সম্মিলিত জাতীয় জোটের শীর্ষ নেতারা সমাবেশে ব্যাপক শোডাউন করেছেন। সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার সে ইঙ্গিতই বহন করেছে। সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে খণ্ড খণ্ড মিছিলের ঢল নামে। এসব মিছিলে অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের সাজ-সজ্জায় ছিল সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রশংসাসূচক প্রচার-প্রচারণা। সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর হাতে বড়, মাঝারি ও ছোট আকৃতির লাঙ্গল ছিল। অনেকে হাতি-ঘোড়ায় চড়ে সমাবেশে এসেছেন। বাদ্য-বাজনার তালে নেচে-গেয়ে সমাবেশে এসেছেন ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার নেতাকর্মীরা। দৃষ্টিনন্দন ও সুসজ্জিত সমাবেশের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করে নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

এদিকে সমাবেশে যোগ দিতে শনিবার ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জাতীয় পার্টি ও জোটের শরিক দলের নেতাকর্মীরা মিছিলসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে থাকেন। সকাল ১০টার আগেই ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা উপজেলাসহ সারা দেশের নেতাকর্মীদের উপস্থিতির কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মহাসমাবেশে উদ্যানজুড়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি, ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ঢাকা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী মীর আবদুস সবুর আসুদ, ঢাকা-৬ থেকে কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, চট্টগ্রাম থেকে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি, কুমিল্লার এমপি আমির হোসেন, সিলেটের এমপি ইয়াহিয়া চৌধুরী, সম্ভাব্য প্রার্থী এটিইউ তাজ রহমান, মানিকগঞ্জ-৩ থেকে জহিরুল আলম রুবেল, রংপুর থেকে মশিউর রহমান রাঙ্গা ও মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, কিশোরগঞ্জ থেকে মুজিবুল হক চুন্নু, চট্টগ্রামের সোলায়মান আলম শেঠ, মাহজাবিন মোর্শেদসহ দলের নানা পর্যায়ের নেতারা লোকসমাগম ঘটিয়ে ব্যাপক শোডাউন করেন। এছাড়া লিয়াকত হোসেন খোকা ও বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টি, আলমগীর শিকদার লোটন ও ফখরুল আহসান শাহজাদার নেতৃত্বে জাতীয় যুব সংহতি, ইফতেখার আহসান হাসান ও মিজানুর রহমান মিরুর নেতৃত্বে জাতীয় ছাত্র সমাজ, একেএম আশরাফউজ্জামান খান ও শেখ মোহাম্মদ শান্তর নেতৃত্বে জাতীয় শ্রমিক পার্টি, সাহিদুর রহমান টেপার নেতৃত্বে জাতীয় কৃষক পার্টি বিশাল মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেয়। জোটের শরিক ইসলামী ফ্রন্টের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

সকাল সাড়ে ৯টা থেকে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১ দোহার-নবাবগঞ্জ থেকে আগত ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মী বিশাল মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করেন। মিছিলে প্রত্যেক নেতাকর্মীর হাতে ছিল এরশাদ ও সালমা ইসলামের ছবি সংবলিত পোস্টার, ব্যানার, লাঙ্গল আর গায়ে এরশাদ ও সালমা ইসলামের ছবি সংবলিত গেঞ্জি। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উৎসবমুখর পরিবেশে সালমা ইসলামের মিছিল আসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এছাড়া সালমা ইসলামের নেতৃত্বে ঢাকা জেলা জাতীয় পার্টি ও জাতীয় মহিলা পার্টির নেতাকর্মীদেরও সরব উপস্থিতি ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে।

সালমা ইসলামের পাশাপাশি মহাসমাবেশে শোডাউন করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। হাওলাদারের নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালী-১ ও জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৪ আসনের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরব উপস্থিতি ছিল। এর আগে সকাল ৯টা থেকেই শ্যামপুর কদমতলী থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বাবলার অনুসারীরা রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে সমবেত হন। নেতাকর্মীর কাঁধে লাঙ্গল, রং-বেরঙের ফেস্টুন, এরশাদ-বাবলার বিশাল আকৃতির ছবি, ব্যান্ড পার্টি, জাতীয় ও দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে বেলা ১১টায় নেতাকর্মী নিয়ে বাবলার মিছিল মুক্তাঙ্গন থেকে রওনা দেয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর ও ডেমরা (ঢাকা-৫) আসন থেকেও বিশাল একটি মিছিল নিয়ে মহাসমাবেশে যোগ দেন প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ।

এর আগে সকালে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালী-১ ও তার স্ত্রী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসরিন জাহান রত্নার নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-৬ আসন থেকে লঞ্চে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সদর ঘাটে এসে পৌঁছান। সদরঘাট থেকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মিছিলসহ সকাল ৯টার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে হাওলাদার ও তার স্ত্রীর অনুসারীরা মঞ্চের অগ্রভাগে অবস্থান নেন। এছাড়া সকাল ১০টার দিকে সোনরাগাঁয়ের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার নেতৃত্বে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর একটি মিছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে।

এদিকে মহাসমাবেশ সামনে রেখে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। এরশাদ ও রওশন এরশাদের বিশাল আকৃতির ছবি শোভা পায় উদ্যানজুড়ে। উত্তর দিকে মুখ করে লাঙ্গলের আদলে নির্মিত হয় বিশাল আকৃতির মঞ্চ। এছাড়া রাজধানীর কাকরাইল থেকে শাহবাগ ও পুরানা পল্টন থেকে প্রেস ক্লাব হয়ে মৎস্য ভবন পর্যন্ত পুরো সড়ক রং-বেরঙের পতাকা ও জাতীয় পার্টির দলীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। মহাসমাবেশ উপলক্ষে সকাল থেকে দেড়শ’ বরেণ্য শিল্পী আলাদা মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

মহাসমাবেশে ব্যাপক উপস্থিতির কারণে সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের পুরো এলাকায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি। মহাসমাবেশে বক্তব্যের সময় তিনি বলেন, আজ সমাবেশে এরশাদপ্রেমিকদের ঢল নেমেছে। এজন্য রাজধানীবাসীকে যানজটের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এ অনাকাক্সিক্ষত ভোগান্তির জন্য আমি জাতীয় পার্টির পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।

সারা দেশ থেকে আগত নেতাকর্মীর মাঝে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করে জাতীয় কৃষক পার্টি। কৃষক পার্টির সভাপতি সাইদুর রহমান টেপার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নেতাকর্মীর মাঝে হাজার হাজার বোতল খাবার পানি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণের জাতীয় পার্টির সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার উদ্যোগেও নেতাকর্মীর মাঝে খাবার পানি সরবরাহ করা হয়।

সম্মিলিত জাতীয় জোটের সমাবেশ রূপ নেয় নির্বাচনী শোডাউনে। সমাবেশে আগত মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের জনবল প্রদর্শনীর প্লাটফর্মও ছিল এটি। এদিন তারা দলীয় প্রধান এরশাদের দৃষ্টি আকর্ষণে শক্তি প্রদর্শন করেন। হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমাগম ঘটিয়ে এরশাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। বাস-লঞ্চ ভাড়া করে নেতাকর্মী নিয়ে সমাবেশে এসেছেন তারা। লক্ষ্য একটাই- এলাকার জনবল দেখিয়ে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির টিকিট নিশ্চিত করা।

গাইলেন রওশন, সুর মেলালেন শীর্ষ নেতারা : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ গান গেয়ে মঞ্চ মাতিয়েছেন। তার এ গানে গলা মেলালেন দলের শীর্ষ নেতারা। সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার একপর্যায়ে রওশন এরশাদ আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নিজেরাই সরকার গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ আবৃত্তি করে শোনান। তার পরেই বক্তব্য দেবেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তিনি মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে আসছেন। এ ফাঁকে গান ধরেন রওশন এরশাদ- ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা, নতুন করে আজ শপথ নিলাম।’ এ সময় মঞ্চে থাকা পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব রহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এমপি অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামসহ সিনিয়র নেতারাও তার সঙ্গে গান ধরেন। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু করতালি দেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×