চিকিৎসা পাচ্ছেন না সাধারণ রোগীরা

প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ, হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে রোগী নিয়ে বিপাকে স্বজনরা, সাধারণ পরীক্ষা করানোও দুষ্কর, দুর্ভোগের শেষ নেই, চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাচ্ছেন অনেকে * ডাক্তার ও হাসপাতাল মালিকদের এমন আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তদন্ত ও বিচার দাবি ভুক্তভোগীদের * সরকারি নির্দেশনা আছে একাধিক, হুশিয়ারি উচ্চারণ করে মন্ত্রীরাও বক্তব্য দিচ্ছেন; কিন্তু বাস্তবায়ন নেই * সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে -স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ টেস্টের রিপোর্ট সঙ্গে না থাকায় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া, রাস্তায় অজানা গন্তব্যে ঠেলে দেয়া, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার ঘটনা এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কোভিড হাসপাতালগুলো কোভিড টেস্টের পজিটিভ রিপোর্ট ছাড়া লক্ষণ ও উপসর্গ আছে এমন রোগীদেরও ফিরিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে নন-কোভিড হাসপাতালগুলো কোভিড টেস্টেও নেগেটিভ রিপোর্ট ছাড়া সাধারণ রোগীদের সেবা দিচ্ছে না।

অথচ এর আগে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর থেকে সব ধরনের রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে কোনো নির্দেশনা কাজে আসছে না। ভাবখানা এমন যে, সাধারণ রোগীদের সেবা না দিলেও তাদের কোনো রকম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না।

এমনটা বুঝেই হাসপাতালগুলো নিজেদের সুবিধামতো সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ওদিকে ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বারও বন্ধ। দীর্ঘদিনের পরিচিত রোগীরাও ফোন করে তাদের সেবা নিতে পারছেন না। অনেক হাসপাতাল থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুঠোফোন আলাপেই রোগীদের হাসপাতালে আসতে নিষেধ করছেন।

ভুক্তভোগীদের বিস্তর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার যুগান্তরের কয়েকজন প্রতিবেদক রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এমন সব চিত্রই দেখতে পান। গুরুতর ও মুমূর্ষু রোগীদের স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু ভর্তি করানো তো দূরের কথা, অনেকে সেখানে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে কয়েকজন ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, দেশে সরকার আছে, সরকারের আইনকানুনও আছে; অথচ হাসপাতালগুলো সরকারের নির্দেশনা মানছে না। তাহলে তাদের হাসপাতাল চালানোর লাইসেন্স কেন বহাল আছে?

এ ছাড়া যেসব ডাক্তার মানবসেবার ব্রত নিয়ে এ পেশায় নাম লিখিয়েছেন, তারা কেন এমন আচরণ করছেন। অবশ্যই সব ডাক্তার এমন নন। অনেকে জীবনের ঝুঁকি চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা চিকিৎসক মারাও গেছেন। তাদের অবদানের কথা কেউ ভুলবে না। কিন্তু যারা এর বিপরীতে আছেন তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

তারা বলেন, দেশজুড়ে করোনাবহির্ভূত লাখ লাখ রোগী রয়েছেন। যাদের অনেকের অবস্থা এতটা গুরুতর যে, শুধু ডাক্তারের সঙ্গে ফোনালাপ করে ওষুধ দেয়া সম্ভব না। অনেকের জরুরি অপারেশন করার বিষয় রয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা হল, এসব বিষয় নিশ্চিত করার কার্যত যেন কেউ নেই।

তারা আরও বলেন, যেসব নামি-দামি বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল শুরু থেকেই গলাকাটা ব্যবসা করে রোগীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছে, তাদের নিঃশ্চুপ ভূমিকা নিয়েও কেউ কিছু বলছে না। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও জরুরি টেস্ট করাতে পারছেন না। অনেক বিখ্যাত ডাক্তারও প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখছেন না। কিন্তু কেন? ডাক্তার শতভাগ সুরক্ষা নিয়ে রোগী দেখলে সমস্যা কোথায়?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব মিলিয়ে নন-কোভিড বা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বিশেষত হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, পক্ষাঘাত, হাঁপানি-শ্বাসকষ্ট, লিভার, কিডনি, দাঁত ও চোখের রোগ, নিয়ে যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগব্যাধিতে ভুগছেন-তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়েছে। গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও শিশুদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকিটা বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় মানুষকে সেবা দেয়ার জন্য, মানুষকে সেবা না দিয়ে হাসপাতাল যদি হাত গুটিয়ে নেয়, সেটিকে তখন আর হাসপাতাল বলা যায় না। রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যাচ্ছেন; কিন্তু হাসপাতাল ভর্তি নিচ্ছে না। এমনকি গর্ভবতী মায়েদের প্রসবব্যথা ওঠার পর হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেয়ার মতো চরম অমানবিক ঘটনা ঘটেছে।

রোগীর স্বজন, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, অনেক অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন; কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চিকিৎসার জন্য কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরেও যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় মারা গেছে। নারায়ণগঞ্জে নয় মাসের একজন গর্ভবতী নারী বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে অটোরিকশায়ই মারা গেছেন। বাংলাদেশ সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি ৯ মে ঢাকার প্রায় সব নামি-দামি হাসপাতালে ঘুরেও যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পর মারা যান।

সিলেটে একজন মুমূর্ষু রোগীকে ভর্তি করানোর জন্য তার স্বজনরা একে একে ৬টি প্রাইভেট হাসপাতালে গেছেন; কিন্তু তাকে কোনো হাসপাতাল ভর্তি নেয়নি। একপর্যায়ে সেই রোগী অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এ রকম আরও অনেক ঘটনার খবর প্রায় প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এগুলো শুধু দুঃখজনক ঘটনা নয়, চরম আচরণ। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করা উচিত।

‘চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।

মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে রাজধানীতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।

হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যারা এ সময়ে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে পিছ-পা হচ্ছে এবং তাদের অবহেলার কারণে রোগীরা মৃত্যুবরণ করছে, তারা আসলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করছে। এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এগুলো পর্যবেক্ষণ করছে, ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, কেউ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে অবহেলা করলে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখনও হুশিয়ারির মাধ্যমে তাদের সেবামুখী করার চেষ্টা করা হলেও অবহেলার ঘটনা ক্রমাগত ঘটতে থাকলে অতি শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর দফতর সম্পাদক অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন করোনা রোগী শনাক্তের হার সুস্থ হওয়ার তুলনার প্রায় তিন গুণ। এর মধ্যে সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

দিন দিন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তির চাপ বাড়তে থাকায় এবং ঢাকার প্রায় সব কোভিড হাসপাতালের বিছানায় রোগী ভর্তি থাকায় নতুন করে রোগীদের জায়গা সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে অন্যান্য হাসপাতালে কোভিড, নন-কোভিড জোনে ভাগ করে করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন আইসোলেশন সেন্টার খোলা এবং ঢাকার বাইরেও কোভিড রোগী ভর্তি করানোর জন্যে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হবে।

অধ্যাপক শহীদ উল্লাহ বলেন, যে হারে করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে, এভাবে বাড়তে থাকলে প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক লকডাউন মেনে চলতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। বাস স্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেল স্টেশন, বিমানবন্দরে যাত্রীদের মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি যাত্রীদের আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ সমস্যার সমাধানে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে কোভিড-১৯ এবং অন্য সব ধরনের রোগীকে আলাদা ইউনিটে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে চিঠি দেয়া হয়েছে। একইভাবে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের সংগঠনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।

ঈদুল ফিতরের আগের দিন রোববার (২৪ মে) স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, “স্বাস্থ্য অধিদফতরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দেশের কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছেন। তারা ‘কোভিড-১৯’ এবং ‘নন-কোভিড’ রোগীদের একই হাসপাতালের ভিন্ন ভিন্ন অংশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রস্তাব অনুযায়ী কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৫০ শয্যা ও তার বেশি শয্যা বিশিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেয়া হল।”

এর আগে ৩০ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানান, সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীকে সরাসরি ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। সন্দেহভাজন করোনা রোগী মনে হলে তা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানাতে হবে।

বিবৃতিতে জানানো হয়, সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালে কোনো রোগী করোনা রোগে আক্রান্ত মনে হলে বা কোনো কারণে রোগীকে সেবা দেয়া না গেলে সেক্ষেত্রে রোগী থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা সমন্বি^ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নাম্ব^ারে ফোন করে পরামর্শ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হল।

কোভিড-১৯ টেস্টের রিপোর্ট সঙ্গে না থাকায় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া, রাস্তায় অজানা গন্তব্যে ঠেলে দেয়া, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। নেতৃদ্বয় চিকিৎসাসেবা খাতের এ অমানবিক দশা এবং অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা অবিলম্বে দূর করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে অন্য রোগীর চিকিৎসা কম গুরুত্ব পায়। তাই যে কোনো মহামারী মোকাবেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিভাগ বা জেলা পর্যায়ে মহামারী হাসপাতাল স্থাপন করা যায় কিনা সে বিষয়ে গবেষণানির্ভর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার অধিদফতরে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে রাজধানীর সব সরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। সব ধরনের রোগীর সেবা নিশ্চিতে সেখানে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। স্বল্প সময়ে সব বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

টেলিফোনেই রোগী ফেরত : মঙ্গলবার বেলা আড়াইটা থেকে বিকাল সোয়া ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর প্রথমসারির একটি বেসরকারি হাসপাতালে অবস্থান করে রোগী-স্বজনদের ভোগান্তির নতুন এক চিত্র ফুটে ওঠে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী বা রোগীর স্বজনদের হাসপাতালে আসতে বারণ করা হচ্ছে টেলিফোনে।

কেউ যদি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেয়ার জন্য ফোন করেন তাহলে তাকে আইসিইউ সাপোর্ট না থাকার কারণ দেখিয়ে হাসপাতালে আসতে নিষেধ করা হচ্ছে। আরও কয়েকটি নামিদামি হাসপাতাল ঘুরে আমাদের প্রতিনিধিরা এ রকম নানা তথ্যের সন্ধান পান। তবে কোনো রকম রোগী ভোগান্তির অভিযোগ মানতে নারাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বরং তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।

অনেক হাসপাতাল তাদের কর্মীদের নিয়মিত বেতন সংকুলান করতে পারছে না। রোগীদের নানা রকম অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন ও বিজনেজ ডেভেলপমেন্ট শাখার প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার যুগান্তরকে বলেন, করোনা ভয়ে অন্যান্য জটিল রোগীরাও এখন হাসপাতালে আসছেন না। আগে প্রতিদিন এখানে গড়ে ১০০ রোগীর ডায়ালাইসিস হতো। এখন এ সংখ্যা কমে গেছে। ক্যান্সার রোগীদের রেডিয়েশন, কেমোথেরাপিও কমে গেছে। কোনো কোনো হাসপাতালে এসব বন্ধই হয়ে গেছে।

ঠাণ্ডা সমস্যা থাকলেই সেবাবঞ্চিত : রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে সামান্যতম ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা থাকলেই সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। এছাড়া রোগীদের করোনা (কভিড-১৯) টেস্ট না করা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি নেয়া হচ্ছে না।

এতে চরম বিপাকে পড়ছে দূরদূরান্ত থেকে জটিল সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হওয়া রোগীসাধারণ। এ কারণে ৯শ’ শয্যার হাসপাতালটির বেশির ভাগ শয্যাই খালি পড়ে থাকছে।

জানা গেছে, লকডাউন শিথিল হওয়ার পর থেকে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় অস্ত্রোপচারসহ জটিল সমস্যা নিয়ে বহু রোগী এ হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু কারও ঠাণ্ডাজনিত সামান্য সমস্যা থাকলেই ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কাউকে কোভিড-১৯ টেস্ট করা ছাড়া ভর্তি করা হচ্ছে না। আবার করোনা টেস্টের জন্য দালালদের ১ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অন্যথায় দিনের পর দিন ঘুরেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না ওইসব রোগী। এদিকে হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা প্রায়ই রোগীদের করোনা ভয়ে সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে।

হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত করোনা প্রতিরোধ সরঞ্জাম সরবরাহ থাকার পরও তারা রোগীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে। এ অবস্থায় হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগী সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে।

জ্বর হলে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয় : রাজধানীর তুরাগে ৩০টি গ্রামের মধ্যে প্রায় দুই লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস তুরাগে। অথচ এ এলাকায় রয়েছে একটি মাত্র সরকারি হাসপাতাল। জরুরি রোগীর সেবা দিতে হলে বেসরকারি হলে উত্তরায় এবং সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে হলে টঙ্গী আসতে হয়। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ রোগীরা সেবা পাওয়া নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। রোগী নিয়ে হাসপাতাল গেট পর্যন্ত গেলেই পালিয়ে যায় কর্তৃপক্ষ। অনেক হাসপাতালের মূল গেট বন্ধ থাকে। পরিচিত লোক ছাড়া গেট খুলে না।

টঙ্গী ইজতেমা মাঠ এলাকার হাজী মো. মনির যুগান্তরকে জানায়, ‘২৮ মে আমার স্ত্রীর প্রসব যন্ত্রণা হলে প্রথমে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে ঢুকতে দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে ৩/৪টি হাসপাতাল ঘুরে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চুক্তি হিসেবে ভর্তি করানো হয়। সন্তান হওয়ার পর জ্বর হলে ওই হাসপাতাল থেকেও বের করে দেয়। পরের দিন টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানেও বেশিক্ষণ ঠাঁই হয়নি। উন্নত চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দিয়ে রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলেন হাসপাতালের চিকিৎসক। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন হাজী মো. মনির। কিন্তু তিনি ভর্তি করাতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ্ মাস্টার ২৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. পারভেজ আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘আমাদের সাতজন ডাক্তার কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত আছে। হাসপাতালের স্টাফসহ নার্সরাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তাই বেশি জরুরি রোগী ছাড়া অন্যদের ভর্তি করানো হচ্ছে না।’

গৃহিণী ও বৃদ্ধার ভোগান্তি : গৃহিণী রোকেয়া বেগম চিৎকার করে বলছিল, তার কোনো জটিল রোগ নেই। আইসক্রিম খাওয়ার পর ঠাণ্ডা লেগেছে। তাই গলাব্যথা। করোনার ভয়ভীতির মধ্যেও চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও ডাক্তার দেখাতে পারেননি। ঘটনা দু’দিন আগের। বিষয়টি যুগান্তরের কাছে ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন তিনি। এ রকম বহু অভিযোগ রয়েছে সাধারণ রোগীদের।

তবে এ বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন জানান, এমন অভিযোগ যথাযথ নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে করোনাভাইরাসের এ সময়ে সেবার পদ্ধতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাল্টিয়েছে।

যারা বলছে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও ডাক্তার দেখাতে পারছেন না, কিংবা চিকিৎসা পাচ্ছেন না- এমন অভিযোগ অনেকাংশে সত্য নয়। রোগীদের ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চিকিৎসা পেতে এগোতে হবে। মনে রাখতে হবে, বর্তমানে ডাক্তারসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বরত সময়টুকু শতভাগ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। এ সময়ে নিরাপত্তা সামগ্রী পরে পুরো সময়টুকু রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। হয়তো আগের মতো গতি নেই, সেটাই ডাক্তার রোগীদের কল্যাণেই হচ্ছে। যেসব রোগী ধৈর্য করে চিকিৎসা নিতে পারছেন না, তাদের কেউ কেউ হয়তো এমন অভিযোগ করছেন।

অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর থেকে আসা বৃদ্ধ এক নারী হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আনা হয়। কিন্তু ৩/৪টি বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরেও তাকে ভর্তি করানো যায়নি। একপর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে তাকে সরকারি হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ঘটনাটি ৩/৪ দিন আগের। ভুক্তভোগী বৃদ্ধার নাতনি জুয়েল হায়দার যুগান্তরকে জানান, করোনার এ সময়ে নিশ্চয় সবাই করোনা রোগী নয়। কিন্তু যে হাসপাতালেই তারা গেছেন, সাফ বলে দিয়েছেন চিকিৎসা হবে না।

করোনা আতঙ্কে ডেমরায় চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন জ্বর-কাশির রোগীরা।

সাধারণ জ্বর-কাশিতেও চিকিৎসা মিলছে না : রাজধানীর ডেমরা এলাকায় করোনাভাইরাস আতঙ্কে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে না বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালগুলোয় এ ধরনের রোগী এলেই টালবাহানা শুরু করছেন কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ডাক্তার সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে রোগীদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।

কোনাপাড়া এলাকায় ঠাণ্ডা, হালকা জ্বর ও কাশির উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা বড়ভাঙ্গা এলাকায় বসবাসরত প্রফেসর হারুন-অর-রশিদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এ সময়টায় গরম-ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছরই জ্বর, ঠাণ্ডা, সর্দি হয়। কিন্তু করোনার ভয়ে কোনো হাসপাতালেই ডাক্তার দেখাতে পারছি না।’

আনজুম আরা নামে এক রোগী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা থাকি ডগাইর এলাকায়। কয়েকটি হাসপাতাল কোনাপাড়ায় রয়েছে বলে ছোট দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সেখানে যাই জ্বর ও কাশির ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু হাসপাতালগুলোয় দেখাতে পারেনি।’

মিরপুরে ভোগান্তি বেশি : রাজধানীর মিরপুরে করোনার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা নিয়ে বেশ ভোগান্তিতে রয়েছেন এখানকার বাসিন্দারা। করোনার প্রভাব পড়েছে এখানকার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয়। ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা যেন দুরূহ হয়ে পড়েছে। সাধারণ রোগীরাও হাসপাতালে গেলে কোনো ধরনের চেকআপ ছাড়াই তাদের সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে মিরপুর ১২ নম্বরের স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী মীর আলাউদ্দিন তীব্র পেট ব্যথা নিয়ে বাসার অদূরে কিংস্টন হাসপাতালে গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা না বলেই হাসপাতালের গেটে দায়িত্বরত লোকজন তাকে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত