রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক লকডাউন শুরু

আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে * ১৪ থেকে ২১ দিনের জন্য লকডাউন হবে নির্দিষ্ট এলাকা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে আজ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এলাকাভিত্তিক লকডাউন শুরু হচ্ছে। করোনার সংক্রমণ বেশি এমন এলাকাগুলো রেড জোন ঘোষণার মাধ্যমে অবরুদ্ধ করা হবে। উদ্যোগটি সফলে কার্যকর ভূমিকা রাখবে স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ও এটুআই শাখা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) তথ্য সরবরাহ করবে।

এদিকে সারা দেশে করোনা আক্রান্ত এলাকাকে তিন জোনে ভাগ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আজ প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হবে। এজন্য শনিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে শিগগিরই তাতে সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি শনিবার যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘করোনা আক্রান্ত হারের ওপর ভিত্তি করে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে এলাকা ভাগ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করেছি। এ বিষয়ে একটি তালিকা করে কিছু প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। রোববার প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে। তিনি আরও বিশ্লেষণ করে সংযোজন বা বিয়োজনের সিদ্ধান্ত দেবেন। অথবা প্রস্তাব যাচাই করতে আরও সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। পুরো বিষয়টিই প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তার সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।’

প্রজ্ঞাপন জারির আগেই পরীক্ষামূলকভাবে আজ থেকে ঢাকায় এলাকাভিত্তিক এটি শুরু হচ্ছে। এর আগে কক্সবাজারে লকডাউন শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ও করোনা সংক্রান্ত মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মো. হাবিবুর রহমান খান যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন এলাকা রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করার জন্য অ্যাপ করা হয়েছে। রোববারনাগাদ ঢাকা শহরের কিছু এলাকায় রেড জোনে লকডাউনের মাধ্যমে পাইলটিং শুরু হবে। আশা করছি, সারা দেশে আগামী বুধবারের মধ্যে জোনিংয়ের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেড জোন পুরোপুরি কঠোর লকডাউনের আওতায় থাকবে। এ জোনের মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ যেসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি সেখানে এলাকাভিত্তিক লকডাউন করা হবে। আর ইয়েলো ও গ্রিন জোনে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে তালিকাভুক্ত করা হবে। মূলত সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিদিন আক্রান্ত ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর চিহ্নিত করে করোনা মানচিত্র আপডেট করা হবে। আক্রান্তের ঘনত্ব অনুযায়ী এ মানচিত্র হবে তিন ধরনের- রেড, ইয়েলো ও গ্রিন।

প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় যা আছে : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যে মানচিত্রের চিহ্নিত রেড জোন এলাকাগুলোতে লকডাউন কার্যকর করা হবে। নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য যেমন- ১৪ থেকে ২১ দিন লকডাউন করা হবে। এসব এলাকায় আরোপ করা হবে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি। এই এলাকা থেকে কাউকে অবাধে চলাচল করতে দেয়া হবে না। রেড জোনে শুধু ফার্মেসি, হাসপাতাল, নিত্যপণ্যের দোকান খোলা থাকবে। কাঁচাবাজার, রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, শপিংমলসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাসেবক টিমের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কাজ করবে। আক্রান্ত রোগীকে আইসোলেশনে রাখা এবং আক্রান্ত রোগীর পরিবারকে কোয়ারেন্টিনে রাখাও নিশ্চিত করা হবে। রেড জোনে জনসমাগম রুখতে কাঁচাবাজার বন্ধ রেখে ভ্রাম্যমাণ ভ্যান ও মাথায় ঝাকা নিয়ে চলা ফেরিওয়ালাদের পণ্য বিক্রি করতে দেয়া হবে। লকডাউন নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তার জন্য পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক মনিটরিং কমিটি করা হবে। রেড জোনে থাকা কেউ যাতে ওই এলাকার বাইরে যেতে না পারে এবং বাইরের লোকজন যাতে সেখানে ঢুকতে না পারে তার জন্য সংশ্লিষ্ট পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নেবে। বড় ধরনের প্রয়োজন ছাড়া ওই এলাকা থেকে কেউ বের হতে বা ঢুকতে পারবে না।

আর ইয়েলো জোনে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে। পুরো এলাকা লকডাউন না করে করোনা আক্রান্ত রোগীদের বাড়ি লকডাউন নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্যবিধি কড়াভাবে পালন করতে হবে বাসিন্দাদের। যেকোনো ধরনের জনসমাগম রোধে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বা ওয়ার্ড কমিটি পর্যায়ক্রমে টহল দেবে। কোনো বিষয় তাদের আয়ত্তের বাইরে থাকলে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করবে। প্রয়োজনীয় জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এখানে ফার্মেসি, হাসপাতাল ও কাঁচাবাজার খোলা থাকলেও অন্য সব বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে আক্রান্ত রোগীর বাড়ি লকডাউন নিশ্চিত করা হবে।

এছাড়া গ্রিন জোনে কিছু বিষয়ে কঠোরতা বজায় রাখা হবে। করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী এই এলাকায় যাতে ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হবে। এখানে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখা হবে; যাতে ওই এলাকার কেউ আক্রান্ত না হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ক্রমাবনতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ১ জুন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা সভায় বসেন। ওই সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনা সংক্রমণের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করার কথা জানান।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার কোনো এলাকায় প্রতি এক লাখে যদি ৪০ জন বা এর বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত থাকে তবে সেটাকে রেড জোন বলা হবে। ৩ জনের বেশি কিন্তু ৪০ জনের কম থাকলে তবে সেই এলাকাকে ইয়েলো জোন বলা হবে। এক বা দু’জন বা কেউ না থাকলে সেটাকে গ্রিন জোন বলা হবে। তবে জোন ঘোষণার ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রেড জোন ঘোষণার ক্ষেত্রে এক লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ২০, ৩০ ও ৪০- তিন ধরনেরই মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরও জানা গেছে, অ্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করা থাকবে কোন এলাকা রেড জোন, কোন এলাকা ইয়েলো জোন এবং কোনটি গ্রিন জোন। আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে গেলে, রেড জোন পর্যায়ক্রমে ইয়েলো ও গ্রিন হবে। প্রযুক্তিগত সহায়তার কাজটি করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ও এটুআই। আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) তথ্য সরবরাহ করবে। প্রসঙ্গত, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেই টানা ৬৬ দিনের ছুটি শেষে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন নির্দেশনা মানাসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে সরকারি-বেসরকারি অফিস খুলে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বন্ধ থাকা গণপরিবহনও (বাস, লঞ্চ, ট্রেন) চালু হয়েছে।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত