আতঙ্কে বাসায় মজুদ

অক্সিজেনের কৃত্রিম সংকট

চাহিদা মেটাতে ভেজাল অক্সিজেন বাজারে * দেশে প্রায় ৭শ’ সিলিন্ডারের ২শ’ বাসাবাড়িতে মজুদ * বাসায় সিলিন্ডার ব্যবহারে ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা

  রাশেদ রাব্বি ২২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাবে না এ অজুহাতে বাসাবাড়িতে দুই শতাধিক সিলিন্ডার কিনে রাখছেন রোগীর স্বজনরা।

আরও প্রায় শতাধিক সিলিন্ডার সরিয়ে রাখা হয়েছে। সারা দেশে ১৪শ’ লিটারের ৭শ’ সিলিন্ডারের মধ্যে ৪শ’টি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে। রোগীর স্বজনরা অক্সিজেন সংগ্রহে রাখতে মরিয়া। তারা ছুটছেন অক্সিজেনের সন্ধানে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না।

এদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ভেজাল অক্সিজেন সরবরাহ হচ্ছে। উৎপাদন বা বাজারজাতকারী কিছু প্রতিষ্ঠান ভেজাল অক্সিজেন বিক্রি শুরু করেছে। সেগুলো মূলত গ্যাসীয় অক্সিজেন।

এছাড়া এতে কার্বন-মনোঅক্সাইডসহ আরও কিছু গ্যাস এবং জলীয় বাষ্প মিশ্রিত থাকে; যা ইনহেলেবল বলে স্বীকৃত নয়। এসব ব্যবহারে রোগী বা স্বজনরা জটিলতায় পড়তে পারেন।

ভেজাল মেশানো অক্সিজেনে রোগীর শ্বাসকষ্ট দূর হওয়ার চেয়ে মারাত্মক ক্ষতিসহ মৃত্যুও হতে পারে। এমনকি এসব সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হওয়ার শঙ্কা অনেক বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসায় সর্বাধিক কার্যকর হচ্ছে অক্সিজেন থেরাপি। রোগীর শ্বাসকষ্ট নিরাময়ের জন্য অনেকেই ১৪০০ লিটার ধারণক্ষম এক বা একাধিক সিলিন্ডার মজুদ করে রেখেছেন।

কিন্তু এদের প্রায় কেউই জানে না এ অক্সিজেন দিয়ে করোনা রোগীর শ্বাসকষ্ট নিরাময় সম্ভব নয়। কারণ এ সিলিন্ডার থেকে হাইফ্লো অক্সিজেন পাওয়া সম্ভব নয়। করোনা রোগীর জন্য প্রয়োজন হাইফ্লো অক্সিজেন।

এসব সিলিন্ডার থেকে দিনে যদি প্রতি মিনিটে কমপক্ষে ৬ লিটার (যা হাইফ্লো নিশ্চিত করে না) অক্সিজেন রোগীকে দেয়া হয়, তবে প্রতি ৪ ঘণ্টা পরপর তা রিফিল করতে হবে। এজন্য সারাদিনে কতবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করতে হবে, তার কোনো হিসাব নেই।

তারা বলেন, গ্যাসীয় অক্সিজেন হাইফ্লো অক্সিজেনের ভালো সমাধান হতে পারে না। এক্ষেত্রে লিকুইড বা ক্রায়োজেনিক অক্সিজেনই একমাত্র সমাধান। আর সেটি করতে প্রয়োজন ভ্যাকুয়াম ইনসুলেটেড ইভাপোরেটর বা ভিআই। এটি স্থাপনে সর্বসাকুল্যে খরচ পড়ে ৫০ লাখ টাকা।

একেকটি ভিআই’র ধারণক্ষমতা হয় ১০ হাজার লিটার। ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে এসব লিকুইড অক্সিজেন সহজেই সরবরাহ করা সম্ভব। তারা বলেন, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাতেই করোনা আক্রান্তদের শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে হাইফ্লো অক্সিজেন ব্যবহার সম্ভব, বাসাবাড়িতে নয়।

রোগীর শ্বাসকষ্ট চরমে উঠলে কার্যকর চিকিৎসা হচ্ছে হাইফ্লো অক্সিজেন। প্রতি মিনিটে ৩০-৪০ লিটার অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়।

শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে হাসপাতালের আইসিইউতে সিপাপ ও ভিপাপের (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার মেশিন/ভ্যারিয়েবল পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার মেশিন) প্রয়োজন হয়। সিপাপ বা ভিপাপ এ দুটো আবার রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

যেমন সিপাপ কেবল রোগীর শ্বাস নেয়ার সময় অক্সিজেন সরবরাহ করে। অন্যদিকে ভিপাপ শ্বাস নেয়া এবং ছাড়া উভয় অবস্থাতেই অক্সিজেন দেয়া হয়। সিপাপ লাগবে নাকি ভিপাপ লাগবে তা নিরাময়কারী চিকিৎসক নির্ধারণ করে থাকেন। এগুলো কোনোভাবেই বাসায় করা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাত্র তিনটি অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের দৈনিক মোট উৎপাদন সাড়ে ৩ লাখ লিটার। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন উৎপাদন ২ লাখ লিটার, একটির ৯০ হাজার লিটার এবং অন্যটির ৬০ হাজার লিটার।

উৎপাদিত এসব লিকুইড অক্সিজেন সিলিন্ডারের মাধ্যমে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু না বুঝেই অনেকে বাড়িতে অক্সিজেন মজুদ করায় সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। দেশে ১৪শ’ লিটারের ৭শ’ সিলিন্ডার আছে।

ইতোমধ্যে এ ধরনের (১৪শ’ লিটারের) দুই শতাধিক সিলিন্ডার বাসাবাড়িতে মজুদ করা হয়েছে। আরও অনেকেই মজুদের চেষ্টা করছেন। এ সংকট মেটাতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে আমদানি শুরু করেছে। তবে এ হারে মজুদ করা হলে আমদানি করেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে।

অক্সিজেন সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার এ সংকট মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভাইরোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৪শ’ লিটারের মেডিকেল সিলিন্ডার অনেকেই বাসায় কিনে রেখেছেন।

তাদের প্রয়োজনের সময় সরবরাহ অথবা পরে ফেরত দেয়ার শর্তে সরকার রিকুইজিশন করে এগুলো হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারে।

এগুলো একসঙ্গে রিফিল করে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে রাখার পরামর্শ দেন। ৬৮০০ বা ৭০০০ লিটার ধারণক্ষম মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডারই হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এগুলোই মূলত মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার।

এসব কেবল হাসপাতালেই মজুদ রাখা সম্ভব; যা হাইফ্লো অক্সিজেন নিশ্চিত করবে। অনেক প্রাইভেট হাসপাতালে এ ধরনের সিলিন্ডারের অতিরিক্ত মজুদ আছে, যা ব্যবহার হচ্ছে না।

সেগুলো করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, সাধারণত স্টিল মিলসমূহে অক্সিজেন উৎপাদনের স্থাপনা যুক্ত থাকে, যারা প্রতিনিয়ত গ্যাসীয় অক্সিজেন উৎপাদন করে।

মেডিকেল সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করা গেলে আপৎকালে সেসব অক্সিজেনও বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এছাড়া শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুই শতাধিক ৯৪০০ লিটার ধারণক্ষম অক্সিজেন সিলিন্ডার পড়ে আছে। সরকার এ সিলিন্ডারগুলো আপৎকালীন রিকুইজিশন বা নির্ধারিত মূল্যে কিনতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা মূল্য বাড়ানোর সুযোগ পাবে না এবং কোনো কৃত্রিম সংকটও হবে না।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে অক্সিজেনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে অনেক মানুষ সিলিন্ডার কিনে বাসায় রাখায় কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এ সময় চাইলেই হাসপাতালগুলোতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন স্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে যেন সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত