স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি

জড়িতদের শনাক্তে দুদক কঠোর অবস্থানে

স্বাস্থ্যসামগ্রী ক্রয়ের সমুদয় নথি তলব করে মন্ত্রণালয়সহ তিন সংস্থায় চিঠি * ২৪৮২ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে সব রেকর্ড তলব * আমলে নেয়া হয়েছে ঔষধ প্রশাসনের সাবেক পরিচালকের চিঠি * ছাড় পাচ্ছেন না জড়িত রাঘববোয়ালরাও * কেনাকাটার নামে কারা লোপাট করছে তাদের বিষয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে তথ্য

  মিজান মালিক ২২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

স্বাস্থ্য খাতের লাগামহীন দুর্নীতি খুঁজে বের করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুদক। সংস্থাটির গোয়েন্দা সেলের পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের অনুসন্ধান টিম এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে।

দুর্নীতির অনুসন্ধানে রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ তিন সংস্থায় তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদকের এ টিমকে কমিশন থেকে অতিরিক্ত কিছু ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে।

প্রমাণ পেলে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের তারা গ্রেফতার করতে পারবে। এ টিমের কাজ সরাসরি তদারকি করছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। স্বাস্থ্য খাতের করুণ দশার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে তিনি অনুসন্ধান টিমকে বেশ কিছু পরামর্শও দিচ্ছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা এবার দৃশ্যমান কিছু করতে চাই। আগে কি হয়েছে, কি হয়নি সে আলোচনার সময় নেই। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা দেখার পর আর বসে থাকতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি দমনে দুদক কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। রেজাল্ট হাতে নিয়ে ফিরবে আমাদের টিম।

এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, মাস্ক-পিপিইসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসামগ্রী ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ তিন সংস্থায় জরুরি চিঠি দিয়েছে দুদক।

রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালকের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। দুদক পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর টিমের পক্ষ থেকে ‘অতীব জরুরি পত্র’টি বিশেষ বাহকের মাধ্যমে পাঠানো হয়।

৩০ জুনের সব তথ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। কেউ যদি তথ্য দিয়ে সহায়তা না করে বা গড়িমসি করে তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগে মামলা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কমিশন।

২০০৪ সালের দুদক আইন ও ২০০৭ এবং ২০১৯ সালের বিধিমালা অনুসরণ করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

দুদক পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য যুগান্তরকে জানান, করোনাসামগ্রী পিপিই, মাস্ক ক্রয়ে দুর্নীতি অনুসন্ধানে টিম গঠিত হলেও ওই টিম স্বাস্থ্য খাতের রুগ্ন রূপটাও খুঁজে বের করে জড়িতদের বিষয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে।

টিমের প্রধান মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর স্বাক্ষরে তথ্য ও রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয় বলে তিনি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন। ৩০ জুনের মধ্যে চাহিত তথ্য ও রেকর্ডপত্র সরবরাহের জন্য চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে- কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামাদি/যন্ত্রপাতি (মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ যন্ত্রপাতি, ভেন্টিলেটর, পিসিআর মেশিন, কোভিড টেস্ট কিট ও অন্যান্য) ক্রয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলোর নাম, বরাদ্দকৃত ও ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ এবং বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়া হয়। আর এ প্রতিষ্ঠানগুলো হল- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ঔষধাগার।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, দুদকের চিঠিতে অনেক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্যও চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৬ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে যেসব চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে তাদের নাম, পদবি, বর্তমান কর্মস্থল, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, মোবাইল ফোন নম্বরসহ তথ্য দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালকের কাছেও বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক রেকর্ড তলব করে দুদক।

দুদক অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরে বলেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার নিমিত্ত নিুমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

তাদের বিষয়ে দুদকের নথিতে রক্ষিত অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে চিঠিতে বলা হয়।

এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা যেসব সংস্থার কাছে তথ্য চেয়েছি, আশা করছি সবাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব তথ্য ও রেকর্ডপত্র দিয়ে দুদককে সহায়তা করবেন। দুদক একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের মাধ্যমে অপরাধ এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করতে চায়। অপরাধী যেই হন না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি, এসব অনিয়ম মেনে নেব না। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা যারা বিনষ্ট করেছেন তাদের খুঁজে বের করা হবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধীদের সামাজিক, পেশাগত বা অন্য কোনো পরিচয় কমিশন ন্যূনতম গুরুত্ব দেবে না। অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা হবেই।

যেসব রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে : ১. কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গৃহীত ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডামিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ডব্লিউবি-জিওবি)’ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বরাদ্দ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র/নোটশিটসহ নথি, ক্রয় কমিটির তথ্য, টেন্ডার সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, মাস্ক, পিপিইসহ যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয়ে আইটেমভিত্তিক ব্যয় ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য/রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি।

২. ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট অন কোভিড-১৯ (এডিবি)’ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বরাদ্দ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র/নোটশিটসহ নথি, ক্রয় কমিটির তথ্য, টেন্ডার সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, মাস্ক, পিপিইসহ যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয়ে আইটেমভিত্তিক ব্যয় ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য/রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। ৩. স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. ইকবাল কবিরের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি।

এছাড়া মেসার্স জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট মেনুফ্যাকচারিং লিমিটেড বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকলে তার রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি চাওয়া হয়েছে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, একটি প্রতিষ্ঠানকে (জেএমআই) কুমিরের বাচ্চার মতো সামনে এনে এ খাতের মাফিয়ারা বড় দুর্নীতি আড়াল করছে কিনা সেটাও অনুসন্ধানে তুলে আনা হবে। স্বাস্থ্য খাতের সিন্ডিকেট কিভাবে তৈরি হয়েছে, কারা তৈরি করেছে, কোন কোন কর্মকর্তা এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে সেটিও সামনে আনা হচ্ছে।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত