প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম: পাউবো জিম্মি ১১ ঠিকাদারে
jugantor
প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম: পাউবো জিম্মি ১১ ঠিকাদারে
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ মন্ত্রণালয়ের * সিন্ডিকেটের কাছে ৪১৬টি প্রকল্প চলমান, অগ্রগতি হতাশাজনক * এডিজি ৩ মাস পরেও জানেন না তিনি কমিটির প্রধান 

  নেসারুল হক খোকন  

২৮ জুন ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রায় সব প্রকল্পই ১১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাইরের কোনো ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নিতে পারেন না।

স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পের কাজ পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ন্যূনতম জবাবদিহিতা নেই কোনো কাজের। অগ্রগতিও হতাশাজনক। গোটা বিষয়টি পাউবোতে একরকম ‘ওপেন সিক্রেট’। এরপরও রহস্যজনক কারণে নির্বিকার পাউবো কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এসব প্রকল্পের কাজ বিক্রি ও ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ দেয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ এনেছে খোদ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ১১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে মাত্রাতিরিক্ত কাজ নিয়ে গেছে। অথচ বাস্তব কাজের কোনো অগ্রগতি নেই।

২ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন অধিক গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে না। সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানগুলো ৪১৬টি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিলেও ৩ বছরে অগ্রগতির হার খুবই হতাশাজনক। এ বিষয়ে কমিটি গঠন করে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে (ডিজি) চিঠি দেয়া হয়।

জানা গেছে, ৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে নানা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি পাউবোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিষয়টি জানার পর কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়নের মন্থর গতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও। এরপরই কঠোর অবস্থান নেয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের এমন নির্দেশনার ৬ মাস পার হলেও তেমন কোনো তৎপরতা নেই পাউবো কর্তৃপক্ষের। এর বাস্তব উদাহরণ কমিটির আহ্বায়ক পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান নিজেই। কারণ গুরুত্বপূর্ণ এ কমিটি গঠনের ৩ মাস পরেও জানেন না তিনি নিজেই এ কমিটির আহ্বায়ক।

চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ ঠিকাদারের কাজ নিয়ে অসন্তোষের দাফতরিক পত্রটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে মতিঝিলের ওয়াপদা ভবনে আসতে সময় লেগেছে ৩ মাস। আর পাউবোর ডিজি-এডিজি পাশাপাশি কক্ষে বসেন। অথচ এ বিষয়ে কমিটি গঠনে লেগেছে আরও ৩ মাস। অর্থাৎ ৬ মাস চলে গেছে শুধু কমিটি গঠনেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পাউবোকে চিঠি দিয়েছে ১৯ ডিসেম্বর। ৩ মাস পর ১৯ মার্চ পাউবোর মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম অতিরিক্ত মহাপরিচালক হাবিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন। আর কমিটি গঠনের ৩ মাস পর ১৯ জুন হাবিবুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘কই না তো আমি এ কমিটির আহ্বায়ক জানি না তো!’ পাশে থাকা অন্য আরেকজনের কাছে জানতে চান এরকম কোনো কমিটি আছে নাকি? একপর্যায়ে বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের কাছে কাজের সর্বশেষ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এখনও পাওয়া যায়নি।’

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাউবোর ডিজিকে এ চিঠি দিয়ে বলা হয়, জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হোক। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। পাউবোর প্রকল্পগুলোর গত ৩ বছরের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ দফতর থেকে অতিরিক্তসংখ্যক কাজ নিয়েছে। তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। পিপিআর ২০০৮-এ অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সমগোত্রীয় কাজের অভিজ্ঞতা এবং বার্ষিক টার্নওভার- এ দুটি নির্ণায়কের কারণে অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে মাত্রাতিরিক্ত কাজ নিচ্ছে।’

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- ‘লাইসেন্স ভাড়া দেয়া, কাজ বিক্রি, সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ, কাজ হাতবদল, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো কাজ শেষ না করা ইত্যাদি অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির সম্মুখীন। প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা এবং সিপিটিইউর ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব প্রক্রিয়া দূষিত হয়ে পড়েছে। সার্বিক আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এর অনুচ্ছেদ ৬৪(৫) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ এর বিধি ১২৭(৪) অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- জানতে চাইলে পাউবোর বিদায়ী ডিজি মো. মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সময়মতো তদারকি করেননি। ঠিকাদাররাও নানা অজুহাতে এসব প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে রেখেছে।’ ডিজি হিসেবে এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

পাউবোর মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, ‘চলমান এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এটা বড় ধরনের শাস্তি।’ তিনি বলেন, ‘আপাতত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অসমাপ্ত কাজ আদায়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

জানা যায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ, তীর রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি নিষ্কাশনের কাজ করে থাকে। প্রতি অর্থবছরে হাজার হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্নীতি চলে লাগামহীন।

এ কারণে অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক হয় না। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১১টি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছোট-বড় মোট ৪১৬টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হল- ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ৫৬৬ কোটি টাকার কাজ, মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স ৩৮৮ কোটি ১৬ লাখ, মেসার্স তাজুল ইসলাম ২৬৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, মেসার্স মশিউর রহমান চৌধুরী ২৪৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, এসএস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন ২৩০ কোটি টাকা, ডলি কন্সট্রাকশন লিমিটেড ২২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, মেসার্স আমিন অ্যান্ড কো. ২১৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা, মেসার্স খন্দকার শাহীন ২১৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, মেসার্স শামিমুর রহমান ১৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রা. লিমিটেড ১৪৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং মেসার্স শহীদ ব্রাদার্সের হাতে ৪৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

চলমান প্রকল্পগুলের মধ্যে ১১১টির অগ্রগতি ৩০ শতাংশেরও কম। ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে ৫৩টির, ৪৬ থেকে ৬০ ভাগ হয়েছে ৪৭টির, ৬১ থেকে ৭৫ ভাগ কাজ হয়েছে ৩৬টির, ৭৬ থেকে ৯০ ভাগ কাজ হয়েছে ৪৮টির এবং ৯১ থেকে ৯৯ ভাগ কাজ হয়েছে ৭৬টি প্রকল্পের।

প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম: পাউবো জিম্মি ১১ ঠিকাদারে

জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ মন্ত্রণালয়ের * সিন্ডিকেটের কাছে ৪১৬টি প্রকল্প চলমান, অগ্রগতি হতাশাজনক * এডিজি ৩ মাস পরেও জানেন না তিনি কমিটির প্রধান 
 নেসারুল হক খোকন 
২৮ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রায় সব প্রকল্পই ১১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাইরের কোনো ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নিতে পারেন না।

স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পের কাজ পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ন্যূনতম জবাবদিহিতা নেই কোনো কাজের। অগ্রগতিও হতাশাজনক। গোটা বিষয়টি পাউবোতে একরকম ‘ওপেন সিক্রেট’। এরপরও রহস্যজনক কারণে নির্বিকার পাউবো কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এসব প্রকল্পের কাজ বিক্রি ও ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ দেয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ এনেছে খোদ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ১১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে মাত্রাতিরিক্ত কাজ নিয়ে গেছে। অথচ বাস্তব কাজের কোনো অগ্রগতি নেই।

২ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন অধিক গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে না। সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানগুলো ৪১৬টি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিলেও ৩ বছরে অগ্রগতির হার খুবই হতাশাজনক। এ বিষয়ে কমিটি গঠন করে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে (ডিজি) চিঠি দেয়া হয়।

জানা গেছে, ৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে নানা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি পাউবোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিষয়টি জানার পর কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়নের মন্থর গতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও। এরপরই কঠোর অবস্থান নেয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের এমন নির্দেশনার ৬ মাস পার হলেও তেমন কোনো তৎপরতা নেই পাউবো কর্তৃপক্ষের। এর বাস্তব উদাহরণ কমিটির আহ্বায়ক পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান নিজেই। কারণ গুরুত্বপূর্ণ এ কমিটি গঠনের ৩ মাস পরেও জানেন না তিনি নিজেই এ কমিটির আহ্বায়ক।

চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ ঠিকাদারের কাজ নিয়ে অসন্তোষের দাফতরিক পত্রটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে মতিঝিলের ওয়াপদা ভবনে আসতে সময় লেগেছে ৩ মাস। আর পাউবোর ডিজি-এডিজি পাশাপাশি কক্ষে বসেন। অথচ এ বিষয়ে কমিটি গঠনে লেগেছে আরও ৩ মাস। অর্থাৎ ৬ মাস চলে গেছে শুধু কমিটি গঠনেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পাউবোকে চিঠি দিয়েছে ১৯ ডিসেম্বর। ৩ মাস পর ১৯ মার্চ পাউবোর মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম অতিরিক্ত মহাপরিচালক হাবিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন। আর কমিটি গঠনের ৩ মাস পর ১৯ জুন হাবিবুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘কই না তো আমি এ কমিটির আহ্বায়ক জানি না তো!’ পাশে থাকা অন্য আরেকজনের কাছে জানতে চান এরকম কোনো কমিটি আছে নাকি? একপর্যায়ে বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের কাছে কাজের সর্বশেষ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এখনও পাওয়া যায়নি।’ 

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাউবোর ডিজিকে এ চিঠি দিয়ে বলা হয়, জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হোক। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। পাউবোর প্রকল্পগুলোর গত ৩ বছরের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ দফতর থেকে অতিরিক্তসংখ্যক কাজ নিয়েছে। তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। পিপিআর ২০০৮-এ অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সমগোত্রীয় কাজের অভিজ্ঞতা এবং বার্ষিক টার্নওভার- এ দুটি নির্ণায়কের কারণে অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে মাত্রাতিরিক্ত কাজ নিচ্ছে।’ 

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- ‘লাইসেন্স ভাড়া দেয়া, কাজ বিক্রি, সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ, কাজ হাতবদল, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো কাজ শেষ না করা ইত্যাদি অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির সম্মুখীন। প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা এবং সিপিটিইউর ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব প্রক্রিয়া দূষিত হয়ে পড়েছে। সার্বিক আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এর অনুচ্ছেদ ৬৪(৫) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ এর বিধি ১২৭(৪) অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- জানতে চাইলে পাউবোর বিদায়ী ডিজি মো. মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সময়মতো তদারকি করেননি। ঠিকাদাররাও নানা অজুহাতে এসব প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে রেখেছে।’ ডিজি হিসেবে এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। 

পাউবোর মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, ‘চলমান এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এটা বড় ধরনের শাস্তি।’ তিনি বলেন, ‘আপাতত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অসমাপ্ত কাজ আদায়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

জানা যায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ, তীর রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি নিষ্কাশনের কাজ করে থাকে। প্রতি অর্থবছরে হাজার হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্নীতি চলে লাগামহীন।

এ কারণে অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক হয় না। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১১টি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছোট-বড় মোট ৪১৬টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হল- ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ৫৬৬ কোটি টাকার কাজ, মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স ৩৮৮ কোটি ১৬ লাখ, মেসার্স তাজুল ইসলাম ২৬৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, মেসার্স মশিউর রহমান চৌধুরী ২৪৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, এসএস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন ২৩০ কোটি টাকা, ডলি কন্সট্রাকশন লিমিটেড ২২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, মেসার্স আমিন অ্যান্ড কো. ২১৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা, মেসার্স খন্দকার শাহীন ২১৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, মেসার্স শামিমুর রহমান ১৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রা. লিমিটেড ১৪৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং মেসার্স শহীদ ব্রাদার্সের হাতে ৪৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

চলমান প্রকল্পগুলের মধ্যে ১১১টির অগ্রগতি ৩০ শতাংশেরও কম। ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে ৫৩টির, ৪৬ থেকে ৬০ ভাগ হয়েছে ৪৭টির, ৬১ থেকে ৭৫ ভাগ কাজ হয়েছে ৩৬টির, ৭৬ থেকে ৯০ ভাগ কাজ হয়েছে ৪৮টির এবং ৯১ থেকে ৯৯ ভাগ কাজ হয়েছে ৭৬টি প্রকল্পের।