বাস্তবায়নে ধীরগতিতে বাড়ছে সংক্রমণ

গুচ্ছ নয় বাড়ি ধরে লকডাউন

নতুন করে শুরু হচ্ছে জোনিং ও ম্যাপিং * বাস্তবায়ন করতে অন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন -স্বাস্থ্যমন্ত্রী

  রাশেদ রাব্বি ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বড় এলাকা বা ছোট জায়গায় গুচ্ছভিত্তিক নয়, এখন একটি বা দুটি বাড়ি ধরে লকডাউন করা হবে। শিগগির শুরু হবে এ সংক্রান্ত ম্যাপিং ও জোনিংয়ের কাজ। গত এক মাসে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বারবার পরিবর্তন হওয়ায় লকডাউন বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে। এতে মানুষের অবাধ চলাচলের সুযোগে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমশ ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। রাজধানী থেকে এটা প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

টেকনিক্যাল কমিটি দফায় দফায় বড় এলাকা নিয়ে লকডাউনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে আসছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা নানা ধরনের সমস্যা সামনে নিয়ে আসায় এর বাস্তবায়ন আটকে যাচ্ছে। এ কারণে বড় এলাকা বাদ দিয়ে ছোট এলাকা গুচ্ছভিত্তিক অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ জন্য ছোট ছোট জোন নির্ধারণের জন্য ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হয়। এতে অনেকটা সময় চলে যায়। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ছোট এলাকা নয়, একটি বা দুটি বাড়ি ধরে লকডাউন করা হবে। এ লক্ষ্যে দ্রুতই ম্যাপিং শুরু হবে। এক মাসে তিন দফায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে লকডাউন কার্যকরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে বাড়ি অবরুদ্ধ করে সংক্রমণ রোধ করা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী শনিবার যুগান্তরকে বলেন, কোনো এলাকা লকডাউন করা একটি সমন্বিত কাজ। এখানে স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, প্রযুক্তি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথ্য-উপাত্ত প্রদান ও কারিগরি নির্দেশনা দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে অন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

এদিকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নেয়া বিধিনিষেধ শিথিল করায় দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। এমন ১০টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। এই তালিকায় শীর্ষ পাঁচে রয়েছে বাংলাদেশ। জার্মানি, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের পরই উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। ২৫ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে এমন ৪৫টি দেশে আগের সপ্তাহের তুলনায় পরের সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের ভিত্তিতে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়েছে- ৪৫টি দেশের মধ্যে অন্তত ২১টিতে লকডাউনে শিথিলতা আনার পর সংক্রমণ বেড়েছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কারিগরি কমিটির একাধিক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, এক মাসের বেশি সময় আগে আমাদের পক্ষ থেকে লকডাউন বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। কোথায়, কেন, কীভাবে, কতদিন লকডাউন করা হবে-সেখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গড়িমসিতে এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ওই সময় কর্তৃপক্ষ বলেছিল- গুচ্ছভিত্তিক লকডাউনের কথা, এখন আবার তারা বলছে একটি বা দুটি বাড়ি নিয়ে লকডাউনের কথা। এমনকি এ সংক্রান্ত জোনিং করতেও বলা হয়েছে। শিগগির এ সংক্রান্ত কাজ শুরু হবে। তবে এভাবে লকডাউন করে করোনা মোকাবেলা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তারা বলেন, এভাবে শুধু সময়ক্ষেপণই হবে।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ১৮ এপ্রিল বিএমডিসির সভাপতিকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যের কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গঠন করে। কমিটি করোনাভাইরাসে বেশি সংক্রমিত হওয়া তুলনামূলক বড় এলাকা নিয়ে কঠোরভাবে কার্যকর লকডাউনের পরামর্শ দেয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় সংক্রমণ বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকাকে লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকায় ভাগ করে ভিন্নমাত্রায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুন ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় লকডাউন শুরু হয়। কিন্তু ওই সময়ে আরও কিছু স্থানে লকডাউন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

রাজধানীতে ‘অবরুদ্ধকরণ’ (লকডাউন) কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলেও দেশের ১৭টি জেলার বিভিন্ন এলাকায় এটি বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এদিকে ওয়ারীর রেড জোন লকডাউন করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ণয়ের কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি কমিটি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ণয়ের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে। তবে সেইসব এলাকায় কীভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হবে, তা পরিপূর্ণ পরিকল্পনা শেষ করার আগে কোনো নাম তারা প্রকাশ করছে না। এ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ছুটি ঘোষণা করা এলাকাগুলোয় কীভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা আসলে জানা নেই প্রতিষ্ঠানটির।

এর আগে ২২ জুন দেশের ১০টি জেলায় বিভিন্ন এলাকাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ২১ দিনের জন্য ঘোষণা করা হয় এ ছুটি। ২২ জুন রাতেই দেশের আরও পাঁচ জেলার এবং ২৩ জুন আরও চার জেলার রেড জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে কীসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হল-সেটা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না।

এ সময় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির একাধিক সূত্র জানায়, এই রেড জোন ঘোষণা করে সাধারণ ছুটি দেয়ার বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। কারণ, কমিটির পক্ষ থেকে এখনও কোনো তালিকা মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়নি। দেশের ১৭ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কীভাবে লকডাউন চলছে জানতে চাইলে সূত্র জানায়, এ বিষয়ে আমাদের জানা নেই। কোনো জেলায় প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হলে ওই জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা না হলেও কীভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড সংক্রান্ত তথ্য কমিটির সদস্য সচিব ডা. আয়েশা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি জেলায় একজন সচিবকে দায়িত্ব দেয়া আছে। ওইসব এলাকায় মাল্টিসেক্টোরাল করোনা কন্ট্রোল কমিটি হয়েছে। জেলা প্রশাসক সেই কমিটির সভাপতি। এ ছাড়াও এটুআইসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অনেকেই আছেন। তাদের সিদ্ধান্তেই রেড জোনগুলোকে লকডাউন করা হয়। তিনি বলেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি আইনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। সেই ক্ষমতাবলে তিনি প্রত্যেক জেলায় রেড জোন ডিক্লেয়ার করার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। তবে লকডাউন প্রশাসনিক বিষয়। সেটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা মিলে সিদ্ধান্ত নেয়।

কবে থেকে রাজধানীতে লকডাউন কার্যক্রম শুরু হবে জানতে চাইলে কারিগরি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, প্রথম যখন ঘোষণা করা হয় তখন বলা হয়েছিল যে পাঁচটা জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে পরীক্ষামূলকভাবে এই জোনিং কার্যক্রম শুরু হবে। এই পাঁচটার মধ্যে ছিল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের দুটি এলাকা।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা। ম্যাপিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অধিদফতর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ চলছে। একসঙ্গে পুরো বাংলাদেশ লকডাউন হবে না। এই পরীক্ষামূলক এলাকাগুলোর ফলাফলের ওপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতে কাজ করব। আমরা চাচ্ছি জীবনযাত্রা যাতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত না হয়, অর্থনৈতিক কার্যক্রম যথাসম্ভব চালু রাখা। একই সঙ্গে চেষ্টা করছি সামাজিক জীবন অব্যাহত রাখতে। এটা কিন্তু একটা চলমান প্রক্রিয়া। পুরো বাংলাদেশ একসঙ্গে রেডও হবে না, আবার পুরো বাংলাদেশ একসঙ্গে গ্রিনও হবে না। কাজেই যখন যেখানে যেমন করে প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত