বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি

২৯ ঘণ্টা পর উদ্ধার অভিযান শেষ

  যুগান্তর রিপোর্ট ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুড়িগঙ্গায় ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ লঞ্চডুবির ২৯ ঘণ্টা পর উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। মঙ্গলবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে লঞ্চটিকে টেনে নদীর তীরে নিয়ে আসা হয়। এদিকে দুর্ঘটনার দ্বিতীয় দিনে আরও দুটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ নিয়ে ৩৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হল। শ্বাসরুদ্ধকর এ অভিযানের ১৩ ঘণ্টা পর সুমন বেপারি নামের একজন উদ্ধার হয়েছেন। এখনও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনেরা। এছাড়া দুর্ঘটনা তদন্তে গঠিত তিনটি কমিটি কাজ শুরু করেছে।
উদ্ধার অভিযান সমাপ্তি ঘোষণার পর বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, আমরা লঞ্চটি উদ্ধার করে তীরে নিয়ে এসেছি। সেটিকে সংশ্লিষ্টরা ডকইয়ার্ডে তুলবেন। তিনি বলেন, এখনও কেউ নিখোঁজ আছেন, এমন তথ্য পেলে সেই লাশ খুঁজে পেতে স্বজনদের সহযোগিতা করব। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএর সদস্যরা আশপাশে থাকবেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, হয়তো আরও দু-একটি লাশ ভেসে উঠতে পারে। সোমবার সকাল ৯টা ১২ মিনিটে এমভি ময়ূর-২ নামের একটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় ঢাকা নদী বন্দরের (সদরঘাট) কাছাকাছি স্থানে ডুবে যায় এমএল মর্নিং বার্ড লঞ্চটি। প্রথমে স্থানীয়রা পরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধার অভিযান চালায়। সোমবার লঞ্চটি চিহ্নিত করা হলেও সারা দিন চেষ্টা করে সেটি তুলতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। ওইদিন উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় পোস্তগোলা ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সেখানে আটকে যায়। মঙ্গলবার বিকল্প পদ্ধতিতে লঞ্চটিকে তীরে নিয়ে আসা হয়।
এদিকে উদ্ধার অভিযান শেষ করলেও অনেকেই তাদের স্বজনদের খুঁজে পাননি বলে জানান। তারা বলেন, ‘অভিযান শেষ হওয়ায় তাদের স্বজনদের লাশ পাওয়ার আশাও ফিকে হয়ে গেছে। আমরা লাশ উদ্ধারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার দাবি জানাচ্ছি।’ লালকুঠি টার্মিনালে বাবার জন্য বিলাপ করছিলেন হাসিব নামের এক যুবক। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘একসঙ্গে আমার বাবা, মা ও ভাই লঞ্চে ঢাকায় আসছিলেন। মা ও ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেলেও বাবা আবদুল রহমান বেপারি এখনও নিখোঁজ। আমি উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানাচ্ছি।’
একই দাবি জানান আরও কয়েকজন। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা মো. রায়হান জানান, আনুষ্ঠানিক অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে একটি ডুবুরি টিম সার্বক্ষণিক অবস্থান করবে। মঙ্গলবার অনিক (১৮) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম থানার নুরপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে। এছাড়া এদিন আবদুর রহমান নামের আরেকজনেরও লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার হল।
এদিকে দুর্ঘটনা তদন্তে তিনটি কমিটির সদস্যরা তদন্ত কাজ শুরু করেছেন। মঙ্গলবার ঢাকা নদী বন্দরে বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত তার সাক্ষ্য নেন। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির এক সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, সাক্ষ্য গ্রহণের প্রথমদিন আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। ৩-৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা ময়ূর-২ লঞ্চের চালকের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জবানবন্দি দিয়েছেন। কমিটি বুধবার আবারও সাক্ষ্যগ্রহণ করবে।
অপরদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌ আদালতে মামলা করেছেন নৌ পরিবহন অধিদফতরের পরিদর্শক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। মামলায় ময়ূর-২ লঞ্চের চালককে আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার করা ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, ময়ূর-২ লঞ্চটি শ্যামবাজার পন্টুন থেকে ব্যাগ গিয়ার দিয়ে বের হয়ে সামনে চালিয়ে লালকুঠি লঞ্চঘাটে বার্দিং করতে যাওয়ার সময়ে মর্নিং বার্ড লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। এতে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এজাহারে ময়ূর-২ জাহাজের ইনচার্জ মাস্টার আবুল বাশার মোল্লার দায়িত্বে অবহেলা, জাহাজ পরিচালনায় অদক্ষতা ও সংঘর্ষ এড়ানোর বিধান অনুসরণ না করায় আইএসও ১৯৭৬ এবং এর সংশোধনী ২০০৫-এর ৫৬ক এবং ৭০(১)(ক) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
‘বেঁচে যাওয়ায় নিজেই অবাক হয়েছি’ : ‘বেঁচে যাওয়ায় আমি নিজেই অবাক হয়েছি’- বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার সুমন মিয়া (৩২) এভাবেই যুগান্তরের কাছে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে জীবন ফিরে পেয়েছি। এমন মৃত্যুকূপ থেকে আমি বেঁচে যাওয়ায় জ্ঞান ফেরার পর আমি নিজেই অবাক হয়েছি। লঞ্চডুবির পর আপনি এ দীর্ঘক্ষণ কীভাবে কাটালেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি লঞ্চের নিচতলার ইঞ্জিন রুমের ডান পাশে বসা ছিলাম। হঠাৎ লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু মানুষের ভিড়ের কারণে বের হতে পারিনি। লঞ্চ সম্পূর্ণ উল্টে তলিয়ে যাওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম তা মনে নেই। এরপর জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি গলা সমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছি। মনে পড়ে লঞ্চডুবির কথা। বেচে আছি কিনা, নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। লঞ্চের খোলের (বডি) নিচে সামান্য খানিক ফাঁকা যায়গায় নাক উঁচু করে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করি ও দোয়া ইউনুস পড়তে থাকি। ইতোমধ্যে পেটে পানি ঢুকে শরীর খুব ভারি হয়ে গেছে। খানিক পরেই প্রস্রাবের বেগ হয় এবং প্রস্রাব করি। দীর্ঘক্ষণ এক ‘বিঘত’ সমান ফাঁকা যায়গায় বারবার নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যেন এখনই প্রাণবায়ু চলে যাবে। একটা পর্যায়ে জীবনের হাল ছেড়ে দিয়ে কালেমা পড়ে মৃত্যুর জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। প্রচণ্ড ভয়ে আমার সব শক্তি হারিয়ে গেছে। নিথর দেহ যথাসম্ভব নাক উঁচু করে পানিতে শরীর ছেড়ে দিয়েছি। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে, তা আমিও জানি না। অবশেষে মহান আল্লাহর রহমতে লঞ্চ উপরে উঠলে লঞ্চ থেকে বের হয়ে যাই। তখন লোকজন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আমার জীবন এভাবে বেঁচে যাবে, তা ভাবতেই গা শিউরে উঠে। হয়ত মহান আল্লাহপাক তাঁর নিজ কুদরতে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমি সারা জীবন সেজদায় পড়ে থাকলেও এ শুকরিয়া আদায় হবে না।’ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার বিকাল ৫টায় সুমন মিয়াকে রিলিজ দেয়া হয়। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ায় বাড়ি ফিরে গেছেন। সুমনের বড় ভাই শাহিন যুগান্তরকে বলেন, লঞ্চডুবির খবর শুনে আমরা সোমবার সকাল থেকে তাকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকি। দুর্ঘটনার স্থান ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে সুমনের লাশ খুঁজতে থাকি। পরিবারে কান্নার রোল পড়ে যায়। রাত ১০টা নাগাদ আমরা সুমনের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে করেছি হয়ত সুমনের লাশ স্রোতের তোড়ে ভেসে গেছে। কিন্তু এর পরপরই সুমনকে উদ্ধারের ঘটনা শুনে মিটফোর্ডে এসে দেখি সুমন জীবিত। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সুমনকে জীবিত ফিরে পেয়েছি।
মামলায় প্রতিবেদন দাখিল ১৭ আগস্ট : বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় করা মামলায় ঘাতক ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদসহ সাতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন আদালত। ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম (সিজিএম) আদালতে মামলার এজাহার আসার পর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম কামরুন্নাহার মামলার এজাহার গ্রহণ করে মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি আনোয়ারুল কবির বাবুল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানা যায়, সোমবার অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে মর্নিং বার্ড নামের একটি লঞ্চ। সদরঘাটে ভেড়ানোর আগে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিলে সেটি ডুবে যায়। লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ অভিযোগে ৩০ জুন রাতে নৌপুলিশ সদরঘাট থানার এসআই মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে বেপরোয়া লঞ্চ চালিয়ে মানুষ হত্যা ও ধাক্কা দিয়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধির ২৮০, ৩০৪(ক), ৪৩৭ ও ৩৪ ধারায় এমভি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার অপর আসামিরা হলেন- এমভি ময়ূর-২ এর মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা, জাকির হোসেন, ইঞ্জিনচালক শিপন হাওলাদার, চালক শাকিল হোসেন, সুকানি নাসির মৃধা ও সুকানি হৃদয়।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত