চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়া নিয়ে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দুর্নীতির অভিযোগ ‘টোটালি রং’

কোটি কোটি লোকের টেস্ট করা সম্ভব নয় * ৩৭০০ লোকের জন্য ৫০ হোটেল ভাড়া * রুম ভাড়া ১১শ’ টাকা, তিন বেলা খাওয়ার বিল ৫শ’ টাকা * করোনা চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর দরকার নেই, ৪০ ভাগ শয্যা পড়ে আছে * স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি

  সংসদ রিপোর্টার ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, চিকিৎসকের থাকা-খাওয়া নিয়ে যে কথা হয়েছে, আমি তার খোঁজ নিয়েছি। কাল রাতে আমি এটা দেখেছি। ৫০টি হোটেল ভাড়া হয়েছে। সেখানে ৩ হাজার ৭০০ মানুষ এক মাস থেকেছেন। প্রত্যেকটি রুমের ভাড়া ১ হাজার ১০০ টাকা। খাওয়ার খরচ যেটা বলা হয়েছে, তা টোটালি রং। সেখানে দিনের তিন বেলা খাবারের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে।’

মঙ্গলবার দুপুরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবে সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে মন্ত্রী এ দাবি করেন। এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে সরিয়ে অন্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান।

এক্ষেত্রে সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ডাক্তারদের খাবার বিল নিয়ে সংসদে কথা বলেছেন। সেখানে একটি কলার দাম দুই হাজার টাকা, একটি ডিমের দাম এক হাজার টাকা। একটি ব্রেডের এক স্লাইসের দাম তিন হাজার টাকা, দুই স্লাইস ছয় হাজার টাকা। করোনাকালেও স্বাস্থ্য খাতে এ অবস্থা।’

জিম্বাবুয়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পিপিই ও কিট কেনায় দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে এসে আমাদের এই রুগ্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা দেখছি। মানুষ বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাকি মীনা কার্টুনে পরিণত হয়েছে। মীনা কার্টুনের টিয়া পাখি (মিঠু) দিয়ে চলছে এই মন্ত্রণালয়।’ তিনি বলেন, এলাকায় গেলে মানুষ আমাকে অনুরোধ করেন আমি যেন সংসদে গিয়ে বলি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অন্য কোনো দায়িত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়টাকে সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করতে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে মানুষের এই কথাটা নিবেদন করলাম।’

এই আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, পীর ফজলুর রহমান, মুজিবুর রহমান (চুন্নু) ও রওশন আরা মান্নান এবং বিএনপির মো. হারুনুর রশীদ। আলোচনার সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা করোনাকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদ।

করোনায় আক্রান্ত আশঙ্কার তুলনায় কম দাবি করে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আমরা যতটা ভেবেছিলাম সেটা হয়নি। দেশে করোনায় আক্রান্ত ও নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।’ তিনি বলেন, ‘সবকিছু যদি প্রধানমন্ত্রীরই করতে হয়, তাহলে মন্ত্রণালয়-অধিদফতর এত রাখার তো দরকার নেই। এত টাকা খরচ করে লাভ কী? আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাই অনুসরণ করব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। দেখা যায়, অধিদফতরের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেনও না।’ তিনি বেসরকারি হাসপাতালগুলো অধিগ্রহণ করে কোভিড ও নন-কোভিড দুটি সেকশনে আলাদা করে ফেলার প্রস্তাব দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে করোনা চিকিৎসাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

করোনা চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর দরকার নেই : করোনা আক্রান্ত হয়ে ভেন্টিলেটরে যাওয়া রোগীদের প্রায় সবাই মারা গিয়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, করোনা চিকিৎসায় ভেন্টিলেটরের কোনো প্রয়োজন নেই। দেশের ৪০০ ভেন্টিলেটরের মধ্যে সাড়ে তিনশ’ ব্যবহারই হয়নি বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘আইসিইউ নিয়ে অনেক কথা হল। ভেন্টিলেটর নিয়ে বিরাট হইচই। কিন্তু দেখা গেছে, ভেন্টিলেটরের কোনো প্রয়োজনই নেই। ভেন্টিলেটরে যারা গেছেন, তাদের প্রায় সবাই মারা গেছেন। আমাদের চারশ’ ভেন্টিলেটর আছে। এর মধ্যে ৫০টিও ব্যবহার হয়নি। সাড়ে তিনশ’ ভেন্টিলেটর খালি পড়ে আছে। আমাদের মোট বেডের ৬০ শতাংশে এখন রোগী আছে। ৪০ শতাংশ বেড খালি পড়ে রয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার বেড করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত আছে। সেখানে রোগী আছে চার হাজার।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, করোনা চিকিৎসার ওষুধ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ‘করোনার কী চিকিৎসা লাগবে, ডব্লিউএইচও তা বারবার চেঞ্জ করেছে। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করেছি। কেউ কিন্তু আগে বলেনি পিপিই লাগবে। যখন বলা হল, তখন সারা বিশ্ব লকডাউন। এই লকডাউনের কারণে আমরা পিপিই পাচ্ছিলাম না। যন্ত্রপাতি পাচ্ছিলাম না। পরে আস্তে আস্তে ব্যবস্থা করছি। এখন আর সেই অভিযোগ নেই। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। এখন হাইফ্লো অক্সিজেনের প্রয়োজনের কথা বলা হচ্ছে। আমরা এক হাজার অক্সিজেনের অর্ডার দিয়েছি। প্রায় ১০ হাজার নতুন সিলিন্ডার বানানো হয়েছে।’

সরকার কাজ করেছে বলেই মৃত্যুর হার কম : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা সংসদে আমাদের কেবল দোষারোপ করে গেছেন। আমরা কী কাজ করেছি, তা আসেনি তাদের বক্তব্যে। কোভিড সংক্রমণের শুরু থেকেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। চীনে কোভিড দেখা দেয়ার পরপরই আমরা পোর্টগুলোয় স্ক্রিনিংসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। প্রত্যেক জেলা-উপজেলার হাসপাতালে কোভিডের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করেছি। আমরা জাতীয় পর্যায়ে কমিটি করেছি। ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই হার ভারতে ৬ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ১৪ শতাংশ। এটা এমনিতেই হয়নি। সবাই কাজ করেছে বলেই এটা হয়েছে।’

চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, ‘পিপিই কীভাবে পরতে হবে এবং খুলতে হবে, এই বিষয়টি জানা না থাকার কারণেই তারা আক্রান্ত হয়েছেন। এজন্য আমরা তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ফলে আক্রান্তের হার কমে গেছে।’ তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে আমরা ইতোমধ্যে শুধু কোভিডের জন্যই দুই হাজার নতুন ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছি। ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। হটলাইনে এক থেকে দুই লাখ মানুষ ফোন করে স্বাস্থ্য পরামর্শ নিচ্ছেন।

৮০ শতাংশ করোনা রোগীর লক্ষণ নেই : মন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের ৮০ শতাংশ রোগীর কোনো লক্ষণ দেখা দেয় না। ১৫ শতাংশের মাইল্ড লক্ষণ দেখা দেয়। আর ৫ শতাংশের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। আমরা ৮০ শতাংশ রোগীকে বাসায় রেখে টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। টেলিমেডিসিন চালু করেছি।’

কোটি কোটি লোককে টেস্ট সম্ভব নয় : দেশের টেস্টিং ক্যাপাসিটি বাড়ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মাত্র একটি টেস্টিং ল্যাব ছিল। দেড় মাসে আমরা ৬৮টি ল্যাব করেছি। দিনে মাত্র দেড়শটা টেস্টের ব্যবস্থা ছিল, সেটা এখন ১৮ হাজারে উন্নীত হয়েছে। এটা এমনিতেই হয়নি। আমরা জানি আমাদের আরও টেস্ট দরকার। আরও করলে ভালো হয়। কিন্তু কোটি কোটি লোককে টেস্ট করতে পারবেন না। এটা আমাদের মানতে হবে।’

বেসরকারি হাসপাতাল বিলটা একটু বেশি করছে : সরকারের উদ্যোগের ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত হয়েছে মন্তব্য করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়নি। আমরা তাদের নিয়ে এসেছি। এখন তারা কোভিড চিকিৎসা দিচ্ছে। তবে এটা ঠিক যে, তারা বিলটা একটু বেশি করছে। কোভিড চিকিৎসায় ব্যয় একটু বেশি। আমরা বলেছি, আমরা চার্জ ঠিক করে দেব। এই সময়ে আপনারা লাভের চিন্তা করবেন না। মানুষকে সেবা দিন।’

স্বাস্থ্যবিধি মানলে সংক্রমণ কমবে : তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও করোনার সঠিক চিকিৎসা নেই। টিকাও আবিষ্কার হয়নি। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের মৃত্যুর হার কম। তবে জীবন-জীবিকার বিষয় আছে। সেই কারণে আমাদের সংক্রমণের হার কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে এই সংক্রমণের হারও কমবে বলে আশা করি।’

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত