করোনাভাইরাসের প্রভাব

ব্যাংকে তারল্যের জোয়ার, ঋণ বিতরণে ভাটা

  হামিদ বিশ্বাস ০৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার মধ্যেও শুধু এপ্রিল মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য (আমানত বা নগদ অর্থ) বেড়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে আরও দুই মাসের তথ্য যোগ হলে এ অঙ্ক দ্বিগুণ হতে পারে। আমানতের এমন জোয়ারের সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়েনি, উল্টো ভাটার টান।

ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাকালে ঋণ বিতরণ বন্ধ থাকার কারণেই মূলত তারল্য বেড়েছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ছাড়ের কারণেও ব্যাংকগুলোতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বিপুল অঙ্কের রেমিটেন্স ব্যাংকিং চ্যানেলে আসায় সেখানেও প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ঢুকেছে গত দুই মাসে। ফলে গত চার মাসে তারল্য নিয়ে ব্যাংকগুলোতে কোনো টানাটানি ছিল না।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য পরিস্থিতি ভালো থাকলেও এটি বেশিদিন থাকবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় ব্যাংকারদের। তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। আর মানুষের হাতে টাকা না থাকলে তারা নতুন করে সঞ্চয়ের পরিবর্তে জমানো টাকা তুলে নেবে। আবার প্রণোদনার ঋণ বিতরণ পুরো মাত্রায় শুরু হলে তখন ব্যাংকের এ তারল্য আর থাকবে না।

জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিপুল অঙ্কের ডলার কিনেছে। সে টাকা বাজারে তারল্য হয়ে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন দিতে প্রণোদনা বাবদ যে ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার, সেটাও এক প্রকার তারল্য। তবে এ তারল্য থাকবে না। মে-জুনে কিছুটা কমে আসবে। আবার ফুরিয়ে যাবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তারল্যে টানাটানি পড়বে। বেসরকারি খাতে ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনার পর থেকে ঋণ বিতরণ বন্ধ। তার আগেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্য (বিল-বন্ডসহ) ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিল শেষে অতিরিক্ত তারল্য (বিল-বন্ডসহ) বেড়ে হয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। করোনাকালেও তারল্য বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। মে-জুন মাসের তথ্য এখনও প্রকাশ হয়নি। উভয় মাসে তারল্য আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়ার আশা করছেন ব্যাংকাররা।

প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাহেল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, করোনার এই সময় পুরোপরি ঝুঁকিপূর্ণ। ঋণ দিলে সে ঋণ ফিরে আসবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই বেশির ভাগ ব্যাংকই সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করে রাখবে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে বা আরও কমবে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এতে ব্যাংকগুলোর হাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চলে আসে। আবার ঋণ আমানত অনুপাত সীমা (এডিআর) ২ শতাংশ বাড়ানো হয়। এতে অনেক ব্যাংক এই সীমার ভেতর চলে আসে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপ দ্রুত শেষ হবে না। তাই সামনের দিনে ব্যাংকগুলোর তারল্য নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ মানুষ জমা টাকা ভেঙে খাচ্ছে, এটা অব্যাহত থাকবে। আর ব্যাংকের বাইরে টাকা চলে গেলে, তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন কৌশল নিতে হবে।

করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য চলতি মূলধন বাবদ ৩০ হাজার কোটি টাকা ও এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের সুদের অর্ধেক পরিশোধ করবে সরকার, বাকি অর্ধেক গ্রাহক। তাই ব্যাংকগুলোতে আবেদনের হিড়িক পড়েছে। ব্যাংকগুলোতে যাতে তারল্য সংকট না হয়, সেজন্য বড় অঙ্কের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের অর্ধেকে নেমে এসেছে। এমনিতেই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে টানা নামছিল বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি, এপ্রিলে তা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই প্রবৃদ্ধি গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে এই প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে এক বছর আগের চেয়ে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। অথচ বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে এই ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয় ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ।

আর সরকারের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ওই মন্থর গতির কারণে গত বছরের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯-২০ অর্থবছরের যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে, তাতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য আগের চেয়ে কমিয়ে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আগের মাস নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

অক্টোবরে ছিল ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। তার আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। তার আগে জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মে মাসে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এপ্রিলে ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, মার্চে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ ও ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত