ভেঙে পড়েছে জরুরি বিভাগের স্বাস্থ্যসেবা

রোগী কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ

চিকিৎসা না পাওয়ার শঙ্কায় গুরুতর অসুস্থ ছাড়া কেউ হাসপাতালে যেতে আগ্রহী নন * আস্থা ফেরানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

  হাবিবুর রহমান খান ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের প্রকোপে ভেঙে পড়েছে জরুরি বিভাগের স্বাস্থ্যসেবা। দেশের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ হচ্ছে। করোনা ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত মানুষ হাসপাতালে গিয়ে জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক রোগী অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যাচ্ছেন। কেউ কেউ জরুরি বিভাগের সামনেই ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে।

নজিরবিহীন ভোগান্তি, অবহেলার সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে করোনা পরীক্ষার সনদ জটিলতা। নেগেটিভ সার্টিফিকেট না থাকলে জটিল রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসা না পাওয়ার শঙ্কায় জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ আগের তুলনায় কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। গুরুতর অসুস্থ ছাড়া মানুষ সহজে হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না। সাধারণ অসুখের ক্ষেত্রে টেলিফোনেই চিকিৎসকদের সহায়তা নিচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১২’শ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে জরুরি বিভাগে আসত। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মিটফোর্ড হাসপাতালে এ সংখ্যা ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতালে গড়ে ৫০০ রোগী প্রতিদিন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিত। রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালেও স্বাভাবিক সময়ে ছিল রোগীর ভিড়। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের পর এ সংখ্যা নেমে এসেছে দুই-তৃতীয়াংশে।

এমন পরিস্থিতিতে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, যে কোনো সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এলে কাউকে বিনা চিকিৎসায় ফেরানো হবে না এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে চিকিৎসা। তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোসতাক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সাধারণ সময়ের চেয়ে হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কমে গেছে। এটা মূলত দু’টি কারণে। প্রথম, হাসপাতালগুলোতে করোনার ব্যবস্থাপনায় যারা জড়িত তাদের অন্যান্য রোগীর প্রতি সমানভাবে মনোযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, দ্বিতীয়ত রোগীরা সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে গুরুতর অসুস্থ না হলে হাসপাতালে আসছেন না। এতে দেখা যাচ্ছে, এ মহামারীর সময় যারা করোনায় আক্রান্ত হননি তারাও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অন্যান্য সময়ের মতো সেবা পান না।

তিনি বলেন, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। মহামারীর সময়েও সাধারণ মানুষ যাতে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আরও যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দেন মোসতাক।

রাজধানীর সরকারি কয়েকটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আগের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে রোগীর চাপ অনেক কম। এর পরও যারা সেবা নিতে আসছেন তারা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও সেবা পাচ্ছেন না। অনেক অনুরোধের পর নার্স এসে রোগীর অবস্থা দেখলেও চিকিৎসক সহজে আসছেন না। অন্যান্য সময়ে দালালের মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাও সম্ভব হচ্ছে না। করোনার কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দালালদের উৎপাতও আগের চেয়ে কমেছে।

স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ও আত্মীয়-স্বজনদের উপচে ভিড় লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে চিত্রটা ভিন্ন। শনিবার সরেজমিন জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতো সেখানে রোগীর আনাগোনা নেই। জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ২৪ ঘণ্টায় এক হাজারের উপরে রোগী চিকিৎসা নিত, সেখানে শনিবার দুপুর ১২টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩৮৫ জন রোগী এসেছেন। এদের মধ্যে ৮৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকিরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে গেছেন।

উপস্থিতি কম থাকলে এখনও রোগীরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ স্বাস্থ্যসেবাও পাচ্ছেন না। দুপুর সোয়া ১টার দিকে জয়তুন্নেছা নামের এক রোগী জরুরি বিভাগে আসেন। তার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। বুকেও ছিল সামান্য ব্যথা। কিন্তু তাকে চিকিৎসা না দিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। জরুরি বিভাগ থেকে বেরোনোর পর কথা হয় জয়তুন্নেছার ছেলে মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, মা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন। তার হার্টেও কিছুটা সমস্যা রয়েছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে নিয়মিত চিকিৎসা করানো হতো। কিন্তু মাকে যে চিকিৎসক দেখেন তিনি করোনার কারণে হাসপাতালে আসছেন না। গতকাল থেকে মায়ের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে এখানে আসি। কিন্তু এখানেও চিকিৎসা পেলাম না।

গত বুধবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজিমন গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ তেমনটা নেই। তবে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট না থাকায় অনেকে জটিল রোগের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। কথা হয় মিরপুর থেকে আসা ক্যান্সারের রোগী আয়েশা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, ভারত থেকে তিনি ক্যান্সারের চিকিৎসা করিয়েছেন। এরপর এ হাসপাতালে তিনি নিয়মিত ফলোআপ করে আসছেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে নিয়মিত রক্তের কিছু পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু করোনার কারণে প্রায় তিন মাস তিনি কোনো পরীক্ষা করাননি। তাই বাধ্য হয়েই এখানে এসেছেন। কিন্তু জরুরি বিভাগ থেকে বলা হয় করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট না থাকায় তাকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। তাই চলে যাচ্ছি। পুরোপুরি সুস্থ থাকার পরও এখন করোনার পরীক্ষা করাতে হবে।

জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ইএমও’র (ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার) ইনচার্জ ডা. মো. কামরুজ্জামান সরকার যুগান্তরকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে জরুরি বিভাগে সাধারণ সময়ের চেয়ে রোগী অনেকটা কমে গেছে। করোনার আগে আমাদের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে সাড়ে তিনশত থেকে চারশত রোগী আসত। কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা ১১০ থেকে ১২০ জন।

তিনি বলেন, করোনার শুরুতে হাসপাতালে জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় কিছুটা অব্যবস্থাপনা ছিল। কারণ, অনেক রোগী তথ্য গোপন করে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেয়ায় আমাদের অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে কিছুটা হিমশিম খেতে হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জরুরি বিভাগে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। জরুরি বিভাগে কভিড-নন-কভিড এ দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যাদের করোনা উপসর্গ রয়েছে তাদের আলাদা করে কভিড স্থানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর ফলে উপসর্গ নিয়ে কোনো রোগী এলেও তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে না। তার পরও স্বাভাবিক সময়ের মতো স্বাস্থ্যসেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ আমাদের অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মী এখনও করোনায় আক্রান্ত। জরুরি বিভাগে যেখানে ৮ থেকে ১০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন সেখানে বর্তমানে ৩-৫ জন দিয়ে চালানো হচ্ছে। তার পরও আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের সেবা করে যাচ্ছি।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত