ঋণের জোগান বাড়বে কমবে টাকার খরচ
jugantor
করোনাকালের নতুন মুদ্রানীতি
ঋণের জোগান বাড়বে কমবে টাকার খরচ

  যুগান্তর রিপোর্ট  

০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত অর্থনীতি স্বাভাবিক করতে আসন্ন মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আওতায় মুদ্রানীতির প্রায় সব ধরনের উপকরণ শিথিল করে বাজারে কম সুদে টাকার জোগান বাড়ানো হবে।

এতে ঋণের সুদের হার যেমন কমবে, তেমনি ব্যাংক থেকে টাকা নেয়ার অন্যান্য খরচও হ্রাস পাবে। ফলে উদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী কম খরচে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। এর প্রভাবে কমবে উৎপাদন খরচ, যা প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ফেরাতে সহায়তা করবে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণশীল করতে হবে। বাজারে সহজে যাতে টাকার জোগান বাড়ে সেদিকে নজর রাখতে হবে। এখন অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় নিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো।

এ জন্য কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে বেশি জোর দিতে হবে। করোনা মহামারীর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই সময়ে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি খাত স্বাভাবিক নিয়মেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে বিদায়ী অর্থবছরের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হয়নি। উল্টো গত মার্চ থেকেই মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে বড় ছাড় দিয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হয়েছে। বাজারে টাকার জোগান থাকলেও করোনার কোপে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়েনি। ফলে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জিত হয়নি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে এ মাসের শেষ দিকে।

বরাবরের মতো এবারও ছয় মাসের অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। তবে এতে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা যেমন থাকবে, তেমনি পুরো অর্থবছরের অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত সময়ের লক্ষ্যমাত্রাও থাকবে।

আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানুয়ারিতে মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। তবে প্রয়োজন হলে এর আগেও যে কোনো সময় মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে সংশোধনী এনে বাজারে টাকার প্রবাহ, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তুতি থাকবে।

অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় আগামী মুদ্রানীতি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতামতও নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ছিল মতামত দেয়ার শেষ দিন। এগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যালোচনা করবে। আগামী মুদ্রানীতির জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন মডেল তৈরি করেছেন। এগুলোতে বলা হয়েছে, মুদ্রানীতি তৈরিতে করোনার প্রভাব ও স্থায়িত্বই বড় চ্যালেঞ্জ। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই।

এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্বাভাসও নেই। ফলে করোনার প্রভাব ও স্থায়িত্বের অনুমানভিত্তিক হিসাব করেই মুদ্রানীতি তৈরি করতে হচ্ছে। যে কারণে করোনার পরিস্থিতির ওপর এতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। আগে সাধারণত এমনটি হতো না। বিদায়ী অর্থবছরে জানুয়ারিতে মুদ্রানীতিতে সংশোধনী আনার পর করোনার কারণে মার্চ থেকে আবার সংশোধনী আনা শুরু হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে।

নতুন মুদ্রানীতির মডেলগুলোতে আরও বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে টাকার জোগান অব্যাহত রাখতে হবে। ঋণের চাহিদাও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর ও ঋণ প্রাপ্তির শর্ত শিথিল ও অন্যান্য নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

তবে সরকারকে যোগাযোগ কাঠামো, সেবা খাতে সক্রিয়তা, করোনার নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর পূর্বাভাস দিতে হবে। তাহলেই ঋণের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে বড় শিল্পে ঋণের চাহিদা থাকলেও ক্ষুদ্র শিল্পে নেই বললেই চলে। কেননা করোনার কারণে দেশে-বিদেশে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এখনও স্থবিরতা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বিশ্ববাজার স্বাভাবিক না হলে রফতানির আদেশ আসবে না। ফলে দেশে রফতানিমুখী শিল্পও উৎপাদনের ধারায় আসতে পারবে না। রফতানির আদেশ কম থাকায় আমদানি কম, ফলে রফতানিও কম হবে। এসব কারণে ঋণের চাহিদাও কম।

তিনি আরও বলেন, আমার কথা ইউরোপ, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এখন প্রস্তুতি রাখতে হবে। যাতে চাহিদা বাড়লেও ঋণের জোগান পাওয়া যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, করোনার প্রভাব কমলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক প্রশমিত হয়ে আস্থার সঞ্চার হবে। তখন বিশ্ব ও দেশীয় বাজার খুলতে শুরু করবে। এ ধরনের আভাস পাওয়া গেলেই বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে। ঋণের চাহিদা বাড়লে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে দ্রুত ঋণ পেয়ে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পুরোদমে শুরু করতে পারে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তুতি থাকবে। তবে করোনার দেশি-বিদেশি সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফলে সব প্রতিষ্ঠানই চলছে সীমিত আকারে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণের অর্থ পৌঁছানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে করোনার কারণে কর্মসংস্থান হারিয়ে বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামে চলে যাচ্ছে লোকজন। এদের জন্য আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে হবে গ্রামে।

এ কারণে গ্রামমুখী কর্মসংস্থান বাড়াতে মুদ্রানীতিতে থাকবে বিশেষ গুরুত্ব। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়াতে বেশি নজর থাকবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কৃষি খাতের ঋণের ওপর। অনেক বড় শিল্প গ্রুপের কারখানাগুলো গ্রামে রয়েছে। সেগুলোকেও চাঙ্গা করতে ঋণের জোগান বাড়ানো হবে।

পর্যটন খাতের মাধ্যমে সারা দেশে যেমন টাকার প্রবাহ বাড়ানো যায়, তেমনি কর্মসংস্থানও বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য করোনাপরবর্তীতে পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা থাকবে। এ খাতে অবকাঠামো নির্মাণ, সেবার পরিধি সম্প্রসারণে ঋণের জোগান বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে মুদ্রানীতিতে।

করোনার প্রভাব মোকাবেলায় চলমান টাকার সরবরাহের বাইরে আরও অতিরিক্ত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা জোগান দেয়া হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই দেবে ৮২ হাজার কোটি টাকা। সরকার থেকে দেয়া হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো দিচ্ছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।

আগে ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ছিল। গত ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় যেসব ঋণ দেয়া হচ্ছে সেগুলোর সুদের হার কমিয়ে সর্বনিম্ন ১ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। আগে এসব ঋণ দেয়া হতো ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে। ঋণের বিপরীতে সুদ ছাড়া অন্য চার্জ আরোপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সুদের ওপর সুদ, দণ্ড সুদ, সার্ভিস চার্জ এসবের জাল থেকে রেহাই পাবেন উদ্যোক্তারা। এতে ঋণের খরচ কমে যাবে।

এদিকে করোনার প্রভাবে বিদায়ী অর্থবছরের মুদ্রানীতি তছনছ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে গত মার্চ থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে বড় ধরনের ছাড় দিতে থাকে।

এর মধ্যে ট্রেজারি বিল পুনঃক্রয় চুক্তির (রেপো) সুদের হার দুই দফায় ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে। নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর) দুই দফায় কমিয়ে দুই সপ্তাহের গড় ভিত্তিতে ৪ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে সাড়ে ৩ শতাংশ করেছে। আগে দুই সপ্তাহের গড় ভিত্তিতে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ৫ শতাংশ রাখতে হতো। তারল্যের জোগান বাড়াতে চালু করা হয়েছে বিশেষ রেপো। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষমতা বাড়াতে ঋণ আমানতের অনুপাত কমানো হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে টাকার জোগান বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বিদায়ী মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ দশমমিক ৯ শতাংশ। গত মে পর্যন্ত ১১ মাসে বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর কথা ছিল সাড়ে ১২ শতাংশ। মে পর্যন্ত বেড়েছে ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ।

করোনাকালের নতুন মুদ্রানীতি

ঋণের জোগান বাড়বে কমবে টাকার খরচ

 যুগান্তর রিপোর্ট 
০৮ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত অর্থনীতি স্বাভাবিক করতে আসন্ন মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আওতায় মুদ্রানীতির প্রায় সব ধরনের উপকরণ শিথিল করে বাজারে কম সুদে টাকার জোগান বাড়ানো হবে।

এতে ঋণের সুদের হার যেমন কমবে, তেমনি ব্যাংক থেকে টাকা নেয়ার অন্যান্য খরচও হ্রাস পাবে। ফলে উদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী কম খরচে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। এর প্রভাবে কমবে উৎপাদন খরচ, যা প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ফেরাতে সহায়তা করবে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণশীল করতে হবে। বাজারে সহজে যাতে টাকার জোগান বাড়ে সেদিকে নজর রাখতে হবে। এখন অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় নিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো।

এ জন্য কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে বেশি জোর দিতে হবে। করোনা মহামারীর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই সময়ে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি খাত স্বাভাবিক নিয়মেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে বিদায়ী অর্থবছরের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হয়নি। উল্টো গত মার্চ থেকেই মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে বড় ছাড় দিয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হয়েছে। বাজারে টাকার জোগান থাকলেও করোনার কোপে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়েনি। ফলে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জিত হয়নি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে এ মাসের শেষ দিকে।

বরাবরের মতো এবারও ছয় মাসের অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। তবে এতে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা যেমন থাকবে, তেমনি পুরো অর্থবছরের অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত সময়ের লক্ষ্যমাত্রাও থাকবে।

আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানুয়ারিতে মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। তবে প্রয়োজন হলে এর আগেও যে কোনো সময় মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে সংশোধনী এনে বাজারে টাকার প্রবাহ, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তুতি থাকবে।

অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় আগামী মুদ্রানীতি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতামতও নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ছিল মতামত দেয়ার শেষ দিন। এগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যালোচনা করবে। আগামী মুদ্রানীতির জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন মডেল তৈরি করেছেন। এগুলোতে বলা হয়েছে, মুদ্রানীতি তৈরিতে করোনার প্রভাব ও স্থায়িত্বই বড় চ্যালেঞ্জ। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই।

এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্বাভাসও নেই। ফলে করোনার প্রভাব ও স্থায়িত্বের অনুমানভিত্তিক হিসাব করেই মুদ্রানীতি তৈরি করতে হচ্ছে। যে কারণে করোনার পরিস্থিতির ওপর এতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। আগে সাধারণত এমনটি হতো না। বিদায়ী অর্থবছরে জানুয়ারিতে মুদ্রানীতিতে সংশোধনী আনার পর করোনার কারণে মার্চ থেকে আবার সংশোধনী আনা শুরু হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে।

নতুন মুদ্রানীতির মডেলগুলোতে আরও বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে টাকার জোগান অব্যাহত রাখতে হবে। ঋণের চাহিদাও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর ও ঋণ প্রাপ্তির শর্ত শিথিল ও অন্যান্য নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

তবে সরকারকে যোগাযোগ কাঠামো, সেবা খাতে সক্রিয়তা, করোনার নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর পূর্বাভাস দিতে হবে। তাহলেই ঋণের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে বড় শিল্পে ঋণের চাহিদা থাকলেও ক্ষুদ্র শিল্পে নেই বললেই চলে। কেননা করোনার কারণে দেশে-বিদেশে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এখনও স্থবিরতা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বিশ্ববাজার স্বাভাবিক না হলে রফতানির আদেশ আসবে না। ফলে দেশে রফতানিমুখী শিল্পও উৎপাদনের ধারায় আসতে পারবে না। রফতানির আদেশ কম থাকায় আমদানি কম, ফলে রফতানিও কম হবে। এসব কারণে ঋণের চাহিদাও কম।

তিনি আরও বলেন, আমার কথা ইউরোপ, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এখন প্রস্তুতি রাখতে হবে। যাতে চাহিদা বাড়লেও ঋণের জোগান পাওয়া যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, করোনার প্রভাব কমলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক প্রশমিত হয়ে আস্থার সঞ্চার হবে। তখন বিশ্ব ও দেশীয় বাজার খুলতে শুরু করবে। এ ধরনের আভাস পাওয়া গেলেই বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে। ঋণের চাহিদা বাড়লে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে দ্রুত ঋণ পেয়ে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পুরোদমে শুরু করতে পারে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তুতি থাকবে। তবে করোনার দেশি-বিদেশি সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফলে সব প্রতিষ্ঠানই চলছে সীমিত আকারে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণের অর্থ পৌঁছানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে করোনার কারণে কর্মসংস্থান হারিয়ে বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামে চলে যাচ্ছে লোকজন। এদের জন্য আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে হবে গ্রামে।

এ কারণে গ্রামমুখী কর্মসংস্থান বাড়াতে মুদ্রানীতিতে থাকবে বিশেষ গুরুত্ব। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়াতে বেশি নজর থাকবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কৃষি খাতের ঋণের ওপর। অনেক বড় শিল্প গ্রুপের কারখানাগুলো গ্রামে রয়েছে। সেগুলোকেও চাঙ্গা করতে ঋণের জোগান বাড়ানো হবে।

পর্যটন খাতের মাধ্যমে সারা দেশে যেমন টাকার প্রবাহ বাড়ানো যায়, তেমনি কর্মসংস্থানও বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য করোনাপরবর্তীতে পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা থাকবে। এ খাতে অবকাঠামো নির্মাণ, সেবার পরিধি সম্প্রসারণে ঋণের জোগান বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে মুদ্রানীতিতে।

করোনার প্রভাব মোকাবেলায় চলমান টাকার সরবরাহের বাইরে আরও অতিরিক্ত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা জোগান দেয়া হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই দেবে ৮২ হাজার কোটি টাকা। সরকার থেকে দেয়া হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো দিচ্ছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।

আগে ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ছিল। গত ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় যেসব ঋণ দেয়া হচ্ছে সেগুলোর সুদের হার কমিয়ে সর্বনিম্ন ১ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। আগে এসব ঋণ দেয়া হতো ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে। ঋণের বিপরীতে সুদ ছাড়া অন্য চার্জ আরোপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সুদের ওপর সুদ, দণ্ড সুদ, সার্ভিস চার্জ এসবের জাল থেকে রেহাই পাবেন উদ্যোক্তারা। এতে ঋণের খরচ কমে যাবে।

এদিকে করোনার প্রভাবে বিদায়ী অর্থবছরের মুদ্রানীতি তছনছ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে গত মার্চ থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির উপকরণগুলোতে বড় ধরনের ছাড় দিতে থাকে।

এর মধ্যে ট্রেজারি বিল পুনঃক্রয় চুক্তির (রেপো) সুদের হার দুই দফায় ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে। নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর) দুই দফায় কমিয়ে দুই সপ্তাহের গড় ভিত্তিতে ৪ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে সাড়ে ৩ শতাংশ করেছে। আগে দুই সপ্তাহের গড় ভিত্তিতে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ৫ শতাংশ রাখতে হতো। তারল্যের জোগান বাড়াতে চালু করা হয়েছে বিশেষ রেপো। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষমতা বাড়াতে ঋণ আমানতের অনুপাত কমানো হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে টাকার জোগান বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বিদায়ী মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ দশমমিক ৯ শতাংশ। গত মে পর্যন্ত ১১ মাসে বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর কথা ছিল সাড়ে ১২ শতাংশ। মে পর্যন্ত বেড়েছে ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন