বেসরকারি হাসপাতাল: চুক্তিতেই আইন লঙ্ঘন, মানছে না নিয়ম

  রাশেদ রাব্বি ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ রোধে চিকিৎসায় নিয়োজিত অনেকগুলো বেসরকারি হাসপাতাল সরকার বেঁধে দেয়া নিয়মনীতি মানছে না। এদের অনেকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই, অনেকে আবেদনও করেনি। কেউ কেউ পিসিআর পরীক্ষার অনুমোদন নিয়ে রেখেছে; কিন্তু তাদের মেশিন নেই। অনুমোদন ছাড়াই অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করছে কিছু হাসপাতাল।

এরা রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। আইন অনুসরণ না করেই স্বাস্থ্য অধিদফতর এদের সঙ্গেই করোনা চিকিৎসার জন্য চুক্তি করছে। এখন স্বাস্থ্য বিভাগের চোখের সামনে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে; কিন্তু হাসপাতালগুলোকে তারা কিছুই বলছে না। এ পরিস্থিতিতে যারা এ ধরনের হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, হঠাৎ করে কোভিড-১৯ রোগী বেড়ে যাওয়ায় ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবকে করোনা পরীক্ষা ও সেবা দেয়ার অনুমতি দেয় সরকার। যাদের অধিকাংশরই লাইসেন্স নবায়ন নেই। নেই করোনা রোগীর সেবা দেয়ার পর্যাপ্ত অক্সিজেন, আইসিইউসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। তারপরও এসব হাসপাতাল, ক্লিনিককে দেয়া হয়েছে সংক্রামক এ রোগের চিকিৎসার অনুমতি।

এতে সরকারি হাসপাতালের ভোগান্তি কমাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গেলেও সঠিক ফল ও চিকিৎসা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভুগছেন রোগী ও স্বজনরা। উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা পরীক্ষায় ভয়াবহ জালিয়াতির পর অনুসন্ধান করতে গিয়ে অন্যগুলোর তথ্য বেরিয়ে আসছে।

মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর যেসব বেসরকারি হাসপাতাল করোনা সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জড়িত, তারা মূলত দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট প্রদান, নমুনা নিয়ে ফেলে রাখা ইত্যাদি অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতাল ও হেলথ কেয়ারের অপকর্ম গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু বড় বড় বেশ কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অপকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

অধিদফতরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন উপেক্ষার প্রবণতার জন্য এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম গোপন করে যুগান্তরকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির সময় যথাযথভাবে নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল- আগ্রহী হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।

তবে আগে তাদের লাইসেন্স, চিকিৎসা ও পরীক্ষার সক্ষমতা সংক্রান্ত কাগজপত্র সবকিছু যেন ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শুধু আগ্রহীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে; কাগজপত্র তেমন কিছুই পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন যেসব হাসপাতালের লাইসেন্স নেই তাদের তড়িঘড়ি করে দু’দিনের মধ্যে সনদ নবায়ন করে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা কাগজপত্র পরীক্ষার চেয়ে চুক্তির ক্ষেত্রে ‘অন্যদিকে’ বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। এ ধরনের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব হাসপাতাল নিয়ম লঙ্ঘন করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরও চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে একের পর এক অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৌরাত্ম্যে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সব জেনেশুনেও স্বাস্থ্য অধিদফতর আশাব্যঞ্জক কোনো ভূমিকা গ্রহণ করছে না। সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স এখনও নবায়ন করা হয়নি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। এরপরে আর কোনো তথ্য নেই। রাজধানীর শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পিসিআর পরীক্ষার অনুমোদন পেয়েছে; কিন্তু তাদের কোনো পিসিআর মেশিন নেই। তারা রোগীদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিচ্ছে।

অথচ সরকার এখনও করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমোদনই দেয়নি। এই পরীক্ষার নামে মানুষের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিল আদায় করছে। রাজধানীর কেয়ার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কলেজ ভবনে করোনা ইউনিট করা হয়েছে; কিন্তু ওই ভবনের লাইসেন্স নবায়নকৃত নয়। ২০১৮-১৯ সালের পর এরা আর লাইসেন্স নবায়ন করেনি। যদিও অন্য একটি ভবনে চিকিৎসা দেয়ার অনুমোদন নেয় তারা।

এ ছাড়া আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া একাধিক বড় হাসপাতাল আছে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। ঢাকায় কোনো বেসরকারি মেডিকেল হাসপাতাল কবে শেষবারের মতো লাইসেন্স নবায়ন করেছে, তা-ও ঠিকমতো বলতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদফতর। অথচ তাদের অনেককে কোভিড চিকিৎসার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের নানা অপকর্ম বেরিয়ে আসার পর অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিরা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় অধিদফতরের এক সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।

মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে এ সময় পদস্থরা লাইসেন্সের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তারা আপত্তি জানান। তারপর সিদ্ধান্ত হয়, আগে লাইসেন্স নবায়নে দুই সপ্তাহ সময় লাগলেও এখন দু’দিনে লাইসেন্স নবায়ন করা হবে। তবে লাইসেন্স ছাড়া যারা আছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা জানান, লাইসেন্স নবায়নের জন্য চাপ দিলেও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক অনুমোদনের তোয়াক্কা করতে চায় না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নবায়ন না করেই রমরমা বাণিজ্য করছে কয়েক হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক। জানা গেছে, অধিদফতরের তালিকায় মোট ১৭ হাজার ২৪৪টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বিভিন্ন সময়ে নিবন্ধন নিয়েছে। বিভাগ হিসাবে ঢাকায় পাঁচ হাজার ৪৩৬টি, চট্টগ্রামে তিন হাজার ৩৭৫টি, রাজশাহীতে দুই হাজার ৩৮০টি, খুলনায় দুই হাজার ১৫০টি, রংপুরে এক হাজার ২৩৬টি, বরিশালে ৯৫৭টি, ময়মনসিংহে ৮৭০টি এবং সিলেটে ৮৩৯টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে।

এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অর্ধেকের বেশির নিবন্ধন নবায়ন করা নেই। যদিও প্রতি অর্থবছর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। তবে অধিদফতরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে বেসরকারি হাসপাতালগুলো আইন উপেক্ষা করে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে।

রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা নমুনা পরীক্ষা না করেই করোনার ফলাফল দিয়ে এবং পরীক্ষার জন্য বেশি টাকা নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। ২০১৪ সাল থেকেই রিজেন্টের নিবন্ধন নবায়ন করা হয়নি। অথচ করোনা চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর অবৈধ হয়ে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে গত সোম ও মঙ্গলবার র‌্যাব রিজেন্টের এ দুটি শাখায় অভিযান চালায় এবং সিলগালা করে দেয়।

অধিদফতরের একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের পর থেকেই বেশিরভাগ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন ঝুলে পড়ে। ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক পরিপত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন ফি ও নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বনিু ৫০ হাজার ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবায়ন ফি করা হয় আড়াই লাখ টাকা। অন্যদিকে বিভাগীয় ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নবায়ন ফি ১০-৫০ শয্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা, ৫১-১০০ শয্যার জন্য এক লাখ, ১০০-১৪৯ শয্যার ক্ষেত্রে দেড় লাখ, ২৫০ শয্যার জন্য দুই লাখ টাকা করা হয়।

একই শয্যাসংখ্যার জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের জন্য যথাক্রমে ৪০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার, এক লাখ ও দেড় লাখ এবং উপজেলা পর্যায়ের জন্য যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও এক লাখ টাকা করা হয়। এ ছাড়া আবাসিক এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক না রাখার নির্দেশনা থাকার বিষয়টি নবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ যুগান্তরকে বলেন, যারা এই মহামারীর সময়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সরকারের নিয়মীতি মানছে না এবং মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে-তদন্ত করে দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। এসব কাজে সংশ্লিষ্টদের এমন শাস্তি দেয়া দরকার যাতে ভবিষ্যতে এমন আর কেউ না করে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা সংক্রান্ত তথ্য কমিটির সদস্য সচিব এবং মহাপরিচালকের মুখপাত্র (উপ-পরিচালক) ডা. আয়েশা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, কেয়ার হাসপাতালকে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তবে ভবনের বিষয়টি তাদের জানা নেই। অন্যদিকে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন, অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অনুমোদন কাউকে দেয়া হয়নি। যদি এমনটি কেউ করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। লাইসেন্সের বিষয়ে তিনি বলেন, লাইসেন্স নবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত