জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী

দুর্নীতি-অনিয়মে যে জড়িত তাকেই ধরা হচ্ছে

আগে দুর্নীতিটাই নীতি ছিল, অনিয়মটাই নিয়ম ছিল, সেভাবেই রাষ্ট্র চলেছে * করোনায় আতঙ্কিত না হয়ে নিজের সুরক্ষার জন্য যা করণীয় সেটা করুন

  সংসদ রিপোর্টার ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়; দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আমরা ধরে যাচ্ছি। ধরেই যেন আমরা চোর হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধরার পর আমাদের দোষারোপ করা হয়। এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য।’

বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র নষ্ট করে দিয়ে গেছে ১৯৭৫-এর পর যারা রাতের অন্ধকারে অস্ত্র হাতে নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তারাই।

কারণ, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা মানুষকে দুর্নীতি শিখিয়েছে, কালো টাকা শিখিয়েছে, ঋণখেলাপি শিখিয়েছে, তারা এ সমাজটাকে কলুষিত করে গেছে। মানুষ আগে যে একটা আদর্শ নিয়ে চলত, নীতি নিয়ে চলত, দীর্ঘদিন এ দেশে এ মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ এ দেশের মানুষের চরিত্র হরণ করেছে।

কারণ, তাদের অবৈধ ক্ষমতাটাকে নিষ্কণ্টক করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা বছরের পর বছর এ দুর্নীতির বীজ বপন করেছে। তা আজ মহীরুহ হয়ে গেছে। মানুষের চরিত্রটাই নষ্ট করে দিয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে চরিত্রহীনতা একেবারে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছিল। সেখানে আপনি যতই চেষ্টা করেন এর মূলোৎপাটন যথেষ্ট কঠিন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এর আগে তো দুর্নীতিটাই নীতি ছিল, অনিয়মটাই নিয়ম ছিল, সেভাবেই রাষ্ট্র চলেছে। কিন্তু আমরা আসার পর সেগুলো মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি। যতটুকু পারি সেগুলো আমরা সুন্দর করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ অনিয়মগুলো আমরা নিশ্চয়ই মানব না। যে যাই হোক তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব এবং এটা অব্যাহত থাকবে।’

এর আগে সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। এর জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত বক্তব্য দেন।

করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে অনেকে সরকারের সমালোচনা আর খুঁত ধরায় ব্যস্ত থাকলেও তাদের কতজন সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে-এমন প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের তো অনেক রাজনৈতিক দল আছে। সমালোচনা অনেকেই করে যাচ্ছেন। এমনকি বহু এনজিও, অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ঠিক বর্তমানে কতজনকে চোখে পড়ে যারা কাজ করছে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে? সেটাই আমার প্রশ্ন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক মানুষ আছেন যারা হয়তো হাত পাততে পারছেন না, তাদের কোনো আয় নেই। গোপনে তাদের খাবার জিনিস সরবরাহ করা হয়। এমনকি ঢাকা শহরে আমাদের প্রত্যেকটা ওয়ার্ডে বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের যে কমিটিগুলো, তারা কিন্তু সেভাবে সাহায্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। যারা নিচ্ছেন তারা কিন্তু চান না, তাদের নামটা প্রচার হোক। আমরাও চাই না। কারণ, এটা তাদের একটু আত্মাভিমানে লাগে। কিন্তু তারা যেন কষ্ট না পান, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আছে।’

সরকারের পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকেও মানুষকে সহায়তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘টেস্ট করার জন্য খুব ভালো টেকনিক্যাল লোক দরকার হয়। এ লোক পাওয়া কঠিন। কারণ, বাড়িতে বাড়ি গিয়ে তারা নমুনা সংগ্রহ করছেন, যেতে গিয়ে তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় পাড়ার লোক ঢুকতে দেবে না, বাড়িতে যেতে দেবে না, তারা নমুনা নিতে দেবে না। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতাও আছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ খবর তো আপনারা রাখেন না অনেকে। আমাদের বিরোধী দল অনেক কথা বলেছে। তারা কিন্তু এ খবরটা কোনোদিন রাখে না। হয়তো আজকেই প্রথম শুনলেন তারা। যে এরকম ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে যে নমুনা সংগ্রহকারীদের যেতে দেয় না। কিন্তু আমাদের করতে হয়েছে। যারা এ দুঃসময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন তাদের সবাইকে আমাদের দেখতে হবে এবং তাদের আমাদের সহযোগিতা করতে হবে। সেই ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্য, করোনাভাইরাস সবকিছু স্থবির করে দিয়েছে। এটা অত্যন্ত কষ্টকর ও দুঃখজনক। তবে আমরা চেষ্টা করেছি যতদূর সম্ভব মানুষকে রক্ষা করা এবং মৃত্যুহার কমানোর। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা পরিকল্পনা করেছি, পদক্ষেপ নিয়েছি। তার সুফল মানুষ পাচ্ছে। দেশের মানুষ আরও সচেতন হলে, স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনে চললে করোনা মোকাবেলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যেত।’

করোনা সংক্রমণকালের বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। উন্নয়ন বাজেট আমরা দিয়েছি ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার। আমি জানি, হয়তো করোনার কারণে সব আমরা অর্জন করতে পারব-কি-পারব না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

অনেকে সেই প্রশ্ন তুলেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঝড়ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ, রোগশোক এগুলো থাকবেই। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকতে পারে না। জীবন তো চলমান। জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই যদি কখনও বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়, তখন যেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি, তা মাথায় রেখেই এ বাজেটটি দিয়েছি। যদি ভালো হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আর যদি সারা বিশ্বে স্থবিরতা চলে, আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। তবে চলমান থাকবে আমাদের অর্থনীতি। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের কারণে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে এ সংসদটি চলেছে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত এবং করোনার কারণে সব জায়গায় অর্থনীতির চাকা বন্ধ। যোগাযোগ বন্ধ। মানুষের স্বাধীন জীবন যেন একটি অদৃশ্য শক্তির কারণে স্থবির হয়ে গেছে। এ ধরনের অবস্থা কিন্তু অতীতে কখনও দেখা যায়নি। ঠিক সেই অবস্থার মধ্যে আমরা দেশের মানুষের জীবনমান রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিই। করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।’

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ডাক্তার-নার্সদের সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে যথেষ্ট বেড এবং সব রকম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডাক্তার-নার্স যারা কাজ করছেন এবং টেকনিশিয়ানদের পরিবার থেকে আলাদা রাখার জন্য হোটেল ভাড়া করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে খরচ তো হবেই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করি এ দুঃসময়টা থাকবে না। এখান থেকে সারা বিশ্ব মুক্তি পাবে, আমরাও মুক্তি পাব। দেশের জনগণকে আবারও বলব, সবাই স্বাস্থ্যবিধিটা যেন একটু মেনে চলে, তাহলে করোনা থেকে মুক্তি পাব। আর একটা বড় জিনিস, মানুষের ভেতর এমন একটা চিন্তা-করোনা শুনলেই মৃত্যুভয় পেয়ে বসে। ভয়কে জয় করতে হবে। হ্যাঁ, মৃত্যু তো আছেই। মৃত্যু তো অবধারিত। মরার আগে মরব না।

মরণকে জয় করতে হবে। করোনার ভয়ে আতঙ্কিত হব কেন? হ্যাঁ, নিজের সুরক্ষার জন্য যা কিছু করণীয়, সেটা করতে হবে। মনে সাহস রাখতে হবে। এ সময় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ সংসদ অধিবেশনে যারা আসছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য তাদের সবার করোনা টেস্ট করা হয়েছে। এখন একটু আশ্বস্ত হয়ে চলতে পারবেন। তাছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও সাবেক হুইপ করোনা জয় করে ফিরে এসেছেন।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত