অর্থলিপ্সু সাহেদের প্রতারণা পদে পদে
jugantor
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংক হিসাব স্থগিত
অর্থলিপ্সু সাহেদের প্রতারণা পদে পদে

  মাহমুদুল হাসান নয়ন  

১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান অর্থলিপ্সু সাহেদ করিমের প্রতারণা পদে পদে। টাকার জন্য হেন কাজ নেই তিনি করেননি। শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার নামে প্রতারণা নয়; সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

কখনও ভুয়া পরিচয় দিয়ে, কখনও প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে, আবার কখনও ভয়ভীতি দেখিয়ে অপকর্ম করেন তিনি। কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং প্রভাবশালীদের পক্ষে রাখতে বিভিন্নভাবে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সাহেদের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাননি নিজ প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। অনেককেই মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে বিদায় করেছেন তিনি। রিজেন্ট হাসপাতাল মিরপুর শাখার যাত্রাও শুরু হয়েছিল প্রতারণার মাধ্যমে।

প্রতারণার আশ্রয় নেয়ায় সাহেদের হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। মামলা হয়েছে তিনিসহ ১৭ জনের নামে। পলাতক সাহেদকে এখন খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাহেদকে গ্রেফতার করতে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব।

পাশাপাশি পুলিশের উত্তরা বিভাগ, গোয়েন্দা বিভাগ, পিবিআই সাহেদসহ এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার সকালে রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে (৩৩) রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এদিন সাহেদের ভায়রা মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংস্থাটি। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

সহযোগী গ্রেফতার, ভায়রাকে জিজ্ঞাসাবাদ : করোনার ভুয়া পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে প্রতারণার ঘটনায় সাহেদের ভায়রা মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব। র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ জানান, বুধবার রাতে বনানী থেকে নাটক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিহোমের’ মালিক মোহাম্মদ আলী বশিরকে আটক করে র‌্যাব সদর দফতরে নেয়া হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

সাহেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে মো. সাহেদ করিমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত : সাহেদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বৃহস্পতিবার এক চিঠির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়: ‘রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. শাহেদ/ সাহেদ/ মো. শাহেদ করিম এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহের নামে আপনার ব্যাংকে পরিচালিত সব হিসাবের লেনদেন অবরুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করা হল। এসব হিসাব আগামী ৩০ দিন অবরুদ্ধ থাকবে।

প্রতারণা দিয়েই মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতালের যাত্রা শুরু : রিজেন্ট হাসপাতাল মিরপুর শাখার জায়গায় আগে মিম জেনারেল হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে সাব-কন্ট্রাক্টে জায়গা ভাড়া নেন সাহেদ। এরপর নাম বদলে রিজেন্ট হাসপাতালের নামে চলে কার্যক্রম।

২০১৬ সালের ৭ মে এ বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তিও হয়। চুক্তির মেয়াদ ছিল ৫ বছর। চুক্তি অনুযায়ী মিম জেনারেল হাসপাতালের মালিককে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা ভাড়া দেয়ার কথা থাকলেও সে টাকা মেরে দেন সাহেদ। এমনকি ভবন মালিকের মাসিক আড়াই লাখ টাকা ভাড়া বকেয়া পড়তে পড়তে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হয়। সেই টাকা চাইলে ভবন মালিককে বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় দুই দফায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভবন মালিক ফিরোজ আলম।

মিম জেনারেল হসপিটালের স্বত্বাধিকারী মো. আবু হানিফ বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালের সবকিছুই আমার। শুধু রিজেন্ট লেখা সাইনবোর্ডটির মালিক সাহেদ। ভেতরের মালামাল, আসবাবপত্র, জেনারেটর, লিফট, কেবিন বেড, ডেকোরেশন, চায়ের কাপ, পিরিচ সবই আমি ভাড়া দিয়েছি সাহেদকে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী কোনো টাকাই পাইনি। এ নিয়ে অনেক দেনদরবার হয়েছে। এখন পাওনা দাঁড়িয়েছে পঞ্চান্ন লাখ টাকা।

সাহেদের প্রতারণার শিকার এসি সরঞ্জামাদি সরবরাহকারী এফএইচ কর্পোরেশনের ম্যানেজার হাবিব বলেন, ‘আমাদের পাওনা ২০ লাখ টাকা আজও পরিশোধ করেনি সাহেদ। দিনের পর দিন শুধু তারিখ দিয়েছে।’

অপর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী হাদী বলেন, হাসপাতালের আইসিইউর সরঞ্জামাদি লাগানো বাবদ সাহেদের কাছে ৫০ লাখ টাকা পাই। ৪ বছর হয়ে গেল, টাকা দেয়নি। আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে সে ধ্বংস করে দিয়েছে।

পিয়ন-দারোয়ানের টাকাও মেরে দেন সাহেদ : মিরপুর-১২ নম্বর ডি-ব্লক মুসলিম বাজারের বাসিন্দা সখিনা। মাসিক ৫০০০ টাকা চুক্তিতে আয়ার কাজ নেন রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখায়। ৬ মাস কাজ করে বেতনের একটি পয়সাও পাননি তিনি। বেতনের আশায় সকাল-সন্ধ্যা ধরনা দিয়েছেন হাসপাতালের দরজায়। দিনের পর দিন তাকে ঘুরিয়েছেন হাসপাতাল মালিক। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।

শুধু সখিনাই নন; হাসপাতালের ডাক্তার, কর্মকর্তা, আয়া, বুয়া, পিয়ন, ক্লিনার, কর্মচারীসহ অনেকে দিনরাত পরিশ্রম করেও পারিশ্রমিক পাননি। ৬ মাস কিংবা ১ বছরের বেতন না নিয়েও অনেকে চাকরি ছেড়েছেন।

হাসপাতালের সাবেক ডা. নাতাশা যুগান্তরকে বলেন, ২ বছর আগে আমি ও আমার ডা. স্বামী ওই হাসপাতালে কাজ করি। শুরু থেকে এক মাসের বেতন অন্য মাসে দিত। এক সময় বেতন দেয়া বন্ধ থাকে। তাই বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিই। এখনও এক বছরের বেতন পাই। এখন বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, বেতনের ওই টাকা সাহেদকে সদকা হিসেবে দান করেছি।

ক্লিনার সিরাজুল বলেন, আমি তিন বছর ওখানে কাজ করেছি। কোনো মাসেই ঠিকমতো বেতন পাইনি। ৩-৪ মাস পরপর বেতন দেয়া হতো; তাও ভেঙে ভেঙে। পরে ৩ মাসের বেতন রেখেই চলে আসি।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ বছর পর্যন্ত বেতন না দেয়ার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ করেননি : সাহেদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকজন ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী রয়েছেন। মিরপুরের বাসিন্দা ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ বলেন, ২০১৭ সালে কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী উপজেলায় প্রাইমারি স্কুল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পায় রিজেন্ট গ্রুপ।

পাইলিং কাজের সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করে মনোনীত হই এবং কাজ পাই। মনোনীতদের নিয়ে উত্তরা অফিসে মিটিং ডাকেন সাহেদ। তিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর কর্নেল ও কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। এ কাজে ২০ জন ঠিকাদার চুক্তিবদ্ধ হন। প্রথম দফায় কয়েক কোটি টাকার ইট-বালু-সিমেন্ট সাপ্লাই দেয়া হয়। সবাই বিল সাবমিট করি।

এরপর টাকার জন্য ঘুরতে থাকি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রিজেন্টের উত্তরা অফিসে বসে থাকতাম। সিকিউরিটি গার্ডরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিত। কেউই একটি টাকাও পায়নি। সে আমাকে এক সময় এক কোটি টাকার একটি চেক দেয়। অথচ ব্যাংকে কোনো টাকাই ছিল না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কক্সবাজারের ব্যবসায়ী মামুন আনসারী।

বিজ্ঞাপনচিত্রের বকেয়া চাওয়ায় একজনকে ১ ঘণ্টা আটকে রাখেন সাহেদ : আমিরুল মোমেনীন মানিক নামে একজন জানান, ২০০৭ সালে একজন গণমাধ্যমকর্মী মারফত জানতে পারি বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন নির্মাণের লোক খুঁজছে।

তথ্য পেয়ে আমরা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করি। ৯০ হাজার টাকার চুক্তিতে কাজটা আমাদের দেয়া হয়। ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে আমরা বিজ্ঞাপনচিত্র বুঝিয়ে দিই। তখন তারা বলে বকেয়া বিল পরে দেবে। এরপর বারবার টাকার জন্য ধরনা দিই। এভাবে দেই-দিচ্ছি বলে ৩ মাস চলে যায়।

৬ মাস পেরিয়ে গেলে ধানমণ্ডির বিজিবি সদর দফতরের উল্টোদিকে বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে হাজির হলে আমাকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কোম্পানিটির এমডি সাহেব গলা উঁচিয়ে বলেন, ‘এ্যাই আমাকে চিনস, আমি সাহেদ, আর্মির সাবেক মেজর, হাত-পা ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেব।’

আমি বললাম, ‘ভাঙেন, সমস্যা নাই, টাকা না নিয়ে যাব না।’ এভাবে ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর আবার আসেন সাহেদ। ১০ হাজার টাকা আমার মুখে ছুড়ে মেরে বললেন, এই নেন আপনার টাকা। পরে আমি টাকা আর আনিনি।

নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে র‌্যাব। অভিযানে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। এ কারণে মঙ্গলবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় প্রতারণার অভিযোগে হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে এক নম্বর আসামি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এর মধ্যে আটজন গ্রেফতার হয়েছেন। ওইদিনই রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) বাতিলসহ অবিলম্বে হাসপাতালটির সব কার্যক্রম বাতিল এবং সিলগালা করার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
 

দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংক হিসাব স্থগিত

অর্থলিপ্সু সাহেদের প্রতারণা পদে পদে

 মাহমুদুল হাসান নয়ন 
১০ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান অর্থলিপ্সু সাহেদ করিমের প্রতারণা পদে পদে। টাকার জন্য হেন কাজ নেই তিনি করেননি। শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার নামে প্রতারণা নয়; সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

কখনও ভুয়া পরিচয় দিয়ে, কখনও প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে, আবার কখনও ভয়ভীতি দেখিয়ে অপকর্ম করেন তিনি। কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং প্রভাবশালীদের পক্ষে রাখতে বিভিন্নভাবে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সাহেদের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাননি নিজ প্রতিষ্ঠানের ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। অনেককেই মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে বিদায় করেছেন তিনি। রিজেন্ট হাসপাতাল মিরপুর শাখার যাত্রাও শুরু হয়েছিল প্রতারণার মাধ্যমে।

প্রতারণার আশ্রয় নেয়ায় সাহেদের হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। মামলা হয়েছে তিনিসহ ১৭ জনের নামে। পলাতক সাহেদকে এখন খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাহেদকে গ্রেফতার করতে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব।

পাশাপাশি পুলিশের উত্তরা বিভাগ, গোয়েন্দা বিভাগ, পিবিআই সাহেদসহ এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার সকালে রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে (৩৩) রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এদিন সাহেদের ভায়রা মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংস্থাটি। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

সহযোগী গ্রেফতার, ভায়রাকে জিজ্ঞাসাবাদ : করোনার ভুয়া পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে প্রতারণার ঘটনায় সাহেদের ভায়রা মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব। র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ জানান, বুধবার রাতে বনানী থেকে নাটক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিহোমের’ মালিক মোহাম্মদ আলী বশিরকে আটক করে র‌্যাব সদর দফতরে নেয়া হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

সাহেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে মো. সাহেদ করিমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত : সাহেদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বৃহস্পতিবার এক চিঠির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়: ‘রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. শাহেদ/ সাহেদ/ মো. শাহেদ করিম এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহের নামে আপনার ব্যাংকে পরিচালিত সব হিসাবের লেনদেন অবরুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করা হল। এসব হিসাব আগামী ৩০ দিন অবরুদ্ধ থাকবে।

প্রতারণা দিয়েই মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতালের যাত্রা শুরু : রিজেন্ট হাসপাতাল মিরপুর শাখার জায়গায় আগে মিম জেনারেল হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে সাব-কন্ট্রাক্টে জায়গা ভাড়া নেন সাহেদ। এরপর নাম বদলে রিজেন্ট হাসপাতালের নামে চলে কার্যক্রম।

২০১৬ সালের ৭ মে এ বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তিও হয়। চুক্তির মেয়াদ ছিল ৫ বছর। চুক্তি অনুযায়ী মিম জেনারেল হাসপাতালের মালিককে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা ভাড়া দেয়ার কথা থাকলেও সে টাকা মেরে দেন সাহেদ। এমনকি ভবন মালিকের মাসিক আড়াই লাখ টাকা ভাড়া বকেয়া পড়তে পড়তে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হয়। সেই টাকা চাইলে ভবন মালিককে বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় দুই দফায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভবন মালিক ফিরোজ আলম।

মিম জেনারেল হসপিটালের স্বত্বাধিকারী মো. আবু হানিফ বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালের সবকিছুই আমার। শুধু রিজেন্ট লেখা সাইনবোর্ডটির মালিক সাহেদ। ভেতরের মালামাল, আসবাবপত্র, জেনারেটর, লিফট, কেবিন বেড, ডেকোরেশন, চায়ের কাপ, পিরিচ সবই আমি ভাড়া দিয়েছি সাহেদকে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী কোনো টাকাই পাইনি। এ নিয়ে অনেক দেনদরবার হয়েছে। এখন পাওনা দাঁড়িয়েছে পঞ্চান্ন লাখ টাকা।

সাহেদের প্রতারণার শিকার এসি সরঞ্জামাদি সরবরাহকারী এফএইচ কর্পোরেশনের ম্যানেজার হাবিব বলেন, ‘আমাদের পাওনা ২০ লাখ টাকা আজও পরিশোধ করেনি সাহেদ। দিনের পর দিন শুধু তারিখ দিয়েছে।’

অপর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী হাদী বলেন, হাসপাতালের আইসিইউর সরঞ্জামাদি লাগানো বাবদ সাহেদের কাছে ৫০ লাখ টাকা পাই। ৪ বছর হয়ে গেল, টাকা দেয়নি। আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে সে ধ্বংস করে দিয়েছে।

পিয়ন-দারোয়ানের টাকাও মেরে দেন সাহেদ : মিরপুর-১২ নম্বর ডি-ব্লক মুসলিম বাজারের বাসিন্দা সখিনা। মাসিক ৫০০০ টাকা চুক্তিতে আয়ার কাজ নেন রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখায়। ৬ মাস কাজ করে বেতনের একটি পয়সাও পাননি তিনি। বেতনের আশায় সকাল-সন্ধ্যা ধরনা দিয়েছেন হাসপাতালের দরজায়। দিনের পর দিন তাকে ঘুরিয়েছেন হাসপাতাল মালিক। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।

শুধু সখিনাই নন; হাসপাতালের ডাক্তার, কর্মকর্তা, আয়া, বুয়া, পিয়ন, ক্লিনার, কর্মচারীসহ অনেকে দিনরাত পরিশ্রম করেও পারিশ্রমিক পাননি। ৬ মাস কিংবা ১ বছরের বেতন না নিয়েও অনেকে চাকরি ছেড়েছেন।

হাসপাতালের সাবেক ডা. নাতাশা যুগান্তরকে বলেন, ২ বছর আগে আমি ও আমার ডা. স্বামী ওই হাসপাতালে কাজ করি। শুরু থেকে এক মাসের বেতন অন্য মাসে দিত। এক সময় বেতন দেয়া বন্ধ থাকে। তাই বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিই। এখনও এক বছরের বেতন পাই। এখন বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, বেতনের ওই টাকা সাহেদকে সদকা হিসেবে দান করেছি।

ক্লিনার সিরাজুল বলেন, আমি তিন বছর ওখানে কাজ করেছি। কোনো মাসেই ঠিকমতো বেতন পাইনি। ৩-৪ মাস পরপর বেতন দেয়া হতো; তাও ভেঙে ভেঙে। পরে ৩ মাসের বেতন রেখেই চলে আসি।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ বছর পর্যন্ত বেতন না দেয়ার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ করেননি : সাহেদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকজন ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী রয়েছেন। মিরপুরের বাসিন্দা ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ বলেন, ২০১৭ সালে কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী উপজেলায় প্রাইমারি স্কুল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পায় রিজেন্ট গ্রুপ।

পাইলিং কাজের সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করে মনোনীত হই এবং কাজ পাই। মনোনীতদের নিয়ে উত্তরা অফিসে মিটিং ডাকেন সাহেদ। তিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর কর্নেল ও কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। এ কাজে ২০ জন ঠিকাদার চুক্তিবদ্ধ হন। প্রথম দফায় কয়েক কোটি টাকার ইট-বালু-সিমেন্ট সাপ্লাই দেয়া হয়। সবাই বিল সাবমিট করি।

এরপর টাকার জন্য ঘুরতে থাকি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রিজেন্টের উত্তরা অফিসে বসে থাকতাম। সিকিউরিটি গার্ডরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিত। কেউই একটি টাকাও পায়নি। সে আমাকে এক সময় এক কোটি টাকার একটি চেক দেয়। অথচ ব্যাংকে কোনো টাকাই ছিল না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কক্সবাজারের ব্যবসায়ী মামুন আনসারী।

বিজ্ঞাপনচিত্রের বকেয়া চাওয়ায় একজনকে ১ ঘণ্টা আটকে রাখেন সাহেদ : আমিরুল মোমেনীন মানিক নামে একজন জানান, ২০০৭ সালে একজন গণমাধ্যমকর্মী মারফত জানতে পারি বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন নির্মাণের লোক খুঁজছে।

তথ্য পেয়ে আমরা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করি। ৯০ হাজার টাকার চুক্তিতে কাজটা আমাদের দেয়া হয়। ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে আমরা বিজ্ঞাপনচিত্র বুঝিয়ে দিই। তখন তারা বলে বকেয়া বিল পরে দেবে। এরপর বারবার টাকার জন্য ধরনা দিই। এভাবে দেই-দিচ্ছি বলে ৩ মাস চলে যায়।

৬ মাস পেরিয়ে গেলে ধানমণ্ডির বিজিবি সদর দফতরের উল্টোদিকে বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে হাজির হলে আমাকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কোম্পানিটির এমডি সাহেব গলা উঁচিয়ে বলেন, ‘এ্যাই আমাকে চিনস, আমি সাহেদ, আর্মির সাবেক মেজর, হাত-পা ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেব।’

আমি বললাম, ‘ভাঙেন, সমস্যা নাই, টাকা না নিয়ে যাব না।’ এভাবে ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর আবার আসেন সাহেদ। ১০ হাজার টাকা আমার মুখে ছুড়ে মেরে বললেন, এই নেন আপনার টাকা। পরে আমি টাকা আর আনিনি।

নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে র‌্যাব। অভিযানে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। এ কারণে মঙ্গলবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় প্রতারণার অভিযোগে হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে এক নম্বর আসামি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এর মধ্যে আটজন গ্রেফতার হয়েছেন। ওইদিনই রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) বাতিলসহ অবিলম্বে হাসপাতালটির সব কার্যক্রম বাতিল এবং সিলগালা করার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।