জেকেজির করোনা টেস্ট জালিয়াতি

প্রতারণার দায়ে অবশেষে ডা. সাবরিনা গ্রেফতার

সাময়িক বরখাস্ত ও ব্যাংক হিসাব জব্দ * দায় এড়াতে পারেন না, রিমান্ড চাওয়া হবে : পুলিশ

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নানা জল্পনাকল্পনার পর অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ও বিতর্কিত জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী। করোনার নমুনা পরীক্ষার জালিয়াতির মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুই ঘণ্টার জেরায় ডা. সাবরিনার কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। গ্রেফতারের পর ডা. সাবরিনা পুলিশকে জানিয়েছেন, জেকেজির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ ছাড়া আরিফ চৌধুরীর সঙ্গেও তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতারণার দায় কোনোভাবেই ডা. সাবরিনা এড়াতে পারেন না।

এদিকে, গ্রেফতারের পর জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জনের পদ থেকে ডা. সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এদিকে, তার সব ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।

রোববার দুপুর সোয়া ১টার দিকে তেজগাঁও ডিসি অফিসে ইউনিফর্ম পরে ডা. সাবরিনা হাজির হন। জেকেজির প্রতারণার মামলার কর্মকর্তা ও ডিসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের দুই ঘণ্টা পর বিকাল সোয়া ৩টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

তাকে গ্রেফতারের পর তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সোমবার ডা. সাবরিনাকে আদালতে হাজির করা হবে। তাকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন আদালতে করা হবে। ঘটনার সঙ্গে আর কে কে জড়িত রয়েছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হারুন অর রশিদ বলেন, করোনার সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে ভয়ংকর প্রতারণা এবং বিদেশেও বাংলাদেশকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার দায় ডা. সাবরিনা এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, এর আগে করোনাভাইরাস পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে জেকেজির সিইও আরিফ চৌধুরীসহ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা বলেছেন, ডা. সাবরিনা জেকেজির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তিতুমীর কলেজে জেকেজির বুথে হামলার অভিযোগ উঠলে সাবরিনা প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন। তবে জেকেজির বিরুদ্ধে অভিযানের একদিন আগে নিজেই প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে গেছেন বলে ডা. সাবরিনা দাবি করছেন।

সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কখনোই কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এতদিন পর ডা. সাবরিনাকে কেন গ্রেফতার করা হল- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। আরিফ চৌধুরীকে যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, একই মামলায় সাবরিনাকেও আসামি করা হয়েছে।

উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ জানান, ২২ জুন জেকেজির সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়। করোনার ভুয়া সার্টিফিকেটের ডিজাইন তৈরি করত বলে হিরু জানায়। আদালতে ১৬৪ ধারায়ও হিরু স্বীকার করেছে জেকেজির জড়িতদের নাম।

২৩ জুন জেকেজির সিইও আরিফুলসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আরিফুল জানান, এ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা চৌধুরী। অন্যরাও একই উত্তর দেন। তিনি বলেন, ডা. সাবরিনা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাকে গ্রেফতারের জন্য আমরা একটু সময় নিয়েছি।

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা নিজেকে জেকেজির ‘চেয়ারম্যান নয়’ বরং প্রতিষ্ঠানটির ‘কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক’ বলে দাবি করেছেন।

সূত্র জানায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি বুথ স্থাপন করেছিল সাবরিনা-আরিফ দম্পতির জেকেজি প্রতিষ্ঠান। নমুনা সংগ্রহের জন্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া ছিল। তাদের হটলাইন নম্বরে রোগীরা ফোন দিলে মাঠকর্মীরা বাড়ি গিয়েও নমুনা সংগ্রহ করতেন।

আবার অনেককে জেকেজির বুথের ঠিকানা দেয়া হতো। এভাবে কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করত। পরে গুলশানের একটি ভবনের ১৫ তলার অফিসের একটি ল্যাপটপ থেকে ভুয়া সনদ দেয়া হতো। ওই ল্যাপটপ থেকে জেকেজির কর্মীরা রাতদিন শুধু জাল রিপোর্ট তৈরির কাজ করত।

প্রতিটি সনদের জন্য নেয়া হতো পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর বিদেশগামীদের কাছ থেকে নেয়া হতো ১০০ ডলার। যদিও শর্ত ছিল বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাতে হবে। কিন্তু তারা সব শর্ত ভঙ্গ করে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিত।

এভাবে ভুয়া পরীক্ষার মাধ্যমে জেকেজি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা।

আরিফ চৌধুরী গ্রেফতার ও জালিয়াতির খবর প্রচার হওয়ার পর থেকে ডা. সাবরিনা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বাইরে তিনি শুধু কিছুদিন ওখানে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন।

জালিয়াতির ঘটনার আঁচ পেয়ে সরে আসেন। নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম কার্ডিয়াক সার্জন দাবি করা (আদতে তিনি প্রথম নন) এ নারী পরে নিজের নামও বদলে ফেলেন। তার নাম সাবরিনা শারমিন হোসেন হলেও তিনি তার স্বামীর উপাধি ব্যবহার করছিলেন।

স্বামী গ্রেফতারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের নাম বদলে রাখেন সাবরিনা মিষ্টি চৌধুরী। স্বামীর বিরুদ্ধে তাকে নির্যাতনের অভিযোগও তোলেন তিনি। চিকিৎসা পেশার বাইরে ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মেরও চেয়ারম্যান ছিলেন ডা. সাবরিনা। এর প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন আরিফ চৌধুরী।

জানা গেছে, সাবেক সচিবের মেয়ে ডা. সাবরিনা। ছোটবেলা থেকে সাবরিনা ও তার বোনকে বাবা কড়া শাসনে রাখতেন। টিভিও দেখতে দিতেন না। সাবরিনার ছোটবেলা কেটেছে হল্যান্ডে। সাবরিনার বয়স যখন দুই বছর তখন তার পরিবার হল্যান্ডে চলে যায়।

সেখানে অ্যাম্বেসির মাধ্যমে এসএসসি পরীক্ষা দেন সাবরিনা। এরপর তার পুরো পরিবার আমেরিকায় স্থায়ী হয়ে যায়। তবে সাবরিনা দেশে চলে আসেন। দেশে এসে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এরপর প্রশিক্ষণ নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে।

এমএস করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। চাকরি পাওয়ার পর সাবরিনার প্রথম পোস্টিং হয় দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে। সেখান থেকে তিনি বদলি হয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এরপর বদলি হয়ে যান জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে।

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন হয়েও নিজের খেয়াল-খুশিমতো হাসপাতালে আসতেন ডা. সাবরিনা। নিজেকে দেশের প্রথম নারী কার্ডিয়াক সার্জন দাবি করতেন তিনি। তার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মিথ্যাচার ও অনৈতিক সুবিধা নেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি ডা. সাবরিনা। তার কর্মকাণ্ডে বিব্রত হয়েছে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট প্রশাসন। তিন দিনের মধ্যে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ডা. সাবরিনাকে গ্রেফতারের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়: সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ডা. সাবরিনাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হল।

ডা. সাবরিনার ব্যাংক হিসাব জব্দ : জালিয়াতি প্রতিষ্ঠান জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)।

করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ দেয়া প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য দ্রুত পাঠাতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় সম্প্রতি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পাঠানো সিআইসির চিঠিতে ছক আকারে সাত দিনের মধ্যে তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। এতে ঋণ হিসাব ব্যতীত অন্য হিসাবের মোট জমা, জমা টাকার ওপর সুদ, আয়কর কর্তন এবং প্রতিবছরের ৩০ জুন তারিখের স্থিতি জানাতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঋণের হিসাবের জন্য ঋণের পরিমাণ, ঋণের পরিশোধিত সুদ বা চার্জ, সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের ধার্যকৃত সুদ ও স্থিতির তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে: বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো তথ্য সরবরাহ করা না হলে আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী এককালীন ২৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতিদিনের জন্য ৫০০ টাকা হারে জরিমানা আদায় করা হবে। একইসঙ্গে ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ করা হতে পারে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত