নুরুল ইসলাম : একজন সফল উদ্যোক্তা

চার দশকে ৪১ প্রতিষ্ঠান

  শামীম জোয়ার্দ্দার ১৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুরুল ইসলাম। একজন সফল উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়নে এক অনবদ্য ‘আইকন’। দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, দৈনিক যুগান্তর, যমুনা টিভি ও যমুনা ফিউচার পার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। ৪১টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। দেশের আমদানি-রফতানি শিল্পের অগ্রদূত।

একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের ভিশন ও মিশন নিয়ে ১৯৭৪ সালে প্রাইভেট শিল্প খাতে আধুনিকায়নের ধূমকেতু হয়ে আসেন তরুণ উদ্যোক্তা মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম। যুদ্ধপীড়িত দেশবাসীর রুটি-রুজির অন্বেষণে ভিত গাড়েন তার স্বপ্নপুষ্ট যমুনার। বাস্তবিক এক স্বপ্নকাতর মানুষ। একজন সার্থক স্বপ্নচারী।

যমুনা ইলেকট্রনিক ম্যানুফ্যাক্সারিং কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নুরুল ইসলামের প্রথম পথচলা। পরের বছর ১৯৭৫ সাল থেকেই এর আওতায় বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তীকালে যমুনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ একটি জায়ান্ট গোষ্ঠী হিসেবে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

একটি সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেন নুরুল ইসলাম। তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে চার দশক ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে যমুনা গ্রুপ। কর্মসংস্থান হয়েছে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের।

সফল ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের দক্ষতায় যমুনা গ্রুপ আজ বহুমাত্রিক পণ্য পরিসীমার জন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নীত হয়েছে। টেক্সটাইল থেকে আবাসন- যমুনা গ্রুপের রয়েছে বৈচিত্র্যিক ব্যবসায়িক চিন্তা। গত ৪৬ বছরে যমুনা গ্রুপ বৈদ্যুতিক, ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, চামড়া, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলসহ স্পিনিং, বুনন ও রঞ্জন, কসমেটিকস, বেভারিজ, আবাসন, হাউজিং, প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া খাতে অর্থ লগ্নি করেছে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক- উভয় বাজারে যমুনা গ্রুপের পণ্যের সুনাম রয়েছে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত, ইতালি থেকে প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ আমদানির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে সেরা কোয়ালিটির পণ্য উৎপাদন করে ‘টেক্সটাইলের নতুন বিশ্ব’ গড়ে তুলেছে যমুনা গ্রুপ।

উৎপাদন শিল্প থেকে শুরু করে মিডিয়া খাত- বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র যমুনা গ্রুপ। গ্রুপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভি। দুটি গণমাধ্যমই জাতির মানবাধিকার সুরক্ষার অভিপ্রায় নিয়ে সত্য ও স্বাধীন খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে।

যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের যেসব প্রতিষ্ঠান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে : ২০০০-২০০১ সালে শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড জাতীয় রফতানি স্বর্ণপদক, ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে শামীম স্পিনিং মিলস লিমিটেড জাতীয় রফতানি রৌপ্যপদক, ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড জাতীয় রফতানি ব্রোঞ্জপদক লাভ করে। এছাড়া ১৯৯৮-১৯৯৯ স্ক্যান সিমেন্টের (হাইডেলবার্গ সিমেন্ট গ্রুপ) ‘বেটার বিল্ডিং বেটার উইনিং কম্পিটিশন ২০০২ জিতে নেয় যমুনা বিল্ডার্স লিমিটেড। একই বছর জার্মানির মাইলস হ্যান্ডেল গিসেলশ্যাপ্ট ইন্টারন্যাশনাল এমবিএইচ অ্যান্ড কোম্পানি পুরস্কার লাভ করে যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্পোরেট পরিচালনা : যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে নুরুল ইসলাম তার স্টাফ ও কর্মীদের প্রকৃত ও সত্যিকার হিউম্যান রিসোর্স তথা মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, এই মানবসম্পদই কোম্পানির অব্যাহত উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ব্যবসায় উদ্যোগের প্রতিটি স্তরের কর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলার ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন তিনি।

তার বিশ্বাস ছিল, একমাত্র দক্ষ শ্রমিকরাই কোম্পানি ও শিল্পের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারেন। শিল্প খাত নিয়ে তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। একমাত্র কর্মীরাই জানেন বাজারের অসংখ্য প্রতিযোগীর মধ্যে কীভাবে টিকে থাকতে হয়। কোম্পানির কাস্টমার বা সেবাগ্রহীতাদের প্রতিও তারা যথেষ্ট অনুগত। প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই ব্যবসার ‘পরশপাথর’- এটাই ছিল তার মূল দর্শন।

পরিবেশের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : যমুনা গ্রুপে সমৃদ্ধি ও উন্নতি মানে পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য গড়ে তোলা। এই মনোভাব নিয়েই কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ থেকেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করতেন নুরুল ইসলাম।
যমুনা গ্রুপের যত প্রতিষ্ঠান-

১. যুগান্তর, একটি স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিক, ২. যমুনা ফিউচার পার্ক, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শপিংমল, ৩. যমুনা টিভি, ৪. যমুনা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড, ৫. ক্রাউন বেভারেজ লিমিটেড, ৬. যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড, ৭. যমুনা ডেনিমস লিমিটেড, ৮. যমুনা স্পিনিং মিলস লিমিটেড, ৯. শামীম স্পিনিং মিলস লিমিটেড, ১০. শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড, ১১. শামীম রোটোর স্পিনিং লিমিটেড, ১২. শামীম গার্মেন্টস, ১৩. যমুনা ডেনিমস গার্মেন্টস, ১৪. যমুনা ডেনিমস ওয়েভিং লিমিটেড, ১৫. প্যাগাসাস লেদারস লিমিটেড, ১৬. যমুনা ডিস্ট্রিলারি লিমিটেড, ১৭. যমুনা ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড লিমিটেড, ১৮. যমুনা ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড অটোমোবাইলস, ১৯. যমুনা টায়ার অ্যান্ড রাবারস ইন্ডাস্ট্রিজ, ২০. যমুনা পেপারস মিলস, ২১. যমুনা আয়রন অ্যান্ড স্টিল মিলস লিমিটেড, ২২. যমুনা গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ, ২৩. যমুনা পাওয়ার লিমিটেড, ২৪. যমুনা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং লিমিটেড, ২৫. যমুনা ফ্যান অ্যান্ড ক্যাবলস লিমিটেড, ২৫. যমুনা পলি সিল্ক লিমিটেড, ২৬. যমুনা লজিস্টিক অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড, ২৭. যমুনা বিল্ডার্স লিমিটেড, ২৮. যমুনা গ্যাস লিমিটেড, ২৯. হোলসেল ক্লাব লিমিটেড, ৩০. যমুনা ওয়াশিং, ৩১. হুরিয়ান এইচটিএফ লিমিটেড, ৩২. যমুনা মিডিয়া লিমিটেড, ৩৩. লন প্রসেসিং লিমিটেড, ৩৪. যমুনা ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাক্সারিং, ৩৫. যমুনা ফুডস লিমিটেড ৩৬. হোরক্যাচার লিমিটেড, ৩৭. যমুনা ব্রেয়ারি অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, ৩৮. যমুনা ডেনিমস টেকনোলজি লিমিটেড।

যমুনা গ্রুপের বেড়ে ওঠার গল্প

১৯৭৪ : বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আমদানি করে বাংলাদেশে বিশ্বমানের শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম। তার সাহসী সব পদক্ষেপ, প্রগতিশীল দূরদর্শন ও নিরলস পরিশ্রমে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে একটা একটা করে সফলতার ইট গাঁথেন তিনি। গড়ে তোলেন আজকের এই বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য।

১৯৭৫ : যমুনা গ্রুপের প্রথম সফল উদ্যোগ যুমনা ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাক্সারিং কোম্পানি লিমিটেডের যাত্রা শুরু। বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক খুচরা যন্ত্রপাতি উৎপাদনে পথিকৃৎ বলা হয় এই কোম্পানিকে। পরবর্তী সময়ে পিভিসি কম্পাউন্ড ও পাইপও উৎপাদন শুরু করে।

১৯৭৮ : যমুনা ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা। শুরু হয় সিলিং ফ্যান ও ব্যালাস্টসহ অন্যান্য আরও কিছু সামগ্রী তৈরি।

১৯৮০ : যমুনা ক্যাবলস অ্যান্ড রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশেই বিদ্যুতের উচ্চ ও নিু ভোল্টেজের তার তৈরি শুরু করেন নুরুল ইসলাম।

১৯৮২ : এনামেল্ড কপার তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা ওয়্যারস।

১৯৮৮ : শিল্প ও ওষুধ খাতে অ্যালকোহল তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠা করা যমুনা ডিসটিলারি লিমিটেড। বর্তমানে বাংলাদেশের রাসায়নিক খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে এই কোম্পানি।

১৯৯২ : বিখ্যাত ‘পেগাসাস সুজ লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যমুনা গ্রুপ জুতা শিল্পের জগতে প্রবেশ করে। কোম্পানিতে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে লেদার সুজ, স্পোটর্স সুজ, স্যান্ডেল ও স্নিকার্স। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য পরবর্তী সময়ে যোগ করা হয় পেগাসাস লেদার প্রসেসিং ইউনিট। একই বছর যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টেক্সটাইলস ও তৈরি পোশাক খাতে প্রবেশ করে যমুনা। এ বছরই প্রতিষ্ঠা করা হয় যমুনা ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড। দেশীয় বিজ্ঞাপন খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে একই বছরে যাত্রা শুরু রুবিকন অ্যাডভারটাইজিংয়ের।

১৯৯৩ : যাত্রা শুরু যমুনার সবচেয়ে উচ্চাভিলাসী ব্যবসায় উদ্যোগ কসমেটিক কোম্পানি অ্যারোমেটিক কসমেটিক লিমিটেড। অ্যারোমেটিক ব্রান্ড নামে নানা ধরনের কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ সামগ্রী উৎপাদন করে।

১৯৯৬ : যমুনা গ্রুপে টেক্সটাইলস ও তৈরি পোশাক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা হয় শামীম স্পিনিং মিলস লিমিটেড।

১৯৯৭ : পিভিসি ও পিইউ কোটেড সিনথেটিক লেদার উৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠা হয় পেগাসাস লেদারস লিমিটেড।

১৯৯৮ : যাত্রা শুরু করে শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড।

১৯৯৯ : জাতীয় দৈনিক যুগান্তর প্রকাশনার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় যমুনা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং লিমিটেড। সেবছরই গ্রুপের আবাসন ব্যবসার উদ্যোগে যোগ হয় আরেক প্রতিষ্ঠান যমুনা বিল্ডার্স লিমিটেড। পরবর্তী সময়ে নিজের এই প্রতিষ্ঠান দিয়েই এশিয়ার সবচেয়ে বড় শপিংমল ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স যমুনা ফিউচার পার্ক নির্মাণ করেন তিনি। রাজধানী ঢাকার নিউ উত্তরা মডেল টাউন নামে বৃহৎ আবাসিক ও যমুনা সিটি তারই সৃষ্টিশীল দুইটি বড় নির্মাণ শিল্প।

২০০০ : শামীম রোটর স্পিনিং লিমিটেড যাত্রা শুরু করে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত