ডিবির প্রশ্নবাণে কখনও তর্ক কখনও নিশ্চুপ
jugantor
মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে তিনজন
ডিবির প্রশ্নবাণে কখনও তর্ক কখনও নিশ্চুপ
আরিফ ও সাঈদ ৪ দিনের রিমান্ডে * ডা. সাবরিনার আরও ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট  

১৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস পরীক্ষা কেলেঙ্কারির মামলায় জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরী ও তার ভগ্নিপতি সাঈদ এবং ডা. সাবরিনাকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি পুলিশ)। ডিবি কর্মকর্তাদের কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরে তারা পরস্পরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন।

আবার কোনো কোনো প্রশ্নে তারা তিনজনই নিশ্চুপ থেকেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে ডা. সাবরিনার রিমান্ডের ৩ দিন শেষ হচ্ছে আজ। তার আরও ৭ দিনের রিমান্ড চাইবে ডিবি। আরিফুল ও সাঈদকে ৪ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম যুগান্তরকে জানান, ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী করোনা রিপোর্ট জালিয়াতির দায় অস্বীকার করায় তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়া করোনা টেস্টের এ প্রতারণার মূল হোতা কে? এর সঙ্গে আর কে কে জড়িত?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং আইইডিসিআরের কেউ জড়িত আছে কিনা? কিভাবে জালিয়াতির বিষয়টি তাদের মাথায় এল? কে কে এ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করতেন অর্থাৎ পুরো রহস্য উদ্ঘাটনে তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে আদালত সূত্র জানায়, করোনা রিপোর্ট কেলেঙ্কারির ঘটনায় মঙ্গলবার আরিফ চৌধুরী ও তার ভগ্নিপতি সাঈদকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

বুধবার শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালত তাদের প্রত্যেককে ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বুধবার রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর এদিন সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।

রিমান্ডে থাকা ডা. সাবরিনা জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য দিয়েছেন কিন্তু দায় নিজে নিতে চাননি সেসব বিষয়ে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদকে ডা. সাবরিনার মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ডা. সাবরিনা যেসব দায় আরিফ চৌধুরীর ওপর দিচ্ছেন সেসব বিষয়ে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদ তার ওপর পাল্টা দায় চাপাচ্ছেন।

এছাড়া জেকেজির করোনা রিপোর্ট প্রতারণার বিষয়ে কে কে জড়িত আছেন সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তারা তিনজনই নিশ্চুপ থাকছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, জিজ্ঞাসাবাদে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তারা এ চক্রকে আইনের আওতায় আনতে চ্যালেঞ্জ নিয়েই তদন্তে নেমেছেন। জড়িত সে যেই হোক রেহাই পাবে না। জানা গেছে, জেকেজি হেলথ কেয়ারের করোনা রিপোর্ট কেলেঙ্কারির যে মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে সেই মামলায় জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন (সাময়িক বরখাস্ত) ডা. সাবরিনাসহ আসামি সাতজন।

অন্যরা হলেন- সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী, আরিফুলের ভগ্নিপতি সাঈদ, কর্মকর্তা-কর্মচারী হুমায়ুন কবির, তানজিনা পাটোয়ারি, মামুন ও বিপ্লব। রোববার সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তেজগাঁও ডিসি অফিসে আনা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার ৪ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে অন্যরা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। পরে মামলাটির দায়িত্বভার ডিবি তেজগাঁও বিভাগে ন্যস্ত হলে ডা. সাবরিনাকে ডিবিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, জেকেজি হেলথ কেয়ার শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরই ডা. সাবরিনা শারমিন হুসেইনকে বিয়ে করেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি এ অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন তার দাদির নামে।

জেকেজি মূলত ওভাল গ্রুপ লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের প্রধান আরিফুল হক চৌধুরী হলেও চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিতেন ডা. সাবরিনা। গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী মিলেই জেকেজি চালাচ্ছিলেন।

পরে টাকার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে দেখা দেয় পারিবারিক অশান্তি। এরপর জেকেজি থেকে সরে আসতে চান সাবরিনা। ১৬ জুন সাবরিনাকে জেকেজির চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কার করেন আরিফ চৌধুরী। এরপর ২৩ জুন আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জন গ্রেফতার হন তেজগাঁও থানা পুলিশের হাতে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে বিনামূল্যে পরীক্ষার অনুমতি নিয়ে জাল-জালিয়াতি করছিল জেকেজি। স্বাস্থ্য অধিদফতরে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানটি করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমতি নেয় ডা. সাবরিনার মাধ্যমে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জেকেজিকে ৪৪টি বুথ স্থাপন করে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছিল। প্রথমদিকে চুক্তি অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করে তা সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো হচ্ছিল। এর কিছুদিন পর থেকেই তারা শুরু করে বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ।

৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষা শুরু করে। এসবের নমুনা পরীক্ষা না করেই তারা ভুয়া পজিটিভ-নেগেটিভ প্রতিবেদন দিতে থাকে। জেকেজি থেকে জব্দ করা ল্যাপটপে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা।

মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে তিনজন

ডিবির প্রশ্নবাণে কখনও তর্ক কখনও নিশ্চুপ

আরিফ ও সাঈদ ৪ দিনের রিমান্ডে * ডা. সাবরিনার আরও ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে
 যুগান্তর রিপোর্ট 
১৬ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস পরীক্ষা কেলেঙ্কারির মামলায় জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরী ও তার ভগ্নিপতি সাঈদ এবং ডা. সাবরিনাকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি পুলিশ)। ডিবি কর্মকর্তাদের কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরে তারা পরস্পরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন।

আবার কোনো কোনো প্রশ্নে তারা তিনজনই নিশ্চুপ থেকেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে ডা. সাবরিনার রিমান্ডের ৩ দিন শেষ হচ্ছে আজ। তার আরও ৭ দিনের রিমান্ড চাইবে ডিবি। আরিফুল ও সাঈদকে ৪ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। 

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম যুগান্তরকে জানান, ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী করোনা রিপোর্ট জালিয়াতির দায় অস্বীকার করায় তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়া করোনা টেস্টের এ প্রতারণার মূল হোতা কে? এর সঙ্গে আর কে কে জড়িত?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং আইইডিসিআরের কেউ জড়িত আছে কিনা? কিভাবে জালিয়াতির বিষয়টি তাদের মাথায় এল? কে কে এ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করতেন অর্থাৎ পুরো রহস্য উদ্ঘাটনে তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

এদিকে আদালত সূত্র জানায়, করোনা রিপোর্ট কেলেঙ্কারির ঘটনায় মঙ্গলবার আরিফ চৌধুরী ও তার ভগ্নিপতি সাঈদকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

বুধবার শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালত তাদের প্রত্যেককে ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বুধবার রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর এদিন সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।

রিমান্ডে থাকা ডা. সাবরিনা জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য দিয়েছেন কিন্তু দায় নিজে নিতে চাননি সেসব বিষয়ে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদকে ডা. সাবরিনার মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, ডা. সাবরিনা যেসব দায় আরিফ চৌধুরীর ওপর দিচ্ছেন সেসব বিষয়ে আরিফ চৌধুরী ও সাঈদ তার ওপর পাল্টা দায় চাপাচ্ছেন।

এছাড়া জেকেজির করোনা রিপোর্ট প্রতারণার বিষয়ে কে কে জড়িত আছেন সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তারা তিনজনই নিশ্চুপ থাকছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, জিজ্ঞাসাবাদে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। 

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তারা এ চক্রকে আইনের আওতায় আনতে চ্যালেঞ্জ নিয়েই তদন্তে নেমেছেন। জড়িত সে যেই হোক রেহাই পাবে না। জানা গেছে, জেকেজি হেলথ কেয়ারের করোনা রিপোর্ট কেলেঙ্কারির যে মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে সেই মামলায় জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন (সাময়িক বরখাস্ত) ডা. সাবরিনাসহ আসামি সাতজন।

অন্যরা হলেন- সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী, আরিফুলের ভগ্নিপতি সাঈদ, কর্মকর্তা-কর্মচারী হুমায়ুন কবির, তানজিনা পাটোয়ারি, মামুন ও বিপ্লব। রোববার সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তেজগাঁও ডিসি অফিসে আনা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার ৪ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে অন্যরা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। পরে মামলাটির দায়িত্বভার ডিবি তেজগাঁও বিভাগে ন্যস্ত হলে ডা. সাবরিনাকে ডিবিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, জেকেজি হেলথ কেয়ার শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরই ডা. সাবরিনা শারমিন হুসেইনকে বিয়ে করেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি এ অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন তার দাদির নামে।

জেকেজি মূলত ওভাল গ্রুপ লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের প্রধান আরিফুল হক চৌধুরী হলেও চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিতেন ডা. সাবরিনা। গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী মিলেই জেকেজি চালাচ্ছিলেন।

পরে টাকার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে দেখা দেয় পারিবারিক অশান্তি। এরপর জেকেজি থেকে সরে আসতে চান সাবরিনা। ১৬ জুন সাবরিনাকে জেকেজির চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কার করেন আরিফ চৌধুরী। এরপর ২৩ জুন আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জন গ্রেফতার হন তেজগাঁও থানা পুলিশের হাতে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে বিনামূল্যে পরীক্ষার অনুমতি নিয়ে জাল-জালিয়াতি করছিল জেকেজি। স্বাস্থ্য অধিদফতরে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানটি করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমতি নেয় ডা. সাবরিনার মাধ্যমে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জেকেজিকে ৪৪টি বুথ স্থাপন করে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছিল। প্রথমদিকে চুক্তি অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করে তা সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো হচ্ছিল। এর কিছুদিন পর থেকেই তারা শুরু করে বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ।

৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষা শুরু করে। এসবের নমুনা পরীক্ষা না করেই তারা ভুয়া পজিটিভ-নেগেটিভ প্রতিবেদন দিতে থাকে। জেকেজি থেকে জব্দ করা ল্যাপটপে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা।
 

 

ঘটনাপ্রবাহ : করোনা টেস্ট প্রতারণায় জেকেজি