জেকেজির উত্থানের নেপথ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি চক্র
jugantor
ডা. সাবরিনা ফের দু’দিনের রিমান্ডে
জেকেজির উত্থানের নেপথ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি চক্র

  হাসিব বিন শহিদ ও ইকবাল হাসান ফরিদ  

১৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ড. সাবরিনা ও আরিফ
ড. সাবরিনা ও আরিফ। ফাইল ছবি

করোনা রিপোর্ট জালিয়াতি করে আলোচিত প্রতিষ্ঠান জেকেজির উত্থানের নেপথ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বড় একটি চক্র কাজ করেছে। ওই চক্রের মাধ্যমেই জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যন ডা. সাবরিনা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি বাগিয়ে নেন। সাবরিনা, আরিফ ও তার ভগ্নীপতি সাঈদকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের বেশ কিছু তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য তারা এই মুহূর্তে প্রকাশ করছেন না। তারা তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করছেন। এদিকে জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনাকে ফের দু’দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

শুক্রবার করোনা টেস্ট জালিয়াতির মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদ-উর-রহমান রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে সাবরিনাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেপথ্যে যারাই থাকুক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাছাড়া জেকেজি ও ওভাল গ্রুপের সাত পরিচালককেও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র আয়েশা আক্তার বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কারও নাম যদি তদন্তে উঠে আসে তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার সাবরিনাকে আদালতে হাজির করে ফের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ আদালতে রিমান্ড শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, মামলাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মামলা। আসামি সাবরিনা সরকারি চাকরিতে কর্মরত থেকেও বেসরকারি চাকরি করেছেন। করনাকালীন চরম এ দুর্যোগের সময় রোগীদের কাছ থেকে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে আসামিরা তা পরীক্ষা না করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণা করেছেন।

এতে রোগীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে আরও মানুষকে আক্রান্ত করেছেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ একান্ত প্রয়োজন। অপরদিকে আসামিপক্ষে সাইফুজ্জামান (তুহিন), ওবায়দুল হাসান বাচ্চু, আবদুস সালাম প্রমুখ আইনজীবী আসামির রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে তারা বলেন, আসামি একজন ডাক্তার ও বিসিএস ক্যাডার। আসামিকে এর আগে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এরপর আসামিকে ফের রিমান্ডে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। মামলাটি মিডিয়া ট্রায়াল। শুধু মিডিয়ার কারণে সাবরিনা ফেঁসে গেছেন। তা না হলে তিনি গ্রেফতারই হতেন না। এ ছাড়া তার স্বামী বা অন্য কেউ এর সঙ্গে জাড়িত থাকলে এর দায় তার ওপর দেয়া যাবে না। আর প্রতারণার জন্যই সাবরিনা তার স্বামী আরিফকে ডিভোর্স (তালাক) দিয়েছেন। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ বলেন, আজ মিডিয়ার কারণে আসামিদের এমন জঘন্য অপকর্ম বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব দেখেছে। ন্যায়বিচার ও তদন্ত ত্বরান্বিত করতে মিডিয়ার অবদান রয়েছে।

সাবরিনার রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে : রিমান্ডে থাকাবস্থায় সাবরিনা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সাবরিনা তার সহযোগী আসামিদের নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে পজিটিভ, নেগেটিভ জাল রিপোর্ট সরবরাহ করেছেন। তারা নিরীহ লোকজনের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই কাজ করে তারা শুধু টাকা আত্মসাৎই করেননি, জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ বিস্তারে সহায়তা করেছেন।

আসামি স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে তার স্বামী আরিফুল চৌধুরীর মালিকানাধীন জেকেজি হেলথ কেয়ারকে বিভিন্ন সরকারি কাজের আদেশ পাইয়ে দিতেন। যার ফলে জেকেজি বেপরোয়াভাবে ক্ষতিসাধন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আসামি ও তার অপর সহযোগীদের সহায়তায় করোনাভাইরাস মহামারীর এ সময়ে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে এহেন সমাজবিরোধী এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া আসামির প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশ গমনকারীদের করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মামলার অপর আসামি বিপ্লব দাস, মামুনুর রশীদ, হুমায়ুন কবির হিমু, তানজিন পাটোয়ারী, আরিফুল চৌধুরী এবং সাঈদ চৌধুরীর কাছ থেকে করোনা রোগীদের জাল সার্টিফিকেট (পজিটিভ/নেগেটিভ) উদ্ধার করা হয়। আসামি তানজিন পাটোয়ারী ও হুমায়ুন কবির আদালতে জবানবন্দিতে সাবরিনা শারমিন হোসাইনের নাম প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, সাবরিনা জাল জালিয়াতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অপর পলাতক আসামিদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহ, গ্রেফতার, আলামত উদ্ধারসহ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোন কোন ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটনের জন্য আসামিকে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

এর আগে গত ১৩ জুলাই প্রথম দফায় সাবরিনার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। ১২ জুলাই দুপুরে সাবরিনাকে হাসপাতাল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তাকে তেজগাঁও থানার এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারের (জেকেজি) বিরুদ্ধে অভিযোগ- সরকারের কাছ থেকে বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছিল এবং নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া সনদ দিচ্ছিল জেকেজি। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২২ জুন জেকেজির সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজিন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়।

সে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেটের ডিজাইন তৈরি করত বলে হিরু জানায়। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও হিরু জেকেজির জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছে। এরপর ২৩ জুন জেকেজির সিইও আরিফুলসহ চারজন গ্রেফতার হয়। আর আরিফুলকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনার সম্পৃক্ততা উঠে আসে। তবে সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান নয় বরং প্রতিষ্ঠানটির কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক বলে দাবি করেন।

জানা যায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি বুথ স্থাপন করেছিল সাবরিনা-আরিফ দম্পতির জেকেজি হেলথ কেয়ার। নমুনা সংগ্রহের জন্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া ছিল। তাদের হটলাইন নম্বরে রোগীরা ফোন দিলে মাঠকর্মীরা বাড়ি গিয়েও নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেককে জেকেজির বুথের ঠিকানা দেয়া হতো। এভাবে কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন।

পরে ভুয়া সনদ তৈরি করে সরবরাহ করে বিনিময়ে টাকা নিতেন। প্রতিটি সনদের জন্য নেয়া হতো পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর বিদেশগামীদের কাছ থেকে নেয়া হতো ১০০ ডলার। যদিও শর্ত ছিল বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাতে হবে। কিন্তু তারা সব শর্ত ভঙ্গ করে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিত। এভাবে ভুয়া পরীক্ষার মাধ্যমে জেকেজি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রায় আট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা এবং অর্থ আত্মসাতের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবরিনার ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীরও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

ডা. সাবরিনা ফের দু’দিনের রিমান্ডে

জেকেজির উত্থানের নেপথ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি চক্র

 হাসিব বিন শহিদ ও ইকবাল হাসান ফরিদ 
১৮ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ড. সাবরিনা ও আরিফ
ড. সাবরিনা ও আরিফ। ফাইল ছবি

করোনা রিপোর্ট জালিয়াতি করে আলোচিত প্রতিষ্ঠান জেকেজির উত্থানের নেপথ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের বড় একটি চক্র কাজ করেছে। ওই চক্রের মাধ্যমেই জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যন ডা. সাবরিনা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি বাগিয়ে নেন। সাবরিনা, আরিফ ও তার ভগ্নীপতি সাঈদকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের বেশ কিছু তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য তারা এই মুহূর্তে প্রকাশ করছেন না। তারা তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করছেন। এদিকে জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনাকে ফের দু’দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

শুক্রবার করোনা টেস্ট জালিয়াতির মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদ-উর-রহমান রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে সাবরিনাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেপথ্যে যারাই থাকুক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাছাড়া জেকেজি ও ওভাল গ্রুপের সাত পরিচালককেও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র আয়েশা আক্তার বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কারও নাম যদি তদন্তে উঠে আসে তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার সাবরিনাকে আদালতে হাজির করে ফের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ আদালতে রিমান্ড শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, মামলাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মামলা। আসামি সাবরিনা সরকারি চাকরিতে কর্মরত থেকেও বেসরকারি চাকরি করেছেন। করনাকালীন চরম এ দুর্যোগের সময় রোগীদের কাছ থেকে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে আসামিরা তা পরীক্ষা না করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণা করেছেন।

এতে রোগীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে আরও মানুষকে আক্রান্ত করেছেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ একান্ত প্রয়োজন। অপরদিকে আসামিপক্ষে সাইফুজ্জামান (তুহিন), ওবায়দুল হাসান বাচ্চু, আবদুস সালাম প্রমুখ আইনজীবী আসামির রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে তারা বলেন, আসামি একজন ডাক্তার ও বিসিএস ক্যাডার। আসামিকে এর আগে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এরপর আসামিকে ফের রিমান্ডে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। মামলাটি মিডিয়া ট্রায়াল। শুধু মিডিয়ার কারণে সাবরিনা ফেঁসে গেছেন। তা না হলে তিনি গ্রেফতারই হতেন না। এ ছাড়া তার স্বামী বা অন্য কেউ এর সঙ্গে জাড়িত থাকলে এর দায় তার ওপর দেয়া যাবে না। আর প্রতারণার জন্যই সাবরিনা তার স্বামী আরিফকে ডিভোর্স (তালাক) দিয়েছেন। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ বলেন, আজ মিডিয়ার কারণে আসামিদের এমন জঘন্য অপকর্ম বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব দেখেছে। ন্যায়বিচার ও তদন্ত ত্বরান্বিত করতে মিডিয়ার অবদান রয়েছে।

সাবরিনার রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে : রিমান্ডে থাকাবস্থায় সাবরিনা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সাবরিনা তার সহযোগী আসামিদের নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে পজিটিভ, নেগেটিভ জাল রিপোর্ট সরবরাহ করেছেন। তারা নিরীহ লোকজনের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই কাজ করে তারা শুধু টাকা আত্মসাৎই করেননি, জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ বিস্তারে সহায়তা করেছেন।

আসামি স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে তার স্বামী আরিফুল চৌধুরীর মালিকানাধীন জেকেজি হেলথ কেয়ারকে বিভিন্ন সরকারি কাজের আদেশ পাইয়ে দিতেন। যার ফলে জেকেজি বেপরোয়াভাবে ক্ষতিসাধন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আসামি ও তার অপর সহযোগীদের সহায়তায় করোনাভাইরাস মহামারীর এ সময়ে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে এহেন সমাজবিরোধী এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া আসামির প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশ গমনকারীদের করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মামলার অপর আসামি বিপ্লব দাস, মামুনুর রশীদ, হুমায়ুন কবির হিমু, তানজিন পাটোয়ারী, আরিফুল চৌধুরী এবং সাঈদ চৌধুরীর কাছ থেকে করোনা রোগীদের জাল সার্টিফিকেট (পজিটিভ/নেগেটিভ) উদ্ধার করা হয়। আসামি তানজিন পাটোয়ারী ও হুমায়ুন কবির আদালতে জবানবন্দিতে সাবরিনা শারমিন হোসাইনের নাম প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, সাবরিনা জাল জালিয়াতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অপর পলাতক আসামিদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহ, গ্রেফতার, আলামত উদ্ধারসহ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোন কোন ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটনের জন্য আসামিকে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

এর আগে গত ১৩ জুলাই প্রথম দফায় সাবরিনার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। ১২ জুলাই দুপুরে সাবরিনাকে হাসপাতাল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তাকে তেজগাঁও থানার এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারের (জেকেজি) বিরুদ্ধে অভিযোগ- সরকারের কাছ থেকে বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছিল এবং নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া সনদ দিচ্ছিল জেকেজি। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২২ জুন জেকেজির সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজিন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়।

সে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেটের ডিজাইন তৈরি করত বলে হিরু জানায়। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও হিরু জেকেজির জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছে। এরপর ২৩ জুন জেকেজির সিইও আরিফুলসহ চারজন গ্রেফতার হয়। আর আরিফুলকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনার সম্পৃক্ততা উঠে আসে। তবে সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান নয় বরং প্রতিষ্ঠানটির কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক বলে দাবি করেন।

জানা যায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি বুথ স্থাপন করেছিল সাবরিনা-আরিফ দম্পতির জেকেজি হেলথ কেয়ার। নমুনা সংগ্রহের জন্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া ছিল। তাদের হটলাইন নম্বরে রোগীরা ফোন দিলে মাঠকর্মীরা বাড়ি গিয়েও নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেককে জেকেজির বুথের ঠিকানা দেয়া হতো। এভাবে কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন।

পরে ভুয়া সনদ তৈরি করে সরবরাহ করে বিনিময়ে টাকা নিতেন। প্রতিটি সনদের জন্য নেয়া হতো পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর বিদেশগামীদের কাছ থেকে নেয়া হতো ১০০ ডলার। যদিও শর্ত ছিল বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাতে হবে। কিন্তু তারা সব শর্ত ভঙ্গ করে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিত। এভাবে ভুয়া পরীক্ষার মাধ্যমে জেকেজি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রায় আট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা এবং অর্থ আত্মসাতের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবরিনার ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীরও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : করোনা টেস্ট প্রতারণায় জেকেজি