দেশে করোনার সংক্রমণ

মাঝ আগস্টে নতুন ঢেউয়ের শঙ্কা

দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে আরেকটি ধাক্কা দেখা যাবে -বিএসএমএমইউ ভিসি * দেশে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে -ড. এসএম আলমগীর

  রাশেদ রাব্বি ০৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদযাত্রার ছবি। (ফাইল ফটো)

দেশে আবারও করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষা কমে যাওয়ায় আক্রান্ত মানুষ নিজের অজান্তে রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে। ঈদুল আজহায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গরুর হাটে গেছেন।

লঞ্চ, বাস, ট্রেনে মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন দল বেঁধে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা না করে গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। এসব কারণে আগামী দুই সপ্তাহ পর দেশে করোনা সংক্রমণের নতুন ঢেউ দেখা দিতে পারে। এতে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার বাড়বে- এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সংক্রমণের সেই ভয়াবহতা ঠেকাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।

তাদের মতে, সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ, অর্ধেকের বেশি জেলায় বন্যা, পরীক্ষা করতে নানা ভোগান্তি, পরীক্ষার ফল পেতে দেরিসহ নানা কারণে দেশে করোনার পরীক্ষা হার কমে এসেছে। সেই সঙ্গে কমেছে শনাক্তের সংখ্যা। কিন্তু সংক্রমণের হার কমেনি।

একই সময়ে অর্থাৎ ঈদ উপলক্ষে ঢাকা থেকে মানুষের গ্রামে যাওয়া, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে পশুর হাটে যাওয়া, কোরবানি দেয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি কারণে সংক্রমণের নতুন পরিস্থিতি দেখা দেবে। ঈদ ঘিরে যেভাবে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে, এর প্রমাণ পাওয়া যাবে দুই সপ্তাহ পর। ঈদুল ফিতরের সময়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ঈদের কিছু দিন পর থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহ পরে দেশে করোনা সংক্রমণের একটি ধাক্কা আসতে পারে। তখন রোগীর সংখ্যা অতিরিক্ত হারে বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে বাড়তে পারে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে সামাজিকভাবে মেলামেশা বেশি হয়েছে। এতে রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই সজাগ হতে হবে।

ঈদ শেষে যারা বাইরে থেকে ঢাকা আসছেন, তাদের আইসোলেট করতে হবে। শনাক্তদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ছাড়া করোনা নির্মূল করা সম্ভব নয়। ডা. মুশতাক বলেন, এক্ষেত্রে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। করোনা পরীক্ষায় যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাতিল করতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, পরীক্ষা কমিয়ে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। তার দুই মাসের মাথায় দেশের ৬৪ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। আইইডিসিআর-এর হিসাব থেকে দেখা যায়, শুরু থেকেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি ছিল রাজধানীতে। তবে ধীরে ধীরে সেটি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। তবে ২৫ মে ঈদুল ফিতরের পর ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, গত ঈদের মতো এবার যানবাহনে তেমন নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়েনি। তাছাড়া নাগরিকরাও অনেকটা অসচেতনভাবে চলাফেরা করেছেন। যার কারণে এবারও ঈদুল ফিতরের মতো রোগটির সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাবে। আগস্টের মাঝামাঝিতে দেশে করোনার সেই ধাক্কা লক্ষ করা যাবে।

অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম রোগী শনাক্তের পর গত মার্চে রোগী সংখ্যা ছিল ৫১ জন। ওই সময়ে মৃত্যু হয় পাঁচজনের। এপ্রিলে শনাক্ত হন ৭ হাজার ৬১৬ জন, মৃত্যু হয় ১৬৩ জনের। মে মাসে শনাক্ত হন ৩৯ হাজার ৪৮৬ জন, মৃত্যু হয় ৪৮২ জনের। জুনে শনাক্ত হন ৯৮ হাজার ৩৩০ জন, মৃত্যু হয় ১ হাজার ১৯৭ জনের। জুলাইয়ে শনাক্ত হন ৯২ হাজার ১৭৮ জন, মৃত্যু হয় ১ হাজার ২৬৪ জনের। আর চলতি মাসে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৯৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১২৩ জনের।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি দেশে করোনার আরেকটি ঢেউ আমরা দেখব বলে মনে করি। সামগ্রিক পরিস্থিতি সেই ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, এখন রাস্তায় বের হলে দেখতে পাই বেশির ভাগ মানুষ মাক্স ব্যবহার করছে না, সামাজিক দূরত্ব মানছে না।

তাছাড়া ঈদ উপলক্ষে তো রাজধানীর বেশির ভাগ মানুষ গ্রামের বাড়িতে গেছে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে, যারা ইতোমধ্যে ফিরতে শুরু করেছে। এসব কারণে আগামী দুই সপ্তাহে দেশে সংক্রমণের হার বাড়বে। এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আবার বাড়তে থাকবে এবং বাড়বে মৃত্যুও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের যতটা সামাজিক যোগাযোগ হবে, ততই করোনা ছড়িয়ে পড়বে- এটাই নিয়ম। তাই মধ্য আগস্ট নাগাদ রোগী সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। যতটা সচেতনতা তৈরি করার কথা ছিল, ততটা আমরা পারিনি। শুরু থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানানোর যে কাজ, সেটাও আমরা করিনি। মানুষও সচেতন নয়, আইন না মানার প্রবণতা তাদের ভেতরে রয়েছে, কিন্তু সে আইন না মানার কারণে তার শাস্তি কী হতে পারে, এর কোনো উদাহরণ নেই আমাদের সামনে। বরং সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপিয়ে বলা হয়েছে, মানুষ কথা শোনে না, এটা ঠিক নয়। তাদের আইন মানাতে হবে, বাধ্য করতে হবে; কিন্তু সেটা করা হয়নি। তারা বলেন, কোরবানির সময়ে রোগী বাড়ার সুযোগ দেয়া একদমই ঠিক হয়নি। দুই সপ্তাহ পরে রোগীর সংক্রমণের হার আর তিন সপ্তাহ পরে মৃত্যুর হার দেখা যায়। রাজধানী ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে সংক্রমণ এখন বেশি। ফেরিঘাটে-গ্রামে মানুষের সংক্রমিত এবং অসংক্রমিত মানুষের মিশ্রণ ঘটে।

ঢাকার মানুষ ঢাকায় ফিরবে। এখনও রোজার ঈদের ধাক্কাটাই সামলানো যায়নি। তার ওপর এবারের ঈদের মানুষের যাতায়াত আরেকটি ধাক্কা যোগ করবে। সবকিছু যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে হয়তো আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রোগী সংখ্যা কমেতে শুরু করত। কিন্তু সেটা না হয়ে এখন রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করবে। অর্থাৎ আরেকটা বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের জন্য।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এসএম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে করোনার একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে হঠাৎ করে রাজধানীর সব মানুষ বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করল। তারা শপিংয়ে গেল, হাটে গেল, বাড়িতে গেল আবার বাড়ি থেকে ফিরতে শুরু করছে। কিন্তু কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব মানছে না। তিনি বলেন, হঠাৎ করেই যেন সাবধানতা অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। নয়তো করোনা নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত