পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত

সিনহার মাকে প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনা : তদন্ত শুরু

  যুগান্তর রিপোর্ট ও কক্সবাজার প্রতিনিধি ০৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারের টেকনাফে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। নিজস্ব প্রাইভেট কারে টেকনাফ থেকে কক্সবাজারের দিকে যাওয়ার সময় ৩১ জুলাই রাত ৯টার দিকে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

এদিকে মেজর (অব.) সিনহা রাশেদের (৩৬) মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্তকাজ শুরু করেছে। সিনহা রাশেদের মৃত্যুর ঘটনায় তার মা নাসিমা আক্তারকে ফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রত্যক্ষদর্শী ভ্রাম্যমাণ এক ব্যবসায়ী জানান, মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে একটি প্রাইভেট কার পৌঁছলে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ব্যারিকেড দেন।

এ সময় হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নেমে আসেন একজন (সিফাত)। এরপর নিজের পরিচয় দিয়ে হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নামেন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ। তিনি নামার সঙ্গে সঙ্গে কোনো জিজ্ঞাসা না করেই গুলি ছোড়েন লিয়াকত আলী। মুহূর্তেই সিনহা রাশেদ মাটিতে ঢলে পড়েন। একপর্যায়ে ১০ থেকে ১২ মিনিট পর সাদা নোয়াহ (মাইক্রোবাস) যোগে ঘটনাস্থলে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ উপস্থিত হন। কয়েক মিনিট পর একটি মিনি ট্রাকে (পিকআপ) সিনহা রাশেদকে তুলে কক্সবাজারের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেন ওসি। ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হামিদ আরও বলেন, ‘আমার চোখের সামনে ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনা কখনও ভোলার নয়।’

তবে পুলিশের ভাষ্য ভিন্ন। পুলিশ বলছে, চেকপোস্টে পুলিশ গাড়িটি থামিয়ে তল্লাশি করতে চাইলে সিনহা রাশেদ বাধা দেন। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে রাশেদ পিস্তল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর গেস্টহাউসে সিনহার কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ বিদেশি মদ ও গাঁজা উদ্ধার করে।

এ ঘটনার পর কক্সবাজার পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শামলাপুরের লোকজন ওই গাড়ির আরোহীদের ডাকাত সন্দেহ করে পুলিশকে খবর দেয়। এ সময় চেকপোস্টে গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু গাড়ির আরোহী পুলিশকে গুলি করার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। এতে ওই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই সিনহা রাশেদের মৃত্যু হয়েছিল। শনিবার সকালে তার ময়নাতদন্ত হয়েছে। তার বুক ও পিঠে জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়।

একটি সূত্র জানায়, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী হামিদের মতোই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন সিনহার সঙ্গে থাকা সিফাতও। গোয়েন্দা সংস্থার এক গোপন প্রতিবেদনে সিফাতের ভাষ্য ছিল- ফিল্মি স্টাইলে সিনহা রাশেদকে মারা হয়েছে। তাকে কথা বলার সুযোগও দেয়নি পুলিশ। হাত উঁচু করে নামার সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করে লিয়াকত। মাটিতে পড়ে গেলে সিনহার বুকে পরপর আরও দুইটি গুলি করা হয়। সিনহার ব্যক্তিগত পিস্তল থাকলেও সেটি গাড়িতে ছিল। এ সময় তার পরনে সামরিক পোশাক (কম্ব্যাট টি-শার্ট, কম্ব্যাট ট্রাউজার ও ডেজার্ট বুট) ছিল। সিফাত আরও বলেন, সিনহার গাড়িটি প্রথমে বিজিবির একটি চেকপোস্টে থামে। পরিচয় পাওয়ার পর বিজিবি সদস্যরা তাদের ছেড়ে দেন। রাত ৯টার দিকে সিনহা রাশেদের গাড়ি দ্বিতীয় চেকপোস্ট শামলাপুরে পৌঁছে। সেখানেই নির্মম ঘটনা ঘটায় ইন্সপেক্টর লিয়াকত।

এতে আরও বলা হয়, গুলি করার পরপরই রাত পৌনে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় জনগণ ও গোয়েন্দা সংস্থার সার্জন আইয়ুব আলী। তখনও গুলিবিদ্ধ সিনহা রাশেদ জীবিত ছিলেন। সার্জন আইয়ুব এ ঘটনার ভিডিও করতে চাইলে পুলিশ তার পরিচয় জানতে চায়। পরিচয় পাওয়ার পর পুলিশ হাত থেকে মোবাইলফোন সেট ও তার পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেয়।

এরপর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। একপর্যায়ে রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আনা হয় একটি মিনি ট্রাক (পিকআপ)। ট্রাকে ওঠানোর সময়ও সিনহা জীবিত ছিলেন এবং নড়াচড়া করছিলেন। এরপর ট্রাকটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌঁছায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর। তখন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সিনহাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় টেকনাফ থানায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি অস্ত্র। অপরটি মাদক। এ মামলায় সিফাতসহ দু’জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ সিনহার গাড়ি ও নীলিমা রিসোর্ট তল্লাশি করে জার্মানির তৈরি একটি পিস্তল, নয়টি গুলি, ৫০টি ইয়াবা, দুটি বিদেশি মদের বোতল এবং চার পোঁটলা গাঁজা উদ্ধার করে।

জানা গেছে, ‘জাস্ট গো’ নামে ইউটিউব চ্যানেলের ট্রাভেল ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্যে ৩ জুলাই ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসেন সিনহা রাশেদ। তার সঙ্গে ছিলেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিনজনসহ মোট চারজন। মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি ঝরনা এলাকার নীলিমা রিসোর্টে তারা ওঠেন। এক মাস ধরে তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেন। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. সোলাইমান মনজুর সাংবাদিকদের বলেন, দুই মাসের জন্য রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিলেন সিনহা। আলাদা আলাদা কক্ষে থাকতেন চারজন। ৩১ জুলাই বিকালে সিনহা ও সিফাত প্রাইভেট কার নিয়ে টেকনাফ শুটিংয়ে চলে যান। রিসোর্টে ছিলেন দুইজন।

জানা গেছে, সিনহা রাশেদের বাড়ি যশোরের বীর হেমায়েত সড়কে। তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ খান অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন। ৫১ বিএমএ লং কোর্সের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কমিশন লাভ করেছিলেন সিনহা রাশেদ। ২০১৮ সালে সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেন। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সেও (এসএসএফ) তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

তদন্ত কমিটির সভা : তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে সমন্বয় সভা করেছেন। এ সময় কমিটির সদস্য চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শকের মনোনীত অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ জাকির হোসেন, রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের মনোনীত লে. কর্নেল এসএম সাজ্জাদ ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) মো. শাহাজান আলী উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তের জন্য কমিটির সবাইকে নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বেঁধে দেয়া সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

সিনহা রাশেদের মাকে প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনা : পুলিশের গুলিতে নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা (মেজর) সিনহা মো. রাশেদ খানের মা নাসিমা আক্তারকে ফোন করে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- সাবেক মেজর সিনহার মাকে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে সান্ত্বনা দিয়েছেন। নিহতের পরিবারকে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এ সময় নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সিনহার পরিবার।

নিহতের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে আইনি নোটিশ : সিনহা রাশেদ হত্যার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন ও

নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনে আইনি নোটিশ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন সচিবকে আইনি নোটিশ প্রদান করেন ন্যাশনাল ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলী জুনু।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত