৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সিনহার বোনের মামলা

স্টামফোর্ডের দুই শিক্ষার্থী জেলে * টেকনাফের ওসি প্রদীপ দাশ প্রত্যাহার * র‌্যাবকে তদন্তের নির্দেশ

  যুগান্তর রিপোর্ট ও কক্সবাজার প্রতিনিধি ০৬ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনায় ৯ পুলিশ সদস্যকে আসামি করে আদালতে মামলা করা হয়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টেকনাফ উপজেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস মামলা করেন।

এতে টেকনাফ বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি এবং টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাসকে ২নং আসামি করা হয়েছে।

অন্য আসামিরা হলেন- এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, এসআই টুটুল, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল মো. মোস্তফা, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।

জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারহার আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এজাহারের ধারা অনুযায়ী হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলাটি রেকর্ড করে ৭ দিনের মধ্যে আদালতকে অবগত করারও আদেশ দেয়া হয়।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আনোয়ারুল কবির বাবুল ও মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, মামলা রেকর্ডের পর কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার আজিম আহমেদকে তদন্ত করারও নির্দেশ দেন আদালত।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসে কক্সবাজারে আসেন মেজর (অব.) সিনহার বড় বোনসহ পরিবারের সদস্যরা।

মামলা করার পর শারমিন আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, রাশেদের হত্যাকারীদের বিচারের জন্য আমরা মামলা করেছি।

তিনি বলেন, ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ থেকে পুলিশ ফোন করে তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল রাশেদ তার ছেলে কিনা, তিনি সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন কিনা।

কিন্তু পুলিশ তখন বলেনি যে, রাশেদের মৃত্যু হয়েছে। পরদিন বাসায় তিন পুলিশ সদস্য যান, তারাও বলেননি যে আমার ভাই মারা গেছেন। আমরা পরে অন্য সোর্সে জেনেছি।

কমান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত সাবেক এসএসএফ সদস্য সিনহা রাশেদের ডাকনাম আদনান। সাবেক সহকর্মী ও বন্ধুরা সিনহা নামে ডাকলেও পরিবারের সদস্যরা তাকে আদনানই ডাকতেন।

৩১ জুলাই রাত ৯টার দিকে টেকনাফের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে সিনহা রাশেদ নিহত হন। তার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমানকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ২০ পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

টেকনাফের ওসি প্রদীপ দাশ প্রত্যাহার : কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে সিনহা রাশেদের মৃত্যুর ঘটনায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বুধবার পুলিশ সদর দফতরের এআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টেকনাফ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা এবিএম দোহাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

স্টামফোর্ডের দুই শিক্ষার্থী জেলে : সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদের সঙ্গে কাজ করা স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা রানী দেবনাথকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ৩১ জুলাই রাতে সিনহার সঙ্গে সিফাত ছিলেন।

সিনহা মারা যাওয়ার পর পুলিশের দিকে অস্ত্র তাক করে হত্যা চেষ্টার মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার সময় শিপ্রা রানী ও তাহসিন রিফাত নূর ছিলেন হিমছড়ির নীলিমা রিসোর্টে।

সেখানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দু’জনকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন স্বজনদের জিম্মায় রিফাতকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে কক্ষ থেকে মদের বোতল জব্দ দেখিয়ে শিপ্রাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

তাদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সিফাত, শিপ্রা ও রিফাত রাজধানীর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। ছবি তোলা ও ভিডিওগ্রাফির কাজের অংশ হিসেবে তারা সিনহা রাশেদের তথ্যচিত্র নির্মাণ কাজে যোগ দেন।

সিফাতের খালা অ্যাডভোকেট নিলু বলেন, সিফাতের কাছে মদ, ইয়াবা ও গাঁজা পাওয়া গেছে বলে পুলিশ বলছে। কিন্তু এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট। মিথ্যার একটা লিমিট থাকে। সিফাত কোনো কিছুর মধ্যেই ছিল না।

ওর ওপর কিভাবে চার্জ আসে? দেশ কি মগের মুল্লুক হয়ে গেল? সিফাতের নানা আইয়ুব আলী হাওলাদার বলেন, অন্যায়ভাবে পুলিশ নাটকের মতো করে সিফাতকে জড়িয়েছে।

জানা গেছে, শিপ্রার পরিবারও বেশ উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কুষ্টিয়ার মিরপুরের হাজরাহারি গ্রামে শিপ্রাদের বাড়ি। তার বাবা সাবেক বিজিবি কর্মকর্তা অসুস্থ। তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না।

ফোনালাপে শিপ্রার ভাই শুভজিত কুমার দেবনাথ বলেন, পুলিশের অভিযোগ মিথ্যা। আশা করি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সব বের হয়ে আসবে। আমরা সঠিক বিচার পাব। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আশা, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হবে। তিন শিক্ষার্থীও মামলা থেকে মুক্তি পাবে।

সিনহা হত্যার বিচারের দাবিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের মানববন্ধন : সিনহা রাশেদের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ঢাকায় মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ।

বুধবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘মেজর সিনহার হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবিতে’ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

এতে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক রহমান ও হানিফসহ ঢাকা মহানগর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পরিষদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধনে ‘মেজর হত্যার বিচার করো, ক্রসফায়ার বন্ধ করো’সহ নানা ধরনের স্লোগান দেয়া হয়।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত